শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত মৃতের সংখ্যা ৪০

কনকনে শীতে কাপছে সারা দেশ৷ ঘন কুয়াশায় স্থবির জীবনযাত্রা৷ গতকাল শুক্রবারও শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় বিপর্যস্ত হয় জনজীবন৷ শীতজনিত কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷ দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলসহ প্রায় সারা দেশেই বিস্তৃত ছিল প্রবহমান ঘন কুয়াশা৷ রাজধানীতে সকাল ১০টার পর কিছুটা রোদের দেখা মিললেও কুয়াশা কাটেনি পুরো দিন৷ আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, শৈত্যপ্রবাহ আরো দু’-একদিন অব্যাহত থাকবে৷ গতকাল সবচেয়ে বেশি শীত অনুভূত হয় শ্রীমঙ্গলে৷ সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ ঢাকায় গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ আগের দিন ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে বিগত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে৷
গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল কক্সবাজারে৷ সেখানে ২৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে৷ রাজশাহীতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চট্টগ্রামে ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, খুলনায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সিলেটে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যশোরে ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সাতক্ষীরায় ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও চুয়াডাঙ্গায় ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ গতকাল দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন কুয়াশায় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে এবং সারা দিনই কুয়াশা থাকে৷ আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে শীতের অনুভূতিও তীব্র হয়ে উঠবে৷ চলতি মাসেই আরো দুটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে৷ চলতি মাসের ১০ থেকে ১৫ তারিখ এবং ২০ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং দেশের অন্যত্র মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে৷
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শীতজনিত নানা রোগে ৪০ জনের মৃত্যু সংবাদ জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধিরা৷ সাতক্ষীরায় ২ শিশুসহ ৮ জন, নাটোরে ৬ জন, নীলফামারীতে ৭ জন, ঠাকুরগাওয়ে ৩ জন, কুষ্টিয়ায় ৩ শিশু, বাগেরহাটে ৩ জন, পঞ্চগড়ে ২ জন, সুনামগঞ্জে ২ জন, কেশবপুরে ১ জন, খাগড়াছড়িতে ১ জন, সোনারগাওয়ে ১ জন, চাপাই নবাবগঞ্জে ২ জন ও যশোরে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে৷
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরায় শৈত্যপ্রবাহে ৪ দিন বয়সের দুটি শিশুসহ আটজন মারা গেছে৷ সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল ও মৃতদের পরিবার সূত্র জানায়, তীব্র শীতে গতকাল শুক্রবার ভোর রাতে ও সকালে জেলার পাটকেলঘাটা থানার শার্শা গ্রামের আমিরুল ইসলামের ৪ দিন বয়সের বাবু নামে পুত্র শিশু হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায়৷ হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে একই নামে ও বয়সের সদর উপজেলার পাচরকি গ্রামের আবুল বাসারের শিশুপুত্র মারা যায়৷ এছাড়া কলারোয়া উপজেলার ঝাপাঘাটা গ্রামের আবদুল সরদার (৭০), মোবারক আলী (৬০); একই উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামের মোঃ নাসির উদ্দিন (৭০) ও সাতক্ষীরা শহরের রহিমা বেগম (৬৫) শৈত্যপ্রবাহে মারা গেছেন৷ গতকাল বিকালে মারা গেছেন পাটকেলঘাটা থানার মঈনুদ্দিন সরদার (৬০) ও নুরজাহান বিবি (৭১)৷
নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোরে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ গত দু’দিনে শীতজনিত কারণে এক শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে৷ তারা হলেন নাটোর শহরের পালপাড়া এলাকার সুধীর কুমার (৯০), পটুয়াপাড়া মহল্লার সিরাজুল ইসলাম (৬৫), উত্তর বড়গাছা মহল্লার রবিজান বেওয়া (৭৫) ও মোস্তাফিজুর রহমান (৫৫), হুগোলবাড়িয়া মহল্লার রেজিনা বেওয়া (৭০) এবং শুকুলপট্টি মহল্লার ছয় দিনের একটি শিশু৷ মৃতদের পারিবারিক সূত্র জানায়, শীতজনিত কারণেই উল্লিখিতদের মৃত্যু হয়েছে৷ অন্যদিকে প্রচণ্ড শীত ও কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় মানুষজন ঘর ছেড়ে বাইরে বেরুতে পারছে না৷ দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে৷
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শীতজনিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে কুষ্টিয়ায়৷ এসব রোগে বয়োবৃদ্ধদের পাশাপাশি শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি৷ গত তিন দিনে শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হসপিটালে চিকিত্সা নিতে এসে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে৷ চিকিত্সা নিয়েছে প্রায় অর্ধশত রোগী৷ বর্তমানে হসপিটালের শিশু ওয়ার্ডে ১২ জন চিকিত্সাধীন রয়েছে৷ তাদের বয়স একদিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে৷ হসপিটাল সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার থেকে এ পর্যন্ত হসপিটালে চিকিত্সা নিতে এসে গাংনীর আপন (দেড় মাস), বাবু (তিন দিন) এবং ১০ মাস বয়সের বাবু নামে তিনটি শিশু মারা গেছে৷ এরা শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল৷ বর্তমানে ১০ বেডে ১২টি শিশু চিকিত্সাধীন রয়েছে৷ এছাড়া কুষ্টিয়ার বিভিন্ন ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শতাধিক রোগী শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সা নিচ্ছে বলে জানা গেছে৷
চাপাই নবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শীতের তীব্রতায় চাপাই নবাবগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে কোল্ড ডায়ারিয়া, নিউমোনিয়াসহ অ্যাজমার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ শুক্রবার তীব্র শীতে চাপাই নবাবগঞ্জ সদর ও হসপিটালে এক গর্ভবতী মহিলাসহ দু’জন মারা গেছে৷ হসপিটাল সূত্র জানিয়েছে, পৌর এলাকার হজরাপুর গ্রামের আবদুল খালেকের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা (২০) ও সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের নবজায়গীর গ্রামের ফহিমুদ্দীনের ছেলে দুরুল হোদা (৩৫) নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়৷
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটে প্রবল শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ শুক্রবার অস্বাভাবিক শীতে মহিলাসহ তিন ব্যক্তির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷ তারা হলো জেলার চিতলমারী উপজেলার আড়–য়াবর্ণি গ্রামের মোকতার হোসেনের স্ত্রী আমেনা খাতুন (৫৫), শিবপুর গ্রামের কাঞ্চন শেখ (৭৫) ও আলিঙ্গ গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক মধুসূদন বিশ্বাসের মা নীহারিকা বিশ্বাস (৯০)৷ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও কনকনে শীতে মানুষের জীবন যাত্রা দৃশ্যত অচল হয়ে পড়েছে৷ শীতের কবলে ঘরে ঘরে কোল্ড ডায়রিয়াসহ শীত জনিত নানা রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সূত্রে জানা গেছে, শীত জনিত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত দুদিনে আশংকা জনক বৃদ্ধি পেয়েছে৷ আক্রান্তদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধরাই অধিক বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন৷
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শীতজনিত রোগে গতকাল পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলেয়াপাড়ার লতিফা বেওয়া (৯০) এবং হাড়িভাসা ইউনিয়নের দামুপাড়ার জসিমন নেছা (৭০) নামে দুই বৃদ্ধার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে৷ এনিয়ে গত চার দিনে জেলায় শীত ও শীতজনিত রোগে ১৮ জন মারা গেল৷ তবে জেলা প্রশাসন বা স্বাস্থ্য বিভাগ কেউই শীতের কারণে কারও মারা যাওয়ার কথা স্বীকার করেনি৷ পঞ্চগড়ের শীতার্ত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ইতিমধ্যে ছয় হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে৷ জেলা প্রশাসক মোঃ হাফিজ উদ্দিন নিজেই কিছু এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে এসব কম্বল বিতরণ করেন৷ তিনি জানান, আরও দুই হাজার কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে৷ এদিকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার সীমান্ত ফাঁড়িতে স্থাপিত একমাত্র আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটি বর্তমানে অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে৷ ফলে তীব্র শীত ও শৈত্যপ্রবাহ এ জেলার উপর দিয়ে বয়ে গেলেও সঠিক তাপমাত্রা জানা সম্ভব হচ্ছেনা৷ ক্ষুব্ধ লোকজন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন৷
নীলফামারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গত চারদিনে নীলফামারী জেলার ছয়টি উপজেলার উপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে৷ এরই মধ্যে শীত জনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ সারাদিন সুর্যের মুখ দেখা যায়নি৷ গতকাল শুক্রবার সদরের উকিলপাড়ায় আব্বাস আলী (৬২) নামক আরো ১ জনের মৃত্যু হওয়ায় মৃত্যের সংখ্যা দাড়ালো ৮ জনে৷ শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় দিন মজুর ও ছিন্নমূল মানুষরা শীত বস্ত্রের অভাবে নিদারুন কষ্টে দিনাতিপাত করছে৷
ফেনী প্রতিনিধি জানান, প্রচণ্ড শীতে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে ফেনীর জনজীবন৷ গত দুদিনে সূর্যের দেখা মেলেনি৷ খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন ঘর ছেড়ে বাইরে যায়নি৷ বিশেষ করে সন্ধ্যার পর লোকজনের চলাফেরা কমে গেছে৷ ফেনী রেলওয়ে স্টেশন, রাজাজী দীঘিরপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে বসবাস করা ভাসমান লোকজনের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন৷ এমন ১০/১২ জনকে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ ঘরে ঘরে শিশুদের অনেকেই নিউমোনিয়া, কোল্ড ডায়ারিয়া ও সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে৷ সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ফেনী সদর হাসপাতালে ২০/২২টি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে৷
সোনারগাঁও সংবাদদাতা (নারায়ণগঞ্জ) জানান, শীতের প্রচণ্ড তীব্রতায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় সোনারগাও উপজেলার কাচপুর ইউনিয়নের উত্তর কাচপুর গ্রামের মোঃ কামালউদ্দিনের স্ত্রী ছাবেদা খাতুন (৫০) এর মৃত্যু হয়েছে৷
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জ জেলার সর্বত্র শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে৷ ঘন কুয়াশায় দিনভর আকাশ ঢেকে থাকার কারণে দু’দিন ধরে সূর্যের দেখা প্রায় মিলছেই না৷ তীব্র শীত ও কুয়াশায় সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাপানি ইত্যাদি রোগ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে৷ হাওর অঞ্চলে ঘন কুয়াশার কারণে নৌ যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷ সড়ক পথেও দিনের বেলায় লাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে৷ প্রচণ্ড শীতের কারণে অনেক মানুষ সহজে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না৷ বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ শীতের কারণে কাজে বের হতে না পারায় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে৷
মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, গত দুই দিনের টানা শৈত্যপ্রবাহে মাদারীপুরে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে৷ ঘন কুয়াশার কারণে রাস্তাঘাট ছিল মানুষশূন্য৷ বেশির ভাগ হাট-বাজারের দোকানপাট ছিল বন্ধ৷ নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি৷ শৈত্যপ্রবাহের কারণে নিম্ন আয়ের ও ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়৷ অনেককে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে৷ শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে ক্ষণিকের জন্য সূর্যের মুখ দেখা গেলেও তা ছিল স্বল্প সময়ের জন্য৷
কেশবপুর সংবাদদাতা (যশোর) জানান, হাড় কাপানো শীত ও শৈত্যপ্রবাহে কেশবপুরের বাগদাহ গ্রামে আতিয়ার রহমান (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে শুক্রবার সকালে৷ তিনি ঠাণ্ডাজনিত রোগে ভুগছিলেন৷ গত তিনদিনের তীব্র শীতে মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে৷ দুপুর পর্যন্ত সূর্য দেখা যায়নি৷ দুপুরের পর কুয়াশা কিছুটা কমলে লোক চলাচল শুরু হয়৷
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার দিরাই উপজেলায় তীব্র শীতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে৷ তারা হলো-রাজানগর ইউনিয়নের আব্দুস সোবহান (৬৫) ও ইসলামপুর গ্রামের কারা মিয়া (৭০)৷
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, জেলার আটটি উপজেলায় হাড় কাপানো শীত পড়েছে৷ দিনরাত অনবরত কুয়াশা ঝরছে৷ শীতজনিত রোগে জেলার দীঘিনালা উপজেলায় এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে৷ পাহাড়ি এ জেলায় অবিলম্বে শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা না হলে বৃদ্ধ ও শিশুসহ অনেক মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে৷ বিত্তবান মানুষরা শীতবস্ত্র ব্যবহার করে পরিত্রাণ পেলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী শীতবস্ত্রের অভাবে সীমাহীন কষ্টে দিনাতিপাত করছে৷ গত কয়েক দিনে পার্বত্য এ জেলায় তাপমাত্রা আট থেকে নয় ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে৷ এদিকে স্থানীয় কৃষিবিদরা জানান, ঘন কুয়াশার কারণে বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হচ্ছে না সহজে৷
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাওয়ে শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে৷ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন৷ গত ২৪ ঘণ্টায় শীত ও শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে আরো তিনজন মারা গেছে৷ তারা হলো সদর উপজেলার মুজাবর্ণী গ্রামের রাজেন্দ্রনাথ (৪৮), রানীশংকৈল উপজেলার বেতবাড়ী গ্রামের হরিমোহন বর্মন (৭০), পীরগঞ্জ উপজেলার দম্পতিপুর গ্রামের নাজিম উদ্দিন (৫২)৷ এ নিয়ে গত পাচদিনের শৈত্যপ্রবাহে মৃতের সংখ্যা দাড়ালো সাতজনে৷ শুক্রবারও দুপুর ২টা পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায়নি৷ গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ছে৷ সঙ্গে বইছে হিমেল হাওয়া৷ ফলে জেলার লক্ষাধিক দুস্থ, ছিন্নমূল ও শীতার্ত মানুষদের দুর্ভোগ এখন চরমে৷ তারা খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের আপ্রাণ চেষ্টা করছে৷ পাচদিন ধরে শৈত্যপ্রবাহ চললেও শীতার্তদের মাঝে এখনো কেউ গরম কাপড় বিতরণ করেনি৷ গত ২৪ ঘণ্টায় ঠাকুরগাও সদর হাসপাতালসহ উপজেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকে শতাধিক শিশু ও বৃদ্ধ কোল্ড ডায়ারিয়া, রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে৷
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, তীব্র শীতে কাপছে মেঘনা পাড়ের জনপদ চাঁদপুর৷ গতকাল শুক্রবার স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের হিসেবে এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ শীতের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝেকে বসেছে ঘন কুয়াশা৷ ফলে রাজধানী ঢাকা থেকে চাঁদপুর হয়ে দক্ষিণবঙ্গসহ কয়েকটি রুটে নৌচলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে৷ এ কারণে যাত্রীবাহী সব লঞ্চ নির্ধারিত সময়ের ৮-১০ ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌছেছে৷ শীতের তীব্রতায় জেলার জনজীবনেও দুর্ভোগ নেমে এসেছে৷
ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, প্রচণ্ড শীত ও ঘন কুয়াশায় ঝালকাঠী জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ আলু বোরো চাষাবাদ বিঘ্নিত হওয়াসহ বয়লার-লেয়ার মুরগী ব্যাপক হারে মারা যাওয়ায় পোল্টি ফার্মের মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে৷ জেলার ৪টি উপজেলার টিনের ও খাচার ঘর বানিয়ে ফার্ম করা ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছে৷ গত ২ দিনে প্রায় এক হাজার বয়লার ও লেয়ার মুরগী মারা গেছে৷ এরমধ্যে ইদ্রিস মিয়ার শতাধিক, বশির খানের ২ শতাধিক ও দুলাল হাংয়ের শতাধিক মুরগী মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে৷ শীতের কারণে শিশু ও বয়স্করা শ্বাস প্রদাহ জনিত প্রভাব রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে স্থান সংকুলন হচ্ছে না৷
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, ৪দিনের ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহ কেটে গিয়ে গতকাল শুক্রবার দুপুরে সুর্যের মুখ দেখা গেছে৷ তবে গত রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত বৃষ্টির মত কুয়াশা পড়ে৷
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইলে হাড় কাপানো শীত পড়েছে৷ সূর্যের মুখ সারাদিনই ঢেকে থাকছে কুয়াশার আড়ালে৷ গরম কাপড়েও শীত মানছে না- পরিস্থিতি এরকম৷ সকাল ও রাতের বেলা শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি৷ রাত ৮টার পর শহরের রাস্তাঘাট-হাট বাজার মানুষ শূন্য হয়ে পড়ে৷ খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া এ সময় মানুষ ঘরের বাইরে বের হয় না৷ গ্রামাঞ্চলে শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি৷ বিশেষ করে মধুপুর ও যমুনার চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই৷
স্টাফ রিপোর্টার যশোর থেকে জানান, প্রচণ্ড শীতে যশোরের জন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে৷ গত দুদিন যশোরে ৭ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় স্বাভাবিক কাজ কর্ম ব্যহত হচ্ছে৷ গতকাল শুক্রবার শীতে ভবঘুরে গোলজার হোসেন (৪০) যশোর জেনারেল হাসপাতাল মারা গেছে৷ শৈত প্রবাহ আর কুয়াশায় যান চলাচল ব্যহত হচ্ছে৷ এ কারণে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের গাড়িও বিলম্বে পৌছাচ্ছে৷ সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা ঘাট ফাকা হয়ে যাচ্ছে৷ পুরাতন মার্কেটে শীত বস্ত্র বিক্রি কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে৷ মানুষের পাশাপাশি গরু ছাগলের শরীরেও চটের বস্তা, পুরাতন কাপড় দিয়ে রাখতে দেখা যাচ্ছে৷ শীতে অনেকের হাস মুরগী মরে গেছে৷
সৈয়দপুর সংবাদদাতা জানান, তীব্র শীতে প্রায় সহস্রাধিক নারী পুরুষ শীত জনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে৷ এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধই বেশি৷ তারা সর্দি জ্বর কাশিসহ কোল্ড ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে৷ হাসপাতাল ও বিভিন্ন প্রাইভেট চিকিত্সা কেন্দ্রে ওইসব রোগীদের ভিড় দেখা গেছে৷ বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে গতকাল (শুক্রবার) সারাদিনই ঘন কুয়াশায় ঢেকে ছিল জনপদ৷ সেই সঙ্গে বয়ে যাচ্ছে হিমেল বাতাস৷ গোটা এলাকা ছিল কুয়াশার চাদরে ঢাকা৷ কনকনে ঠাণ্ডায় অভাবী ও মজুর শ্রেণীর লোকজনের দুর্ধশা চরমে পৌছেছে৷ প্রচণ্ড শীতের কারণে তারা কাজে যেতে পারেনি৷ ফলে এসব শ্রেণীর মানুষেরা পরিবার পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে৷ অনেকে শীত বস্ত্রের অভাবে খড়কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে৷ শীতবস্ত্র কিনতে গতকাল শুক্রবার শহরের শহীদ ডা. শামসুল হক সড়কসহ পুরাতন কাপড় মার্কেটে উপচে পড়া ভীড় দেখা যায়৷ তবে দাম চড়া হওয়ায় নিম্ন আয়ের লোকজনের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না৷ শীতার্তদের জন্য সরকারীভাবে যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম৷ অতিরিক্ত শীতবস্ত্র চেয়ে জেলা প্রশাসন ত্রান মন্ত্রণালয়ে জরুরী ফ্যাক্সবার্তা পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=24978&issue=184&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: