ক্ষণে ক্ষণে গতি পাল্টানো রাজনীতি আবার ভোটমুখী আওয়ামী জোটে জোর প্রস্তুতি একই সঙ্গে চাপে রাখার কৌশল আসন ভাগাভাগি নিয়ে দরকষাকষি দফায় দফায় বৈঠক

 ক্ষণে ক্ষণে গতি পাল্টানো রাজনীতি এখন আবার পুরোপুরিই ভোটমুখী৷ রাখঢাকের পর্ব শেষ করে সরাসরি নির্বাচনী তত্পরতায় নেমে গেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটও৷ গত দু’দিন ধরে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী নেতাদের একের পর এক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে মূলত ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে৷ আসন ভাগাভাগি, নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার দিনক্ষণ এবং একই সঙ্গে সরকারকে সার্বক্ষণিক চাপে রাখার কৌশল নিয়ে গতকালও দফায় দফায় বৈঠক করেছেন ১৪ দল ও মিত্র দলগুলোর নেতারা৷ মিডিয়ার সঙ্গে আলাপে কেউ কেউ ভোটের প্রস্তুতির কথা স্বীকার করলেও অনেকেই আবার হঠাত্ এভাবে মত পাল্টানোর কথা প্রকাশ করতে চাইছেন না৷ মহাজোট নেতাদের গত দু’দিনের নানামুখী তত্পরতায় এ বিষয়টি এখন পুরোপুরি স্পষ্ট, চলতি শেডিউলেই নির্বাচনে যাওয়ার লক্ষ্যে বেশ জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী জোট৷
আওয়ামী লীগের ভেতরকার দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, চলতি শেডিউলে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটে মতপার্থক্য থাকলেও জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা এ শেডিউলেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে মনস্থির করেন মূলত গত বৃহস্পতিবার বিকালে৷ এর আগে ইওরোপিয়ান ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভারপ্রাপ্ত চিফ ইলেকশন কমিশনার জাস্টিস মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর এক প্রেস বৃফিংয়ে জানায়, তাদের দৃষ্টিতে আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যেই বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব৷ মূলত ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা খোলাখুলি এমন মনোভাব ব্যক্ত করার কারণেই নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে দ্রুত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন ১৪ দলীয় নেত্রী৷ বিষয়টি নিয়ে প্রথমে তিনি আলোচনা করেন দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে, যারা বরাবরই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে৷ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার পর একই বিষয় নিয়ে যোগাযোগ শুরু হয় ১৪ দলভুক্ত ছোট দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে৷ ওইদিন সন্ধ্যায়ই আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি ও ১৪ দলের সমন্বয়ক আবদুল জলিল শেরে বাংলা নগরের ন্যাম ভবনে নিজের ফ্ল্যাটে বৈঠক করেন ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে৷ এছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন এরশাদের জাতীয় পার্টির দুই নেতা কাজী জাফর আহমেদ ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সঙ্গে৷ সে ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার সকালে নিজের বাসায় জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গেও তিনি তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন৷
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত গুলশানে নিজের বাসায় প্রথমে এলডিপি ও তরিকত ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে এবং পরে ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন৷ এ বৈঠকের পর তরিকত ফেডারেশনের নেতা সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে আলোচনা করেছি৷ এ নিয়ে গোপনীয়তার কিছু নেই৷ নির্বাচনে জোটভুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে আমরা তরিকত ফেডারেশনের জন্য ২০টি আসন চেয়েছি৷ সবকিছু নিয়েই বৈঠকে কথা হয়েছে৷ মহাজোটের পক্ষে এখন দেশব্যাপী যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে তাতে নির্বাচনে না যাওয়ার মতো বোকামি করা উচিত হবে না৷ ৯০ দিন ঠিক রেখে যদি ভোট গ্রহণের সময় আরো পেছানো যায়, তাহলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়৷ কারণ আমরা তো নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারিনি৷
তবে নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর ঠিক আগেই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এলডিপির সেক্রেটারি জেনারেল মেজর (অব.) আবদুল মান্নান বলেন ভিন্ন কথা৷ তিনি বলেন, চলতি শেডিউলে আমরা নির্বাচনে যেতে প্রস্তুত নই৷ আমরা আন্দোলনে আছি৷ আন্দোলনের কৌশল-কর্মসূচি নিয়েই বৈঠকে কথা হয়েছে৷ আবার ১৪ দলের বৈঠক শেষে আবদুল জলিল বলেন, চলতি শেডিউলে নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার বিষয়ে ১৪ দল ও মিত্ররা আজ শনিবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে৷ এর আগে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম ও ১৪ দল নেতাদের পৃথক বৈঠক হবে৷ এলডিপি, জাতীয় পার্টি ও তরিকত ফেডারেশনের নেতাদের সঙ্গে আজ আবারও বৈঠক করতে পারেন আওয়ামী লীগ নেতারা৷
আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যায়যায়দিনকে জানান, সমস্যা বেধেছে এরশাদের প্রেসিডেন্ট পদের দাবি পূরণ ও মহাজোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে৷ এরশাদের জাপা ও বি চৌধুরী-অলির এলডিপি চেয়ে বসেছে ১২০ আসন৷ তরিকত ফেডারেশন চেয়েছে ২০টি আসন৷ এর বাইরে ১৪ দলভুক্ত ছোট ছোট শরিকরা সবাই মিলে দাবি করেছে প্রায় ৫০টি আসন৷ সেই হিসাবে আওয়ামী লীগের হাতে থাকছে মাত্র ১১০টি আসন৷ বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে একই সঙ্গে ক্ষোভ ও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে৷ দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা মনে করেন, সব শরিক ও মিত্র দলকে বড়জোর ১০০ আসন ছেড়ে দেয়া যেতে পারে৷ এর বেশি কিছুতেই দেয়া ঠিক হবে না৷ কিন্তু এরশাদ তার দাবিকৃত ৬০ আসনের জায়গায় সর্বনিম্ন ৫০ আসন নিতে রাজি আছেন, তাও যদি তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ লিখিত অঙ্গীকার করে৷ এর বাইরে তিনি কোনো ছাড় দিতে রাজি নন৷ প্রায় একই অবস্থা এলডিপির ক্ষেত্রেও৷ বি চৌধুরী ও অলি আহমদ ৬০ আসনের নিচে নামতে চাইছেন না কিছুতেই৷ সবমিলিয়ে আসন ভাগাভাগি প্রশ্নে বেশ বেকায়দায় পড়েছে আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড৷ অথচ বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য তাদের হাতে সময় আছে শুধু আজকের দিনটি৷ এ পরিস্থিততে সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে আজ দিনের শেষে আওয়ামী জোটের তরফ থেকে কি ঘোষণা আসে- সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি৷
অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দল নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ করেছে ক’দিন আগে৷ কিন্তু কৌশলগত কারণে এখনো সে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি৷ গতকাল রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের বনানীর অফিসে চার দলের শীর্ষ নেতাদের এক বৈঠকে প্রার্থিতার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে৷ কথা হয়েছে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন ভাগাভাগির বিষয় নিয়েও৷ তবে কৌশলগত কারণে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি চার দলের পক্ষ থেকে৷ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আসন ভাগাভাগি ও নমিনেশনের ব্যাপারে চার দলের প্রস্তুতি শেষ৷ কিন্তু তারা এখন পর্যবেক্ষণ করছে আওয়ামী জোটের গতিবিধি৷ আওয়ামী জোট যদি শেষ পর্যন্ত চলতি শেডিউলে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে চার দল যথারীতি জোটবদ্ধভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে৷ আওয়ামী জোট চলতি শেডিউলে নির্বাচনে না গেলে চার দলের শরিকরা নির্বাচনে যাবে আলাদাভাবে৷ সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বিজেপি ও ইসলামী ঐক্যজোট প্রার্থীদের নমিনেশন দেবে নিজেদের মতো করেই৷
http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=23588&issue=173&nav_id=1

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: