প্রেস কনফারেন্সে খালেদা জিয়া নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কম মনে হলে দায়ী হবে বর্জনকারীরা

বিএনপি চেয়ারপারসন ও চারদলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, কারো বর্জনের কারণে যদি আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কম মনে হয় তবে সে অপরাধে দায়ী হবে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো৷ তিনি বলেন, এ নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই আমাদের একমাত্র দাবি ছিল সংবিধানের আওতায় নির্বাচন সম্পন্ন করা৷ আমরা শান্তি চাই৷ সে কারণে দেশের সর্বাধিক ভোটারের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও আমাদের জোট রাজপথে কোনো চ্যালেঞ্জে যায়নি৷ আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি নির্বাচনের জন্য৷ সে নির্বাচনে আমরা যাচ্ছি এবং বিজয়ী হয়ে আবারো দেশবাসীর সেবা করার সুযোগ চাই৷ সারা দেশ এখন নির্বাচনমুখী; কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দেশকে আন্দোলনমুখী করার ঘোষণা দিয়েছে৷ শান্তিকামী দেশকে তারা অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে৷ সমৃদ্ধিমুখী দেশকে তারা ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে চাইছে৷ গতকাল শুক্রবার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাও হোটেলের বলরুমে চারদলীয় জোট আয়োজিত এক জনাকীর্ণ প্রেস কনফারেন্সে এসব কথা বলেন তিনি৷
বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক, বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি চ্যানেলগুলোর বার্তাপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন এ প্রেস কনফারেন্সে৷ আর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে আসীন ছিলেন বিএনপি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনী, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসাহাক, জাতীয় পার্টি তিন অংশের তিন চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নাজিউর রহমান মঞ্জুর ও ডা. এম এ মতিন৷ এর বাইরেও চারদলীয় জোটের শতাধিক নেতা উপস্থিত হয়েছিলেন সোনারগাও হোটেলের বলরুমে৷
টানা ৩২ মিনিটের লিখিত বক্তব্যে খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের আন্দোলন, অতীতের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচন, ভোটার তালিকা, ইলেকশন কমিশন ও কেয়ারটেকার সরকারগুলোর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরেন৷ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট বিজয়ী হওয়ার পর ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর আমরা একটি সরকার গঠন করেছিলাম৷ পাচ বছর পর সেই সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে গত ২৯ অক্টোবর ক্ষমতা চলে যায় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে৷ আমরা আশা করেছিলাম ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের মতো ২০০৬ সালে গঠিত কেয়ারটেকার সরকারও সুষ্ঠু, দক্ষ ও নিরপেক্ষ-ভাবে নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে৷ সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে৷
কিন্তু সে আশা পূরণ হওয়ার পথে সুপরিকল্পিতভাবে একের পর এক বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে৷ সর্বশেষ বাধাটি হচ্ছে, গত ৩ জানুয়ারি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার৷
ভোটার তালিকা নিয়ে আওয়ামী জোটের নানা দাবি প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব৷ স্বাধীনতার পর এ দেশে এ পর্যন্ত আটবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে৷ এর মধ্যে তৃতীয় জাতীয় সংসদ মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই ভেঙে দেয়ার ফলে ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি৷ আর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন পর সংসদ ভেঙে দেয়ার ফলে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি৷ অন্য ছয়টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছিল৷
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির শাসনামলে প্রণীত ভোটার লিস্টের ভিত্তিতে হয়েছিল ১৯৯১-এর পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়৷ বিএনপির শাসনামলে প্রণীত ভোটার লিস্টের ভিত্তিতে হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ১২ জুনের ষষ্ঠ ও সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷ আর আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রণীত ভোটার লিস্টের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০১-এর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷
তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রণীত ২০০০ সালের ভোটার লিস্ট সম্পর্কে সে সময় ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং আমেরিকাভিত্তিক এনজিও ন্যাশনাল ডেমক্রেটিক ইন্সটিটিউট (এনডিআই) সন্দেহ প্রকাশ করেছিল৷ ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন বলেছিল, ওই ভোটার লিস্টের প্রায় এক কোটি ত্রিশ লাখ ভুয়া ভোটার থাকতে পারে৷ এনডিআই বলেছিল, প্রায় ৬৮ লাখ ভুয়া ভোটার থাকতে পারে৷ ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং এনডিআইয়ের এ সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ভুয়া ভোটার লিস্ট তৈরির জনক আওয়ামী লীগ৷
বিএনপি প্রধান বলেন, এটা জানার পর বিএনপি তখন সঙ্গত কারণে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল; কিন্তু কিছু হালকা কর্মসূচি নিলেও ভুয়া ভোটার লিস্টের অজুহাতে বিএনপি তখন কোনো আন্দোলনে যায়নি৷ ২০০১-এর নির্বাচনও বর্জন করেনি৷ কারণ বিএনপি জানতো নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলে তারা অবশ্যই বিজয়ী হবে৷ এবং তা-ই হয়েছিল৷ ভুয়া ভোটার থাকা সত্ত্বেও চারদলীয় জোট বিজয়ী হওয়ার একটি প্রধান কারণ ছিল, মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনের সময় সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন৷ তার ফলে অধিকাংশ ভুয়া ভোটার ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পায়নি৷ অন্যদিকে সেনাবাহিনীসহ অন্য সব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির ফলে আপামর ভোটাররা সাহস পেয়েছিলেন ভোট কেন্দ্র গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে৷
তিনি বলেন, এরপর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে আগস্ট ২০০৫ থেকে নির্বাচন কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নতুন ভোটার লিস্ট তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়৷ এ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে হাই কোর্টে রিট পিটিশন করা হয়৷ ২০০৬ সালের মে মাসে এ মামলায় আপিল বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেয়, ২০০০ সালের ভোটার লিস্ট বলবত রেখেই হালনাগাদ করতে হবে৷ হালনাগাদ করার মূল অর্থ হলো, যারা মারা গেছেন তাদের নাম ভোটার লিস্ট থেকে কেটে দিতে হবে এবং যারা ইতিমধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ভোটার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আপিল বিভাগের এ রায় ঘোষণার পরপরই নতুন ভোটার লিস্ট তৈরির কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয় এবং বিদ্যমান ২০০০ সালের ভোটার তালিকা যার ভিত্তিতে ২০০১-এর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে অন্তর্ভুক্তিকরণ, ভুল সংশোধন ও কর্তনের জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়৷ সে অনুযায়ী ভোটার লিস্ট হালনাগাদ করে আসন্ন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷
তিনি বলেন, ভোটার লিস্ট হালনাগাদ করার কাজটি সময়সাপেক্ষ এবং এর জন্য দরকার স্থানীয় সরকার ও ভোটারদের ব্যক্তিগত সহযোগিতা৷ তাই নির্বাচন কমিশন বারবার বলেছে, নির্বাচনের আগের দিনটি পর্যন্ত যোগ্য ভোটাররা তাদের নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করতে পারবেন৷ আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটভুক্ত দলগুলো এটা জেনে, বুঝে এবং মেনে নিয়েই আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়েছিল৷
বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকান অ্যামবাসাডর ও এনডিআইয়ের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, তারা বলেছে বিদ্যমান ভোটার লিস্টের ভিত্তিতেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব, কারণ তাদের মতে বিদ্যমান ভোটার লিস্টে যেসব ত্রুটি আছে তা কোনো বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক নয়৷
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগেরই দায়ের করা মামলার ফলে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য নতুন ভোটার লিস্ট তৈরি করা সম্ভব হয়নি৷ যে ভোটার লিস্টের ভিত্তিতে আগামী নির্বাচন হবে সেটি আওয়ামী লীগের শাসনামলেই প্রণীত হয়েছিল৷ এখন সেটিকে হালনাগাদ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং এটা যে একটি চলমান প্রক্রিয়া তা জেনেও আওয়ামী লীগ এখন তার বিরোধিতা করছে, সে অজুহাতে তারা নির্বাচন বর্জন করছে৷
আওয়ামী লীগের বিরোধিতার কারণেই সব ভোটারের আইডি কার্ড দেয়া সম্ভব হয়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার এ দেশে ভোটারদের আইডি কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নেয়৷ এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনে ১৯৯৫ সনে ‘বাংলাদেশের ভোটার আইডি কার্ড তৈরি ও বিতরণ’ নামে একটি প্রকল্প চালু করা হয়৷ ভোটাধিকার প্রয়োগে আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে আইন তৈরি করা হয়েছিল, যা পরে আইনের মাধ্যমে স্থগিত রাখা হয়েছে৷
তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরপরই আইডি কার্ড প্রকল্পের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে৷ ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইডি কার্ড তৈরি ও বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়৷
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, সঠিক ভোটার লিস্ট তৈরি এবং প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বিএনপি সবসময়ই আন্তরিক; কিন্তু আওয়ামী লীগ মুখে ত্রুটিমুক্ত ভোটার লিস্টের কথা এবং সব ভোটারকে আইডি কার্ড দিতে বললেও বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তারা শুদ্ধ ভোটার লিস্ট তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করেছে৷ তবে এ রকম বৈপরীত্য আওয়ামী লীগের জন্য নতুন কিছু নয়৷
জোট সরকারের সময়কার কয়েকটি উপনির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, কখনো আওয়ামী লীগ উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছে, আবার কখনোবা উপনির্বাচন বর্জন করেছে৷ অথচ আওয়ামী লীগ সবসময়ই বলছে তারা নির্বাচনমুখী দল৷ তারা যদি সত্যিই নির্বাচনমুখী দল হতো তাহলে ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হওয়ার মাত্র ১০ দিন পরেই ৩ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতো না৷
গত ১০ দিনে এমন কি ঘটে গেল যে কারণে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিল- এ প্রশ্ন তুলে চারদলীয় জোট নেত্রী বলেন, ২৩ ডিসেম্বর রাতে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তারা ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেবে৷ এরপর পরিবর্তিত তফসিল অনুযায়ী তারা এবং তাদের সহযোগী দলগুলোর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেন৷ কিন্তু ৩ জানুয়ারি তারা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে৷ তাদের এ আকস্মিক মত পরিবর্তনের নতুন কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ তারা দিতে পারেনি৷ যেসব কারণ তারা ৩ জানুয়ারির প্রেস কনফারেন্সে দেখিয়েছে সেসব আগেও বিদ্যমান ছিল৷ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শুধু একটি কারণে তারা হয়তো নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ সেটি হলো নির্বাচনে আইনগত কারণে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের অংশগ্রহণে অযোগ্যতা৷ কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনেও অংশ নিতে তিনি অপারগ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ তাতে অংশ নিয়েছিল৷
নতুন ভোটার লিস্ট তৈরির বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা করার পর থেকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের বিবরণ দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ একটার পর একটা দাবি তুলে অবরোধ, ঘেরাও, হরতাল প্রভৃতি কর্মসূচির মাধ্যমে দেশবাসীকে বন্দি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে জিম্মি করে ফেলে৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে তারা বাধ্য করে তাদের প্রায় সব দাবিই মেনে নিতে৷
তিনি বলেন, এর আগের কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে এতো দাবির মুখোমুখি হতে হয়নি৷ দেশে শান্তি বজায় রাখার জন্য এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাধ্য হয়েছে বারবার আওয়ামী লীগকে ছাড় দিতে৷ এ প্রসঙ্গে কয়েকটি বড় ছাড় হিসেবে কে এম হাসান, এম এ আজিজ ও স ম জাকারিয়ার প্রসঙ্গ টানেন জোট নেত্রী৷ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশনেই শুধু সীমাবদ্ধ ছিল না৷ তারা ব্যাপক প্রশাসনিক রদবদলও দাবি করে৷
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ২৯ নভেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত ৪৬ সচিব/ভারপ্রাপ্ত সচিব, ৭২ অতিরিক্ত সচিব, ৫০ যুগ্ম সচিব ও ৮৭ উপসচিবকে নিয়োগ বা বদলি করা হয়েছে৷
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ১৬ নভেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত ৮৬ জন সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে৷ তিনি বলেন, আইজিপি পদে এবং সব অতিরিক্ত আইজিপি পদে রদবদল করা হয়েছে৷ চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং একজন অতিরিক্ত আইজিপির চুক্তি বাতিল করা হয়েছে৷ সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি ও এসবির অতিরিক্ত আইজিপি পদে এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল মেট্রপলিটান পুলিশ কমিশনার পদে রদবদল করা হয়েছে৷ রেঞ্জ ডিআইজি পদের সাত কর্মকর্তার মধ্যে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ও রেলওয়ে রেঞ্জের ডিআইজি পদে রদবদল করা হয়েছে৷ এছাড়া ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি পদের আরো ১৯ জন কর্মকর্তার পদে রদবদল করা হয়েছে৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের ৬৪ জেলায় প্রত্যেকটি পুলিশ সুপার পদে রদবদল করা হয়েছে৷ পুলিশ সুপার ও সমমর্যাদার ১২৭ কর্মকর্তার পদে রদবদল করা হয়েছে৷ সব মেট্রপলিটান এলাকার মোট ৪৬ ডিসি (উপপুলিশ কমিশনার) পদে শতভাগ রদবদল করা হয়েছে৷ দেশের সর্বমোট ৫৫৭টি থানার সব ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদে রদবদল করা হয়েছে৷ মেট্রপলিটান এলাকার সব ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাদের পদ থেকে বিভিন্ন পদে বদলি করা হয়েছে৷ এছাড়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ২৯ জন এবং সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৪৬ জন কর্মকর্তার পদে রদবদল করা হয়েছে৷
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীতে এতোসব রদবদলের ফলে সরকার একটি দুর্বল অবস্থানে পড়ে গেছে৷ যার একটি অনাকাঙ্ক্ষিত; কিন্তু অবধারিত ফল হচ্ছে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটেছে৷ খুন-জখম, চুরি-রাহাজানি, ছিনতাই-চাদাবাজি গত দুই মাসে বেড়ে গেছে৷
তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর মাত্র ১৩টি সচিব পর্যায়ে রদবদল করা হয়েছিল৷ আওয়ামী লীগ তা নিয়েই তখন অনেক কথা বলেছে৷ আমরা বলিনি বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেছে৷ দেশে শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে চারদলীয় জোট আওয়ামী লীগের অন্যায়, অযৌক্তিক, অসঙ্গত সব দাবি এবং রদবদল মেনে নিয়েছে বলে দাবি করেন খালেদা জিয়া৷
তিনি অভিযোগ করেন, যে নীলনকশার নির্বাচন এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা আওয়ামী লীগ আজ বলছে সেসব তারাই করতে চেয়েছিল ২০০১ সালে৷ তাই তারা মনে করে অন্য দলগুলোও এ ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে৷ কিন্তু আমরা সেসব করি না৷ তিনি বলেন, লতিফুর রহমান যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হয়েছিলেন তাতে আওয়ামী লীগের সমর্থন ছিল৷ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার আগে তিনি গিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে; কিন্তু আমরা তার নিয়োগকে মেনে নিয়েছিলাম৷ আমরা মেনে নিয়েছিলাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদকে৷ কিন্তু আমরা মেনে নিতে পারছিলাম না অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সফিউর রহমানকে৷ কারণ তিনি সংবিধান, শৃঙ্খলা ও সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করে উঠেছিলেন আওয়ামী লীগের সৃষ্ট তথাকথিত জনতার মঞ্চে৷ আমাদের দাবির মুখে তখনকার কেয়ারটেকার সরকারের চিফ অ্যাডভাইজর সফিউর রহমানকে ছুটিতে যেতে অনুরোধ করেছিলেন; কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি৷ আমরাও আর এ বিষয়ে এগুইনি৷
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মনঃপূত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান লতিফুর রহমান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ এবং অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সফিউর রহমানের অধীনেই চারদলীয় জোট নির্বাচনে গিয়েছিল৷ কারণ চারদলীয় জোট বিশ্বাস করতো যদি অবাধভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ থাকে তাহলে তারাই বিজয়ী হবে৷ ষড়যন্ত্র নয়, চারদলীয় জোট বিশ্বাস করে সংবিধান৷ চক্রান্ত নয়- চারদলীয় জোট বিশ্বাস করে গণতন্ত্রে, জনগণের শক্তিতে৷
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, গত দু’মাসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ব্যক্তিকেন্দ্রিক দাবির পাশাপাশি অন্য ধরনের দাবিও করেছে৷ তাদের দাবির মুখে নির্বাচন কমিশন মোট চারবার শেডিউল পরিবর্তন করেছে; কিন্তু তাতেও আওয়ামী লীগ তুষ্ট হয়নি৷ এ পর্যায়ে তারা আবার যেসব দাবি তুলেছে তার ফল হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এমপিদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে না৷ অথচ ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানেই লেখা আছে, জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেই এমপিদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে৷ আমরা সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই সেই ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষপাতী৷
খালেদা জিয়া বলেন, নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে তারা এখন ৯০ দিনের সময়সীমা সুপৃম কোর্টের সম্মতিতে বাড়িয়ে নেয়ার কথা বললেও বাস্তবে সুপৃম কোর্টের ওপর তাদের আস্থা আছে কি না সেটাও এখন সবার প্রশ্ন৷ তিনি বলেন, আমরা সুপৃম কোর্টের ওপর আস্থা রাখি৷ আমরা নিশ্চিত, সুপৃম কোর্ট সংবিধানের ব্যাখ্যা দিতে পারে, সংবিধানের বাইরে কিংবা পরিপন্থী কোনো নির্দেশনা দিতে পারে না৷ তাছাড়া আওয়ামী লীগ যে কিসে রাজি তার গ্যারান্টি কে দেবে?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে৷ তারা মুখে বলে যে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং নির্বাচনমুখী৷ বাস্তবতা হলো তারা অবরোধের মাধ্যমে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে৷ মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা হরণ করেছে৷ জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করেছে৷ বাস্তবতা হলো তারা নির্বাচন বর্জন করেছে৷ তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ বলছে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়বে৷ বাস্তবতা হলো দুর্নীতির সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন এবং সর্বোচ্চ আদালতে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত এক ব্যক্তিকে পাশে বসিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ৩ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করেছেন এবং বলেছেন, ওই ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে হবে৷ তিনি আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতার সমালোচনা করে বলেন, আওয়ামী লীগ দাবি করে তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাসী৷ কিন্তু একটি ধর্মীয় দলের সঙ্গে চরম বিতর্কিত একটি লিখিত চুক্তি করেছে৷ আর তারপর বলছে কৌশলগত কারণে এ চুক্তি তারা করেছে৷ এটা আসলে সে দলটির সঙ্গে এবং ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল৷ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছে প্রকৃত সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করা হয়নি৷ বাস্তবতা হলো প্রকৃত সন্ত্রাসীকে নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থীরূপে মনোনয়ন দিয়েছে৷ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বলছে বাংলাদেশের মাটিতে একটি শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা নির্বাচনে যাবে৷ বাস্তবতা হলো তারা দেশে অশান্তি সৃষ্টি তো করছেই, তার ওপর তারা এখন গৃহযুদ্ধের হুমকিও দিচ্ছে৷ এ হুমকি দিয়েছেন সাংবাদিকদের কাছে স্বয়ং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং টিভিতে তাদের সহযাত্রী জনৈক বামপন্থী ভোটবিহীন নেতা৷ খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ বলেছে অবরোধ করে তারা জনগণকে আর কষ্ট দিতে চায় না৷ আওয়ামী লীগ নেত্রী বলেছেন অবরোধের ফলে শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব ক্ষতি হয়েছে তা তিনি পুষিয়ে দেবেন৷ বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগ আবারো অবরোধ ডেকেছে আগামী ৭ ও ৮ জানুয়ারি৷ মানুষ আবারো চরম কষ্ট পাবে৷ বাস্তবতা হচ্ছে কিভাবে ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে সেটা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেননি৷ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বলে তারা সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য সচেষ্ট৷ বাস্তবতা হচ্ছে গত ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা পিটিয়ে হত্যা করেছে সাধারণ মানুষকে এবং তারপর তার মৃতদেহের ওপর উল্লাস করেছে৷ তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগ বলে তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর৷ বাস্তবতা হচ্ছে, গত ১০ নভেম্বর আইনের সর্বোচ্চ স্থান হাই কোর্টে আওয়ামী লীগ সমর্থক উকিল-ব্যারিস্টাররা বাইরের সন্ত্রাসীদের ডেকে এনে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছেন৷
খালেদা জিয়া বলেন, এখন তারা গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে৷ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর জনৈক মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান তাদের দাবি না মানলে সারা দেশে আগুন জ্বলবে৷ বঙ্গভবনের গ্যাস, বিদ্যুত্, পানি এমনকি অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে৷ অক্সিজেন সরবরাহ তিনি কিভাবে বন্ধ করবেন সে প্রশ্ন তুলে বিএনপি প্রধান বলেন, এসব হুমকি কোনো শান্তিপ্রিয়, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক ব্যক্তি বা দলের পক্ষে মানায় না৷
তিনি বলেন, সুপরিকিল্পিতভাবে ঘোষণা দিয়ে গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় লগি-বৈঠা-লাঠি সন্ত্রাসের পর থেকে আওয়ামী লীগ তাদের পথ হারিয়ে ফেলেছে৷ তাই তারা আদর্শ, ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়ে নির্বাচনে জেতার সব পন্থা খুজে বেড়াচ্ছে৷ তাই তারা লাগাতার অবরোধ, হরতাল, ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে জনগণকে বন্দি করে রাখতে চাইছে৷ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ফলপ্রসূ কোনো উপায় আবিষ্কার না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলনের নামে অত্যাচার করবে; কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভের শতভাগ গ্যারান্টি কে তাদের দিতে পারবে সে প্রশ্নও তোলেন তিনি৷
তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে জনসেবা করতে হয়৷ জোট সরকার তা করেছে তাদের পাচ বছরের শাসনামলে৷ তিনি বলেন, ভোটারদের সব আশা আমরা পূরণ করতে পারিনি; কিন্তু অনেক আশাই আমরা পূরণ করেছি৷ অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং র‌্যাব গঠনের মাধ্যমে আমরা সারা দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম৷ দেশবাসী এর সুফল ভোগ করছে দাবি করে তিনি বলেন, শান্তি না থাকলে এ দেশ সমৃদ্ধির পথে এগুতে পারতো না৷ শান্তি ছিল বলেই সবাই যে-যার মতো ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পেরেছেন৷ চাকরি করতে পেরেছেন, নিয়মিত পড়াশোনা করতে পেরেছেন, প্রয়োজনে চিকিত্সা করতে পেরেছেন৷
খালেদা জিয়া বলেন, গত দুই মাসে সারা দেশে যে প্রচণ্ড অশান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করেছে তাতে সবাই বুঝতে পেরেছেন সব সুখ ও সমৃদ্ধির প্রথম শর্তই হচ্ছে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা৷ জোট সরকার সেটাই আপনাদের দিয়েছিল৷ এ প্রসঙ্গে তিনি জোট সরকারের আরো বহু সাফল্যের অংশ হিসেবে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, পলিথিন ব্যাগ ও টু স্ট্রোক যানবাহন নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমানো, উগ্র এবং সহিংস ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও বিচার, নারী শিক্ষা, শিশু মৃত্যুর হার কমানো, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সম্মানজনক অবস্থায় রাখা, দেশে-বিদেশে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করা, ২০০৪ সালে বন্যার সময় কার্যকরভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, চট্টগ্রাম বন্দরের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, রাজধানী ঢাকাকে একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শহরে রূপান্তরিত করার উদাহরণ টানেন তিনি৷
তিনি বলেন, এসব সাফল্যের পর আমরা বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই৷ আমরা জানি বাংলাদেশ একটি কার্যকর ও সফল দেশ হতে পারে৷ আমাদের এ বিশ্বাস ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে আমেরিকার বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের কভার স্টোরিতে এবং মার্চেন্ট ব্যাংকার গোল্ডম্যান স্যাকসের রিপোর্টে৷ আমরা মনে করি আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে দেশ উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো৷ এ জন্য সেই নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয় সে জন্য সাধারণ মানুষের এবং পুলিশ, র‌্যাব, বিশেষত সেনাবাহিনীসহ সব নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন তিনি৷ তিনি বলেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আমাদের সেনাবাহিনী বিভিন্ন দেশে শান্তি রক্ষার জন্য প্রশংসিত হয়েছে৷ আমাদের সেনাবাহিনী যদি বিদেশে শান্তি রক্ষা করতে পারে তাহলে তারা অবশ্যই দেশেও শান্তি রক্ষা করতে পারবে৷
তিনি বলেন, ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে দেশের সব রাজনৈতিক দল অংশ নিলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী হতো৷ আমি এবং আমরা সহকর্মীরা তাই বারবার সবার কাছে আবেদন করেছিলাম সবাই যেন নির্বাচনে অংশ নেন৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে চারদলীয় জোটকে একটি অস্থির পরিস্থিতির শিকার বানাতে চাইছে৷ সীমিতসংখ্যক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা হচ্ছে৷ তাই আমি স্পষ্টভাবে বলে দিতে চাই, আমরা স্বচ্ছ রাজনীতিতে বিশ্বাস করি৷ আমরা খোলা মনে কথা বলি এবং যে কথা বলি সেটা রাখতে সচেষ্ট থাকি৷ আমরা প্রথম থেকেই সংবিধানের আওতায় নির্বাচনে যেতে চেয়েছি৷ এটিই ছিল আমাদের একমাত্র দাবি৷ আমরা আর কোনো দাবি করিনি৷ এখন কোনো দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় এবং তার জন্য যদি নির্বাচনী ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা কম মনে করা হয় তাহলে সেই অপরাধে দায়ী হবে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো নয়৷
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ শান্তি চায়৷ বিএনপি এবং তার সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলোও শান্তি চায়৷ আমাদের সব কার্যক্রমই তার প্রমাণ৷ দেশের অধিকাংশ ভোটার সমর্থিত হওয়া সত্ত্বেও গত দুই মাসে বিএনপি জোট রাজপথে কোনো চ্যালেঞ্জে যায়নি বলে দাবি করেন তিনি৷
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি নির্বাচনের জন্য৷ সে নির্বাচনে এখন আমরা যেতে চাই৷ সে নির্বাচনে আমরা যাচ্ছি এবং বিজয়ী হয়ে দেশবাসীকে আবার সেবা করার সুযোগ চাইছি৷ আশা করি সে সুযোগ দেশবাসী আমাদের দেবেন৷
তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন শুধু বর্জনই নয়, নির্বাচন প্রতিহত করার হুমকিও দিয়েছে আওয়ামী লীগ৷ ৭ ও ৮ জানুয়ারি সারা দেশে অবরোধের পর লাগাতার বঙ্গভবন অবরোধের হুমকি দিয়েছে৷ যে কোনো ধরনের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে৷ সোজা কথায়, একটি নির্বাচনমুখী দেশকে আওয়ামী লীগ আন্দোলনমুখী করার ঘোষণা দিয়েছে৷ একটি শান্তিকামী দেশকে অরাজকতার দিকে তারা ঠেলে দিতে চাইছে৷ একটি সমৃদ্ধিমুখী দেশকে তারা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে৷
তিনি বলেন, জনগণ চায় শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ, সচল ও মুক্ত বাংলাদেশ৷ সেই হাসিখুশি বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং তাকে ধরে রাখার লক্ষ্যেই আমরা নির্বাচনে অংশ নেবো৷ সে লক্ষ্য পূরণে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=24976&issue=184&nav_id=1

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: