নগরবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত প্রথম নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি ড. ইউনূস সংঘাত নিরসনে শান্তির ডাক

রাজনৈতিক সংঘাতক্ষুব্ধ রাজধানী ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের সবুজ দক্ষিণ প্লাজায় শান্তিকামী নাগরিকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সুন্দর হেমন্ত বিকালে অনবরত পুষ্পবৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি এলেন৷ নাগরিক সংবর্ধনার মঞ্চে উঠে শান্তির জন্য একমাত্র নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশি ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে জানালেন শান্তিচুক্তির আহ্বান৷ তিনি দিলেন আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের পর স্বল্প মেয়াদি একটি কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রস্তাব৷ এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বললেন দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের কথা৷ প্রস্তাবিত এ চুক্তির একটি খসড়াও তিনি প্রকাশ করেছেন৷ এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য ৭ দফা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে৷
গতকাল বুধবার ঢাকা সিটি করপোরেশন আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ ফর্মুলা ও চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করেন৷ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে শান্তিচুক্তি সই করা জরুরি৷ ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেও তো শান্তিচুক্তি হয়ে থাকে৷ তাহলে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কেন চুক্তি করা যাবে না? তিনি আরো বলেন, সংঘাতের পথ পরিহার করুন, পরস্পর হাত মেলান, দেশ বাচান৷
প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়ায় তিনি বর্তমান কেয়ারটেকার সরকারের আমলে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি নির্বাচনী পরামর্শক কমিটি গঠনের কথাও বলেন৷ এ কমিটির কাজ হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিয়মিত পরামর্শ দেয়া৷
ড. ইউনূস আরো বলেন, প্রস্তাবিত কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল থেকে এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী হবেন সংখ্যালঘু আসনে বিজয়ী দল বা জোট থেকে- এ ক্ষেত্রে তাদের আসন সংখ্যা যা-ই হোক না কেন৷ এছাড়া সংখ্যালঘু আসনে বিজয়ী দল বা জোট মন্ত্রিসভার এক-তৃতীয়াংশ সদস্যপদ পাবে৷
তিনি প্রস্তাবে আরো উল্লেখ করেন, কোয়ালিশন সরকারের মেয়াদ হবে এক বছর৷ তবে দুই পক্ষ ইচ্ছে করলে আরো এক বছর বাড়াতে পারে৷ তবে মেয়াদ কোনোভাবেই দুই বছরের বেশি হবে না৷ কোয়ালিশন সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনের ফল সবাইকে সানন্দে গ্রহণ করতে হবে৷
অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বলেন, আমরা যখন জোবরা গ্রামে কাজটি শুরু করি তখন মনে হয়েছিল বিষয়টি ছোট এবং স্থানীয় বিষয়৷ কিন্তু কাজের গভীরে যখন প্রবেশ করি তখন মনে হলো বিষয়টি স্থানীয় নয়, এটা জাতীয় সমস্যা, সারা পৃথিবীর সমস্যা৷ দেখলাম প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় গরিব মানুষের কোনো স্থান নেই৷ তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে গ্রামীণ মহাজনদের ওপর৷ গরিবরা মহাজনদের দ্বারা নির্যাতিত হয়৷ কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই৷
তিনি আরো বলেন, ব্যাংকগুলো বলতো গরিব মানুষের সঙ্গে ব্যাংকিং করা যায় না৷ কিন্তু চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করার পর দেখলাম গরিবদের সঙ্গে ব্যাংকিং করা যায়৷ এতে জামানত বা কোনো দলিল-দস্তাবেজের দরকার নেই৷ সম্পূর্ণ আস্থার ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকিং চালু করেছি৷ বর্তমানে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে এখন আমাদের অনুকরণে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাংকিং চালু হয়নি৷ বাংলাদেশের গ্রামে জন্ম নেয়া একটি পদ্ধতি পৃথিবী গ্রহণ করেছে, গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে৷ এ ঘটনার মাধ্যমে ব্যাংকিং পদ্ধতিতে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে৷
ড. ইউনূস বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমানে ৭০ লাখ সদস্য আছে এবং প্রতি মাসে ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়৷ এখনো ঋণ আদায়ের হার ৯৯ ভাগ৷ অনেকে ভেবেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষের ঋণ পরিশোধের ঐতিহ্যের কারণে এতো উচ্চ হারে ঋণ আদায় হয়৷ কিন্তু পৃথিবীর অন্য দেশে যখন গরিবদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হলো, দেখা গেল সেখানেও উচ্চ হারে ঋণ আদায় হচ্ছে৷ এককালে যা বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো, এখন তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে৷
তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক দরিদ্র মহিলারা৷ তবে তা পরিবর্তন হয়ে যাবে৷ এটি পরিণত হবে সাবেক গরিবদের ব্যাংকে৷ ইতিমধ্যে ৯৮ ভাগ সদস্য দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে৷ ২০১৫ সালের মধ্যে সব সদস্য দারিদ্র্যমুক্ত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন৷
বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নাগরিক সংবর্ধনাপ্রাপ্ত ড. ইউনূস বলেন, দেশের মানুষকে সংবর্ধনা না দেয়ার রেওয়াজটা ভালো নয়৷ দেশে অনেক যোগ্য মানুষ আছে৷ তাদের সংবর্ধনা দেয়া প্রয়োজন৷ বিদেশি অতিথিদেরও দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছে না৷ এটি সুসংবাদ নয়৷ ভবিষ্যতে যেন এ রেওয়াজ চালু করা হয়৷ দেশে ও বিদেশের যোগ্য নাগরিকদের যেন সংবর্ধনা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়৷
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও বক্তব্য রাখেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা৷ মানপত্র পাঠ করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আফজাল হোসেন ও মেহরিন৷ অনুষ্ঠানের শুরুতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন মেয়রের স্ত্রী ইসমত আরা এবং ড. ইউনূসের স্ত্রী প্রফেসর আফরোজী ইউনূসকে পুষ্পস্তবক দেন সাদেক হোসেন খোকা৷
মানপত্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ইতিপূর্বে দুইজন বাঙালি নোবেল পুরস্কার জয়ী হয়েছেন৷ আর বাংলাদেশ থেকে ড. ইউনূসই প্রথম নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন৷ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিততে জাতি তার বলিষ্ঠ ভূমিকা আশা করছে বলে তিনি মানপত্রে উল্লেখ করেন৷
অনুষ্ঠানে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, অমর্ত্য সেন দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পেয়েছেন৷ আর ড. ইউনূস পেয়েছেন দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্ত করার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য৷ তিনি শুধু স্বপ্ন দেখেন না, স্বপ্ন বাস্তবায়নে হাজির থেকেছেন এবং থাকছেন মাঠে৷ দারিদ্র্য বিমোচনে তার অঙ্গীকার প্রভাবিত করেছে এ ভূখণ্ডকে, সারা বিশ্বকে৷
তিনি আরো বলেন, জাতি বহুকাল পর ড. ইউনূসের মতো একজন প্রাজ্ঞ, সাহসী ও দরদী অভিভাবক পেয়েছে৷ এ দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতি তার অভিভাবকত্ব আশা করে৷
তিনি আরো বলেন, নোবেল জয়ের মাধ্যমে ড. ইউনূস দেশের জন্য শুধু বিরল সম্মানই বয়ে আনেননি, তিনি জাতির মধ্যে সঞ্চারিত করেছেন অনুপ্রেরণা ও সম্ভাবনার নতুন মাত্রা৷
ঢাকার মেয়র বলেন, ঐতিহাসিক নগরী ঢাকায় মগ বর্গিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে৷ ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ হয়েছে৷ ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়৷ ড. ইউনূসকে সংবর্ধনা দেয়ার ঘটনাও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বলে বিবেচিত হবে৷

সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=21383&issue=154&nav_id=1

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: