সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অতি মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নিজেই নিজেকে দান করেছেন। একটি এনজিও’র (বেসরকারি সংস্থা) নামে বরাদ্দ দেখিয়ে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে সচিবালয় সংলগ্ন রেলওয়ের কোটি কোটি টাকা মূল্যের জমি কার্যত বিনামূল্যে গ্রাস করেছেন। ওই বেসরকারি সংস্থাটি প্রকৃত পক্ষে তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান এবং তার স্ত্রী সিগমা হুদা বর্তমানে এর সেক্রেটারি জেনারেল। সংস্থাটির প্যাডের শীর্ষে লেখাও রয়েছে, ‘ফাউন্ডেড বাই ব্যরিস্টার নাজমুল হুদা/ সিগমা হুদা, এডভোকেট’। জানা যায়, ব্যারিস্টার হুদাই ছিলেন এর চেয়ারম্যান। নিতানত্মই কৌশলগত কারণে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও তিনি এর জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য এবং রামের পাদুকা সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করার মতো এর অস্থায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কামাল চৌধুরী। উল্লেখ্য, সংস্থাটির প্যাডে কমিটির অন্য সকলের নাম লেখা থাকলেও, চেয়ারম্যান কে তা লেখা নেই।
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা মন্ত্রী থাকাকালে নগরীর কেন্দ্রস্থলে আবদুল গণি রোডে নির্মিত রেলের প্রধান কার্যালয়ের দক্ষিণ পাশের মোট প্রায় ১৫ কাঠা আয়তনের এক খণ্ড জমি ‘মানবাধিকার বাসত্মবায়ন সংস্থা’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থাকে বরাদ্দ দিয়েছেন। ওই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাসুদা গাওস জমি বরাদ্দ করার জন্য আবেদন জানান বলে জানা যায়। তবে যে প্যাডে জমি বরাদ্দ করার আবেদন করা হয় সেই প্যাডেই লেখা রয়েছে সংস্থাটি ১৯৭৭ সালে নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী সিগমা হুদা প্রতিষ্ঠা করেন এবং হুদার স্ত্রী সিগমা হুদা সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেল। ওই এলাকায় সচরাচর জমি বেচাকেনা না হওয়ায় ঐ জমি প্রকৃতপক্ষেই অমূল্য। তবে সূত্রমতে, রাজধানীর অন্য এলাকার সঙ্গে মূল্যের অনুপাতে মানবাধিকার বাসত্মবায়ন সংস্থার নামে দান করা জমির দাম কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা। কিন’ সে জমি বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১ টাকার প্রতীকী মূল্যে।
জানা যায়, মানবাধিকার বাসত্মবায়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাসুদা গাওস ২০০৩ সালের ৯ মার্চ রেল ভবনের দক্ষিণ পাশের অব্যবহৃত জমি ওই সংস্থার নিজস্ব অফিস ও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশে বরাদ্দ করার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবেদনপত্রটি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় আবার আবেদনপত্রটি পাঠান রেলের মহাপরিচালকের কাছে। বিষয়টি বাংলাদেশ রেলওয়ে অথরিটির (বিআরএ) একটি সভায় আলোচনা করা হয় ও প্রসত্মাবিত জমিটি বরাদ্দ করার সিদ্ধানত্ম নেওয়া হয়।
জানা যায়, বাংলাদেশ রেলকে আরো গতিশীল করার উদ্দেশে বিআরএ নামে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি আছে। যোগাযোগমন্ত্রী পদাধিকার বলে ওই কমিটির সভাপতি এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ওই কমিটির সদস্য। যেহেতু দাতা এবং গ্রহীতা কার্যত একই ব্যক্তি, সেহেতু জমি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য যুক্তির কোনো অভাব হয়নি। বিআরএ সভায় বলা হয়- বিশেষ বিবেচনা ও শর্তসাপেক্ষে কতিপয় ক্ষেত্রে রেল ভূমি বরাদ্দ / লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধানত্ম দেওয়ার ক্ষমতা বিআরএকে দেওয়া হয়েছে। ওই সিদ্ধানেত্মর মধ্যে জনহিতকর কাজে নিয়োজিত ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রেল ভূমি বরাদ্দ / লাইসেন্স প্রদানের কথা উল্লেখ আছে। অথচ মানবাধিকার বাসত্মবায়ন সংস্থা দেশের অন্যান্য অগণিত বেসরকারি সংস্থার মতোই একটি এনজিও। অতএব, জনহিতকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেবল ঐ সংস্থার দাবি বিবেচিত হতে পারে না এবং বিআরএর নীতিমালা অনুযায়ী রেলের জমি বরাদ্দ পাওয়ারও যোগ্যতা রাখে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
রেলের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নাজমুল হুদা যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরই বিআরএর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রথম দিকে তিনি বিআরএর সভাই করতে চাননি। কিন’ বিদায় যতো ঘনিয়ে আসে, বিআরএর ওপর তিনি ততো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বিদায়ের আগে তিনি ঘন ঘন বিআরএর সভা করেন এবং বহু সিদ্ধানত্ম নেন। তার মধ্যে বেশির ভাগই ছিল জমি বরাদ্দ সংক্রানত্ম।
রেল ভবনের নিকটবর্তী জমি বরাদ্দ সংক্রানত্ম এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাহ্যত একটু তৎপর হন। তিনি রেলের ওই জমির বরাদ্দ প্রদান স্থগিত রাখার জন্য নাজমুল হুদাকে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ পাওয়ার পর নাজমুল হুদা কিছুদিন নীরব থাকেন। তারপর তিনি বিআরএর সভা ডেকে মানবাধিকার বাসত্মবায়ন সংস্থার নামে আলোচ্য জমি বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধানত্ম নেন এবং রেল কর্তৃপক্ষকে চুক্তি সই করতে বাধ্য করেন। এ ব্যাপারে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, রেলের জমি বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসনের নিষেধাজ্ঞা ছিল নেহায়েতই লোক দেখানো। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তারেক রহমান বিএনপিতে অত্যনত্ম প্রভাবশালী এবং সূত্র মতে, নাজমুল হুদা প্রভাবশালী ছিলেন তার কারণে। তাছাড়া কোনো কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের কারণেও তিনি দলে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন বলে ব্যাপক প্রচার ছিল। তা সত্ত্বেও দলের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী যদি রেলের ওই জমি গ্রাস বন্ধ করার ব্যাপারে সত্যিই আনত্মরিক হতেন, তাহলে নাজমুল হুদার পক্ষে তার নির্দেশ অমান্য করা সম্ভব হতো বলে কেউই মনে করেন না। সে কারণে ওই জমি গ্রাস করার ব্যাপারে নাজমুল হুদার প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নীরব সায় ছিল বলেই পর্যবেক্ষক মহলের ধারনা।
Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-02-07




