চার উপদেষ্টার পদত্যাগ

অবশেষে নানা বিতর্ক, টানাপোড়েনের প্রেৰাপটে পদত্যাগ করলেন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চারজন সিনিয়র উপদেষ্টা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডঃ ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে কয়েকটি গুরম্নত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইসু্যতে মতবিরোধের ফলে সরে দাঁড়ালেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা সাবেক কেবিনেট সচিব ডঃ আকবর আলী খান, বিদু্যৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ উপদেষ্টা সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, কৃষি উপদেষ্টা সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত সিএম শফি সামী এবং শিল্প ও পাট উপদেষ্টা মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট সুলতানা কামাল। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া, সেনা মোতায়েনসহ অনেক ৰেত্রে উপদেষ্টাদের মতামত ছাড়াই রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা কতর্ৃক একতরফাভাবে সিদ্ধানত্দ গ্রহণ, রাজনৈতিক সংকট নিরসনে উপদেষ্টাদের গৃহীত উদ্যোগ ও প্যাকেজ প্রসত্দাবের বাসত্দবায়ন না হওয়ায়, বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক ৰেত্রে মতবিরোধের কারণেই চার উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন বলে তারা জানান। গতকাল রাত পর্যনত্দ চার উপদেষ্টার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি।

রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে এক প্রকট রাজনৈতিক সংকটের প্রেৰাপটে গত ২৯ অক্টোবর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের দুদিন পর দশজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। ৩১শে অক্টোবর থেকে দশ জন উপদেষ্টা রাজনৈতিক সংকট নিরসন করে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য, বিতর্কমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রয়াস চালিয়ে যান। কখনও তিনজন, কখনও চার বা পাঁচজন উপদেষ্টা মিলে পুনর্গঠন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা, রাজনৈতিক দলের সাথে দফায় দফায় সংলাপসহ নানা তৎপরতা চালান। এতে অধিকাংশ ৰেত্রেই সফলতা আসে।

পৰানত্দরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা অন্য উপদেষ্টাদের পাশ কাটিয়ে সেনা মোতায়েনসহ অনেক সিদ্ধানত্দ নেন যা রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক ও অনাস্থা আরো বাড়িয়ে দেয়। যার ফলে সংকট নিরসনে ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখতে না পারায় সরে দাঁড়ালেন অগ্রণী ও সক্রিয় চার উপদেষ্টা। বারবার রাষ্ট্রপতির কাছে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরলেও সুরাহা হয়নি অনেক ইসু্যর। উপরন্তু সংকট নিরসনে আনত্দরিক প্রচেষ্টা, স্বচ্ছ অবস্থান, খোলামেলা বক্তব্যের জন্য উপদেষ্টারা সহযোগিতার বদলে নিন্দা, কখনো ধমকের স্বরে কথা শুনেছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে। পদত্যাগকারী চার উপদেষ্টার মধ্যে ডঃ আকবর আলী ও হাসান মশহুদ বিএনপির এবং শফি সামী ও সুলতানা কামাল আওয়ামী লীগের তালিকা থেকে উপদেষ্টা হন।

শনিবার বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের দুইদফা বৈঠকে উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিরোধ চূড়ানত্দ রূপ নেয়। শনিবার গভীর রাতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধানত্দ নিয়ে রবিবার রাত এগারটার পর সেনা মোতায়েনের যৌক্তিকতাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। রাষ্ট্রপতির এসব পদৰেপে ৰুব্ধ ও নিরাশ করে তোলে উপদেষ্টাদের। তারা নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করেন। সর্বশেষ রবিবার কয়েকবার রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার জন্য সময় চান চার উপদেষ্টা। বঙ্গভবন থেকে সোমবার সকাল পর্যনত্দ কোন সময় দেয়া হয়নি। গতকাল সোমবার ফ্যাক্স ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের দিয়ে রাষ্ট্রপতি বরাবরে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন তারা।

সকাল ১০টা পর্যনত্দ চার উপদেষ্টার কেউই সচিবালয়ে তাদের কার্যালয়ে না যাওয়ায় সাংবাদিকরা সরাসরি চলে যান ডঃ আকবর আলী খানের গুলশানস্থ বাসভবনে। সেখানে কিছু সময় অপেৰার পর তার বাসা থেকে জানানো হয়, তিনি এ মুহূর্তে কথা বলতে চান না। সেখান থেকে টেলিফোন করা হলে ডঃ আকবর আলী খান ইত্তেফাককে জানান, তিনি তাৎৰণিকভাবে পদত্যাগের সিদ্ধানত্দ নিয়েছেন। পদত্যাগপত্র সকাল ১০টার দিকে ফ্যাক্স এবং বাহক মারফত রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, পদত্যাগপত্র দেয়ার জন্য সকাল ১১টায় রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার জন্য সময় চেয়েছিলাম। গত রবিবারও সময় চেয়েছিলাম, তিনি আমাকে সময় দিলেন না। তার প্রটোকল অফিসার বললো, তিনি সময় দিতে পারবেন না। তিনি পদত্যাগের কারণ হিসাবে জানান, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমরা চেষ্টা করেছিলাম। সে প্রচেষ্টা বাধাগ্রসত্দ হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অবদান রাখতে পারবো না বলেই পদত্যাগ করেছি।

এরপর গুলশানে সিএম শফি সামির বাসায় গেলেও তিনিও ঐ মুহূর্তে দেখা না করে ফোনে কথা বলেন। তিনি বলেন, অবাধ ও নিরপেৰ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হচ্ছি বলেই পদত্যাগ করেছি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ এখনো পর্যনত্দ বাসত্দবায়ন করা যায়নি। আগেই বলেছিলাম, সুষ্ঠু নির্বাচনে ভূমিকা না রাখতে পারলে চলে যাবো-সেই কথারই বাসত্দবায়ন করেছি।

এডভোকেট সুরতানা কামাল নয়াপল্টনস্থ আইন ও সালিশ কেন্দ্র কার্যালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, প্যাকেজ প্রসত্দাব বাসত্দবায়ন করা যায়নি। সেনা মোতায়েনে আমাদের কোন মতামত নেয়া হয়নি। আর এর কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির ৰেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধানত্দ নিতে আমরা বিলম্ব করেছি। এৰেত্রে উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেবার সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম, ভোটার তালিকা সংশোধন করার। কিন্তু এই সিদ্ধানত্দ নিতে ৩০ দিন দেরি হয়েছে। এখন এ নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধান কিভাবে সম্ভব? তিনি বলেন, আমি নিজে পদত্যাগের বিষয়টি জানাতে রাষ্ট্রপতির সাথে সোমবার সকাল ১১টায় দেখা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সময় দেননি। তাই আমি আমার একানত্দ সচিবের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে এখনো এমন কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, যাতে করে সেনাবাহিনী নামাতে হয়। এ বিষয়ে আমাদের ১০ উপদেষ্টারই একমত ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা একক সিদ্ধানত্দে সেনা নামালেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা রবিবার রাতে জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, সে বিষয়েও তাদের সাথে কোন আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, পদত্যাগ বিষয়ে তিনি অপর দুই নারী উপদেষ্টার সাথে কথা বলেছেন।

লেঃ জেনারেল (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধুরী বলেন, আমার পৰে পরিস্থিতি উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সেনা মোতায়েনের পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আমি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছি।

সূত্রঃ http://ittefaq.com/get.php?d=06/12/12/w/n_zzxumu

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: