মহাজোটকে ভোটে আনার শেষ চেষ্টাও পথ হারালো

সংবিধান ও আইনের বাইরে গিয়ে মহাজোটকে ভোটে নিয়ে আসার সর্বশেষ চেষ্টায়ও সাফল্যের কোনো পথ খুজে পাননি উদ্যোক্তারা৷ মূলত আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা, যারা নির্বাচনে যেতে ইচ্ছুক তাদের অনুরোধেই এবারের উদ্যোগটি নিয়েছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক বিদেশি ডিপ্লম্যাট৷ উদ্যোগের সাফল্য নিশ্চিত করতে তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন আরো এক প্রভাবশালী ডিপ্লম্যাটকে৷ এরপর তিনদিন ধরে তারা দু’জনে নানামুখী দৌড়ঝাপ করলেও তাতে কোনো ফল হয়নি৷ আওয়ামী লীগের একাংশের অনুরোধে তারা উদ্যোগ নিলেও তাতে পজিটিভি কোনো সায় দেননি মহাজোটের নেত্রী শেখ হাসিনা৷ তিনি শেডিউল পাল্টিয়ে নির্বাচনের সময় পেছানোর পাশাপাশি আরো বেশ কিছু দাবির ফর্দ ধরিয়ে দেন দুই ডিপ্লম্যাটের হাতে৷ সেসব দাবি নিয়ে ডিপ্লম্যাটরা চার দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে গেলে তিনি সবকিছুর আগে একটি শর্ত পূরণের জন্য বলেন৷ শর্তটি হলো, আগে মহাজোট নেত্রীকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে, দাবিগুলো পূরণের পর তারা নির্বাচনের মাঠ ছেড়ে যাবেন না; কিন্তু চার দল নেত্রীর এ শর্ত মানতে রাজি হননি মহাজোট নেত্রী৷ আর সে কারণেই আপাতত পথ হারিয়েছে দুই ডিপ্লম্যাটের উদ্যোগ৷
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের যে অংশটি নির্বাচনে যেতে প্রবল আগ্রহী, মূলত তাদের অনুরোধেই নেয়া হয়েছিল শেষ উদ্যোগটি৷ সে অনুযায়ী উদ্যোক্তা দুই ডিপ্লম্যাট গত শনিবার রাতে প্রথম গিয়েছিলেন সুধা সদনে৷ সেখানে মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তারা৷ জানা যায়, বৃটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী ও আমেরিকান অ্যামাবাসাডর প্যাটৃসিয়া এ বিউটেনিস শেখ হাসিনার কাছে গিয়েছিলেন একটি ফর্মুলা নিয়ে৷ সে ফর্মুলার সারবস্তু হলো, সুপৃম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে নির্বাচন দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়া; কিন্তু শেখ হাসিনা এ ফর্মুলার ব্যাপারে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে দুই ডিপ্লম্যাটকে বলেছেন, আগে বিষয়টি সুপৃম কোর্টে পাঠানো হোক৷
পরদিন রবিবার সন্ধ্যায় আনোয়ার চৌধুরী ও বিউটেনিস যান চার দল নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে৷ সেখানেও একই ফর্মুলা উপস্থাপন করেন তারা৷ কিন্তু খালেদা জিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন কোনো শর্ত পূরণের আগে শেখ হাসিনাকে অবশ্যই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে, নির্বাচন দুই সপ্তাহ পেছালে তারা আর ভোটের মাঠ ছেড়ে যাবেন না৷ কিন্তু দুই ডিপ্লম্যাট এমন কোনো নিশ্চয়তা খালেদা জিয়াকে দিতে পারেননি৷ মূলত তখনই এ উদ্যোগের সমাপ্তি ঘটে৷
অন্যদিকে কেয়ারটেকার সরকারের তিন অ্যাডভাইজর গত রবিবার দুপুরে হঠাত্ করেই গিয়ে হাজির হন বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার গুলশানের বাসায়৷ অ্যাডভাইজর মাহবুবুল আলম, ড. শোয়েব আহমেদ ও সফিকুল হক চৌধুরী সেখানে অবস্থান করেন এক ঘণ্টারও বেশি সময়; কিন্তু মান্নান ভূঁইয়ার বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিন অ্যাডভাইজর প্রথমে কিছুই বলতে চাননি৷ তবে মাহবুবুল আলম গাড়িতে ওঠার সময় কয়েক সেকেন্ড দাড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এসেছি সৌজন্য সাক্ষাতে৷ এখানে রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে ভাসা ভাসা কিছু আলোচনা হয়েছে৷ এর বেশি কিছু নয়৷ অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ৯০ দিনের বাইরে গিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সুপৃম কোর্টের মতামত চাওয়ার বিষয়ে মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন তিন অ্যাডভাইজর; কিন্তু মান্নান ভূঁইয়া স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন কিছু করার আগে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে, তিনি নির্বাচনে থাকবেন৷ তা না হলে নতুন কোনো উদ্যোগেই সাড়া দেবে না চার দল৷ মান্নান ভূঁইয়ার এমন কড়া মনোভাবের কারণে উদ্যোক্তা তিন অ্যাডভাইজর বিষয়টি নিয়ে আর সামনে অগ্রসর হননি৷ এর ফলে অ্যাডভাইজরদের উদ্যোগটিও পথ হারায় দ্রুত৷ এ পরিস্থিততে চলতি শেডিউল অনুযায়ী আগামী ২২ জানুয়ারি ভোট গ্রহণের ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ-সংশয় রইলো না বলেই মনে করা হচ্ছে৷
কেয়ারটেকার সরকারের বর্ষীয়ান অ্যাডভাইজর এম আজিজুল হক গতকাল দিনের বেলায় সচিবালয়ে তার অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বলেছেন, মহাজোট নির্বাচন থেকে সরে দাড়ানোয় বেশ কয়েকজন প্রার্থী এরই মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন৷ এর ফলে নবম পার্লামেন্ট আংশিকভাবে গঠিত হয়ে গেছে৷ সুপৃম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে নির্বাচন পেছানোর ক্ষেত্রে এটিই এখন সবচেয়ে বড় জটিলতা৷ তিনি জানান, কেয়ারটেকার সরকারের তিন অ্যাডভাইজর সঙ্কট সমাধানের উপায় নিয়ে অচিরেই মহাজোটের সঙ্গে আলোচনা করবেন৷ এ জন্য তারা মহাজোটের নেতাদের কাছে সময় চেয়েছেন৷ নেতারা সময় দিলেই তাদের সঙ্গে তিন উপদেষ্টা কথা বলবেন৷
অন্য অ্যাডভাইজর ধীরাজ কুমার নাথ সাংবাদিকদের বলেন, সময় খুবই কম৷ হাতে যে সময় আছে এর মধ্যে নতুন আলোর সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে৷ তিনি বলেন, রাজনীতিবিদরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু এখন তারা দুই মেরুতে অবস্থান করছেন৷
শেষ পর্যন্ত উপদেষ্টারা ব্যর্থ হবেন কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ধীরাজ কুমার নাথ বলেন, আমাদের ব্যর্থতা বলবো না৷ আমরা সফল হয়েছিলাম৷ রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম বলেই তারা সবাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল; কিন্তু এখন নতুন করে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে৷ চলমান সঙ্কটের জন্য উপদেষ্টা পরিষদ দায়ী কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা দায়ী নই৷
এদিকে আমেরিকান অ্যামবাসাডর প্যাটৃসিয়া এ বিউটেনিস গতকাল সোমবার বিকালে হঠাত্ দেখা করেছেন দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের সঙ্গে৷ বারিধারায় এরশাদের বাসায় এ বৈঠকের পর বিউটেনিস উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে সব দলের অংশ নেয়ার সুযোগ এখনো আছে৷ তবে কিভাবে সেটা সম্ভব, এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি তিনি৷ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নির্বাচন বর্জন করায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এখনো আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব৷ নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য তিনি এরশাদের প্রতি আহ্বান জানান৷ তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না৷ এ গ্রহণযোগ্যতার সমস্যাটি আইনগত নয়, রাজনৈতিক৷
বিউটেনিসের পর জার্মান অ্যামবাসাডর ফ্রাঙ্ক মেয়াক ও ইওরোপিয়ান ইউনিয়নের অ্যামবাসাডর স্টিফেন ফ্রউইন এরশাদের সঙ্গে দেখা করেন৷ তবে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=25343&issue=187&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: