৪ উপদেষ্টা শর্তসাপেক্ষে নিযুক্ত

প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ৪ উপদেষ্টা পদত্যাগ করার পরপরই শূন্যপদ পূরণের জন্য মাঠে নামে হাওয়া ভবন আর বঙ্গভবনের সিন্ডিকেট।  সোমবার সকালে উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান, লে.জেনারেল (অব) হাসান মশহুদ চৌধুরী, সি এম শফি সামী ও সুলতানা কামাল তাদের পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর পরপরই সিন্ডিকেট নতুন উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামে। ৪ উপদেষ্টার পদত্যাগে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয় এই সিন্ডিকেট। কারণ বিএনপি-জামাত জোটের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিঙের সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ৪ উপদেষ্টা। তাদের নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভূমিকায় হাওয়া ভবনের সব পরিকল্পনা মাঠে মারা যাচ্ছিল।
ফলে বিএনপি-জামাতের পক্ষ থেকে একাধিকবার এই ৪ উপদেষ্টা সম্পর্কে বিরূপ মনত্দব্য করা হয়েছিল। উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও সি এম শফি সামীর পদত্যাগ শুর\” থেকেই দাবি করা হয়। মিথ্যা অভিযোগ আনা হয় তাদের বির\”দ্ধে। কিন\’ রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যক্রম নিয়ে ত্যক্ত বিরক্ত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা যে কোনো মুহূর্তে পদত্যাগ করতে পারেন এমন আভাস ইঙ্গিত গত কয়েকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধানত্দকে পাশ কাটিয়ে প্রধান উপদেষ্টার একক সিদ্ধানত্দে কার্যক্রম পরিচালনা করা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে উপদেষ্টা পরিষদের প্যাকেজ প্রসত্দাব বাসত্দবায়ন না করায় উপদেষ্টারা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি এম এ আজিজের ছুটি নিয়ে লুকোচুরি, উপদেষ্টা পরিষদকে না জানিয়েই বিতর্কিত দুই ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়ে আরো জটিলতার সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যনত্দ সিইসি আজিজ ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা নিশ্চিত করলে উপদেষ্টারা আশা করেছিলেন জটিলতার হয়তো একটা অবসান হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য উপদেষ্টা বলেছিলেনও টানেলের শেষ প্রানত্দে আলো দেখা যাচ্ছে। কিন\’ এ আলো আর বেশিক্ষণ দেখতে দিলেন না প্রধান উপদেষ্টা। তিনি একক সিদ্ধানত্দ নিয়েই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়ে দিলেন বিতর্কিত আরো দুইজনকে। এ নিয়ে উপদেষ্টারা ক্ষুব্ধ হলেও ধারণা করা হয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টা এবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই পদক্ষেপ নেবেন। উপদেষ্টা পরিষদের সভার সিদ্ধানত্দ অনুযায়ী ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক করে প্যাকেজ প্রসত্দাব দেওয়া হলো। এই প্যাকেজ প্রসত্দাবের অন্যতম ছিল বিতর্কিত দুই নির্বাচন কমিশনার স ম জাকারিয়া ও মোদাবি্বর হোসেন চৌধুরী হয় পদত্যাগ করবেন, না হয় ছুটিতে যাবেন। প্রধান উপদেষ্টাও এই সিদ্ধানত্দের সঙ্গে সম্মতি দিয়েছিলেন। উপদেষ্টা পরিষদের প্যাকেজ প্রসত্দাব বাসত্দবায়ন শুর\” হয়। নির্বাচন কমিশন পূর্বঘোষিত নির্বাচনী তফসিল পরিবর্তন করে। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াও শুর\” হয়। বিতর্কিত কয়েকজন সচিবকেও পরিবর্তন করা হয়। দেশবাসীর আশা ছিল রাজনীতিতে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, নির্বাচনের যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল তার অবসান হয়ে ভোটের লড়াইয়ে মাঠে নামবে রাজনৈতিক দলগুলো। উপদেষ্টা পরিষদ জটিলতা সমাধানের প্রায় শেষ প্রানত্দে পেঁৗছে যখন হাঁফ ছেড়েছিলেন ঠিক তখনই অদৃশ্য ইঙ্গিতে আবার জটিলতা পাকাতে শুর\” করলেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন। অদৃশ্য সুতোর টানে তিনি ঘুরে বসলেন এবং নির্বাচন কমিশনার জাকারিয়া ও মোদাবি্বর হোসেন চৌধুরীকে ছুটিতে পাঠাতে টালবাহানা শুর\” করলেন। ফলে শুর\” হয়ে গেলো ফের নতুন জটিলতার। অন্ধকার নামা শুর\” হলো। আর এ অন্ধকার পরিপূর্ণতা পেলো উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধানত্দ ছাড়াই প্রধান উপদেষ্টার একক সিদ্ধানত্দে সেনাবাহিনী মোতায়েন করায়। ৯ ডিসেম্বর তিনি সেনা মোতায়েনের সিদ্ধানত্দের কথা উপদেষ্টা পরিষদের সভায় জানালে সব উপদেষ্টাই এই মুহূর্তে সেনা মোতায়েনের বিরোধিতা করেন। কিনত্দ কে শোনে কার কথা! উপদেষ্টা পরিষদের মতামতকে উপক্ষো করেই প্রধান উপদেষ্টা সারা দেশে সেনা মোতায়েন শুর\” করেন। সামরিক বহর দিয়ে ঘেরাও করে ফেলেন বঙ্গভবন। খুব স্বাভাবিকভাবেই আত্মমর্যাদাশীল উপদেষ্টাদের আত্মমর্যাদায় লাগে। প্রধান উপদেষ্টার স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ এবং সংবিধান বিরোধী পদক্ষেপের প্রতিবাদে উপদেষ্টাদের অনাস্থা জানানো ছাড়া আর কোনো গত্যনত্দর ছিলনা। আর এর অংশ হিসেবেই ৪ উপদেষ্টা পদত্যাগ করে তাদের নিজেদের মান সম্মান রক্ষা করেছেন।
১০ সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদে পদত্যাগী এই ৪ উপদেষ্টাই ছিলেন মূলত সকল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার স্বৈরতান্ত্রিক কার্যকলাপের প্রতিবাদীও ছিলেন এই চার উপদেষ্টা। বিএনপি-জামাত জোটের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিঙের সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়েও দাঁড়িয়েছিলেন ৪ উপদেষ্টা। ফলে এই ৪ উপদেষ্টার পদত্যাগে প্রধান উপদেষ্টা তো বটেই বিএনপি-জামাত জোটকেও উৎফুল্ল হতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোতে অনুসন্ধানে জানা যায়, ৪ উপদেষ্টার পদত্যাগপত্র দাখিলের পর বঙ্গভবন ও হাওয়া ভবনের সিন্ডিকেটে আনন্দ উল্লাস শুর\” হয়। রোববার রাতেই এটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীকে বঙ্গভবনে ডেকে পাঠানো হয়। পরামর্শ চাওয়া হয় পরবতর্ী সাংবিধানিক পদক্ষেপ সম্পর্কে। সূত্রটি জানিয়েছে এটর্নি জেনারেল পরামর্শ দেন ৪ জন উপদেষ্টা পদত্যাগ করায় কোনো সমস্যার সৃষ্টি হবে না। নতুন ৪ জন উপদেষ্টা নিয়োগ করলেই সমাধান হয়ে যাবে। এটর্নি জেনারেলের এই পরামর্শ পেয়েই শুর\” সিন্ডিকেটের উপদেষ্টা খোঁজা। সূত্রগুলো জানিয়েছে, সিন্ডিকেটের তালিকা অনুযায়ী প্রথম অবস্থায় যে ৪ জনের তালিকা তৈরি করা হয় এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন অবসরপ্রাপ্ত গভর্নর, অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন। হাওয়া ভবন ও বঙ্গভবনের তালিকা নিয়ে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যোগাযোগ শুর\” করেন। কিন\’ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও সামরিক কর্মকর্তা সরাসরি না করে দেন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের। অবসরপ্রাপ্ত সচিবও উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান তার ওপর শর্তারোপ করায়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের শিক্ষক উপদেষ্টা হতে রাজি হলেও তিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাকে বাদ দেওয়া হয়। বঙ্গভবনের প্রথম তালিকা ব্যর্থ হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় খুঁজে পাওয়া যায় নিয়োগপ্রাপ্ত ৪ জনকে। সূত্রটি জানিয়েছে, যে ৪ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদেরকে প্রসত্দাব দেওয়া মাত্রই রাজি হয়ে যান। উপদেষ্টা হতে রাজি হওয়ায় বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতির একজন প্রতিনিধি টেলিফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রধান উপদেষ্টার শর্তের কথা জানানো হয়। সূত্র মতে, উপদেষ্টা বানানোর ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার শর্ত ছিল তারা প্রধান উপদেষ্টার কোনো সিদ্ধানত্দের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারবেন না এবং নতুন কোনো প্রসত্দাব তুলতে পারবেন না। এই শর্তে রাজি হলে কেবলমাত্র উপদেষ্টা বানানো হবে। বঙ্গভবন প্রতিনিধির এই শর্তে ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই রাজি হন। কিন\’ অবসরপ্রাপ্ত সচিব নজর\”ল ইসলাম রাজি না হওয়ায় আবার জটিলতা সৃষ্টি হয়। নতুন করে অবসরপ্রাপ্ত সচিব খোঁজা শুর\” হয়। চুক্তিভিত্তিতে চাকরিরত একজন সচিবের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তিনি রাজি হন উপদেষ্টা হতে। কিন\’ তাকে নিয়েও সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্ক থাকায় শেষ পর্যনত্দ তাকে বাদ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে পূর্ব থেকেই নতুন উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয় বেলা দেড়টায়। বঙ্গভবনে কর্মরত রাষ্ট্রপতির একজন উপদেষ্টা সময় নির্ধারণ করে পুরো যোগাযোগ প্রক্রিয়া রক্ষা করেন। ৬ উপদেষ্টাকেও জর\”রিভিত্তিতে ডাকা হয় বঙ্গভবনে। নতুন উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি ৬ উপদেষ্টাও তখন পর্যনত্দ জানতেন না বলে জানা গেছে। উপদেষ্টারা ভেবেছিলেন, রাষ্ট্রপতি জর\”রি কোনো মিটিঙের জন্য তাদেরকে ডেকেছেন। নির্ধারিত সময়ে বঙ্গভবনে পেঁৗছে উপদেষ্টারা জানতে পারেন নতুন উপদেষ্টারা শপথ নেবেন। অবসরপ্রাপ্ত সচিব না পাওয়ায় শেষ পর্যনত্দ ৩ জনকে শপথ পড়ানো হয়। আর শেষ বিকালে ড. শোয়েব আহমেদকে রাজি করানো হলে রাতে তাকে শপথ পড়ানো হয়। আর এভাবেই পদত্যাগী ৪ উপদেষ্টার স্থলে হাওয়া ভবন ও বঙ্গভবন সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন ৪ উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ৪ উপদেষ্টা পদত্যাগের পর তাদের স্থলে যাদেরকে নিয়োগ করা হয়েছে তারা সবাই প্রধান উপদেষ্টার অনুসারী। মন-মানসিকতায়ও তারা বিএনপি-জামাত ঘরানার। সবচেয়ে বড়ো কথা উপদেষ্টা হওয়ার প্রসত্দাব পাওয়া মাত্রই তারা এ প্রসত্দাব লুফে নেন। সূত্রগুলো জানিয়েছে, শুধু এরাই নয় হাওয়া ভবন ও বঙ্গভবনের তালিকার পাইপলাইনে আরো অনেকেই ছিলেন। একজন রাজি না হলেও আরেকজনকে ডেকে আনা হতো। উপদেষ্টা বানানোর মূল কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন রাষ্ট্রপতির একজন ব্যক্তিগত উপদেষ্টা। এই উপদেষ্টার পরামর্শে একজন নির্বাচন কমিশনারও কিছুদিন আগে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
সূত্রঃ http://bhorerkagoj.net/online/news.php?id=29183&sys=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: