কুমিল্লায় নির্বাচনী সফরে খালেদা জিয়া নির্বাচনে বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচন বানচালের চেষ্টা নস্যাত্ করে দেয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন৷ তিনি বলেছেন, তাদের এমনভাবে প্রতিহত করুন যাতে আগামীতে তাদের আর ভোট চাওয়ার অধিকার না থাকে৷ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া দলগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে চারদলীয় জোট নেত্রী বলেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার, গণতান্ত্রিক অধিকার৷ কিন্তু যারা নির্বাচনে অংশ নিতে চায় তাদের বাধা দেয়ার অধিকার কারো নেই৷ তিনি আরো বলেন, নির্বাচন পেছানোর ক্ষমতা কেয়ারটেকার সরকারের নেই৷
গতকাল বুধবার দুপুরে কুমিল্লার চান্দিনায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পথসভা ও সন্ধ্যায় পদুয়ার বাজারে জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন৷ একই দিন দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা কুমিল্লা-৮ (সদর) আসনের বিভিন্ন গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় ধানের শীষের জন্য ভোট চান বিএনপি প্রধান৷
চান্দিনা মহাসড়কের পাশে পালকি সিনেমা হল সংলগ্ন মাঠে মিনিট দশেকের বক্তৃতায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া আরো বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা দলগুলোর আন্দোলন শহরকেন্দ্রিক৷ সারা দেশ এখন নির্বাচনমুখী৷ মানুষ ২২ জানুয়ারি ভোট দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছে৷ কিন্তু নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয়ে একটি রাজনৈতিক জোট নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করছে৷ তারা অবরোধ, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে৷ অযৌক্তিক কর্মসূচি দিয়ে জনগণকে জিম্মি করছে৷
চান্দিনা উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও কুমিল্লা-৬ আসনের চারদলীয় প্রার্থী খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় খালেদা জিয়া আরো বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের সতীর্থ সংগঠনগুলোর সব দাবি মেটার পর তারা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল৷ কিন্তু জরিপ চালিয়ে নিজেদের পরাজয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তারা ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন বর্জন করেছে৷
২২ জানুয়ারির নির্বাচনকে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, এ নির্বাচন আমাদের অধিকার, সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন৷ এ নির্বাচন উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার৷
তিনি বলেন, ২০০১ সালে জনগণ আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি দিয়েছিল৷ কারণ তারা চেয়েছিল উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য, লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ৷ জোট সরকার জনগণকে তা উপহার দিয়েছে৷
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে ছিল সন্ত্রাসের রাজত্ব৷ মানুষ ছিল নির্যাতিত৷ কিন্তু আমরা ক্ষমতায় আসার পর গডফাদারদের রাজত্ব শেষ করে সন্ত্রাস দূর করেছি৷ পরীক্ষার হলে এখন নকল নেই৷ লেখাপড়া করে ছেলেমেয়েরা ভালো ফল করছে৷
উন্নয়নের ধারা ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ এখন এমাজিং টাইগার ও গোল্ডেন বয় হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাক, তা অনেকেই চাচ্ছে না৷ তাই তারা বাংলাদেশকে দুর্বল করে রাখার চক্রান্ত করছে৷ ১৪ দল নামে কিছু সংগঠন নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে৷ দেশে ঠিকমতো লেখাপড়া হোক, উত্পাদন ও রফতানি বাড়–ক তা তারা চায় না৷ কিন্তু জোট সরকারের সুদক্ষ পরিচালনায় আজ বাংলাদেশের অনেক কিছুই রফতানি হচ্ছে৷ দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ও গড় আয়ু বাড়ছে৷ অর্থনীতি জোরদার হচ্ছে৷ এগুলো অনেকেরই পছন্দ হচ্ছে না৷ কারণ তারা ক্ষমতায় থেকে এসব করতে পারেনি৷ এখন তারা মহাজোট করে মহাবিপাকে পড়েছে৷
খালেদা জিয়া বলেন, প্রতি নির্বাচনে আগেই নতুন ভোটার লিস্ট হয়৷ সে অনুযায়ী ২০০৫ সালে আমরা ভোটার লিস্টের কাজ শুরু করেছিলাম৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ তখন সে কাজে বাধা দিয়েছে৷ তারা কোর্টে গেছে৷ কোর্ট রায় দিয়েছে হালনাগাদের৷ সে অনুযায়ী কাজও চলছে৷ ভোটার তালিকা সংশোধন চলমান প্রক্রিয়া৷ তিনি আরো বলেন, তাদের দাবি অনুযায়ী কে এম হাসান দায়িত্ব নিলেন না৷ এম এ আজিজ ছুটিতে গেলেন৷ প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল হলো৷ এখন তারা নতুন করে নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলছে৷ কিন্তু সে দাবি পূরণের ক্ষমতা কেয়ারটেকার সরকার কেন, কারোরই নেই৷ সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন হতে হবে৷
চান্দিনার সভায় খোরশেদ আলমের পক্ষে ভোট চেয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, যারা শহীদ জিয়ার রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে এলডিপিতে যোগ দিয়েছে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে৷
চান্দিনার পথসভা শেষে নিজ নির্বাচনী আসন কুমিল্লা-৮ (সদর)-এর উদ্দেশে রওনা হয় খালেদা জিয়ার গাড়িবহর৷ দুপুর সোয়া ১টার দিকে মহাসড়ক থেকে নেমে তার গাড়িবহর রওনা হয় মফস্বলের দিকে৷ প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ধনুয়াখলা, বল্লভপুর, কালীর বাজার ও হাতিগাড়ী এবং কুমিল্লা সদরের ধর্মপুর, চম্পকনগর, কান্দিরপাড়, দুর্গাপুর, শঙ্করপুর, আড়াইওড়া, হাসপাতাল রোড, ধীরেন্দ্রনাথ সড়ক, বাদুরতলা, চর্যা, চকবাজার, রাজগঞ্জ, মোগলটুলীসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গণসংযোগ শেষে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে খালেদা জিয়া পৌছেন কুমিল্লা সার্কিট হাউসে৷
সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন খালেদা জিয়া৷ সবাইকে আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে জনগণকে ভোট দেয়ার ব্যাপারে উত্সাহ জোগানোর পরামর্শ দেন তিনি৷
পদুয়ার বাজারে নবনির্মিত খালেদা জিয়া মঞ্চে জনসভা শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টায়৷ সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে আমরা কি কি করেছি তা জনগণ জানে৷ আমরা চাই সব উন্নয়নের সুফল জনগণ ধারাবাহিকভাবে পাক৷ তাই নিজেদের প্রয়োজনেই জনগণ আবারো আমাদের নির্বাচিত করবে৷ আর নির্বাচিত করার পর যে কাজগুলো বাকি ছিল সেগুলো আমরা শেষ করবো৷ তিনি বলেন, মহাজোট করেও আওয়ামী লীগের তেমন লাভ হয়নি৷ উল্টো মনোনয়ন নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়েছে৷ তারা জরিপ করে দেখেছে নির্বাচনে জিততে পারবে না৷ তাই নির্বাচন বয়কট করে নিজেদের ঘরে ঢুকে পড়েছে৷
১৭টি আসনে চারদলীয় জোট প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিছুটা হয়েই গেছে৷ এখন আর পেছানোর সুযোগ নেই৷ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে৷ হতেই হবে৷
জনগণ যাতে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সে জন্য আর্মি, বিডিআর, পুলিশ, আনসার ইত্যাদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বয়ে সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে বলে সবাইকে অভয় দেন খালেদা জিয়া৷ তিনি মা-বোনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা সকাল সকাল ভোট দেবেন৷ ভোট দেয়া নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার৷ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে যথাযথভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে৷
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, তারা যতোবার ক্ষমতায় এসেছে ততোবারই দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে গেছে৷
খালেদা জিয়া বলেন, কিন্তু মানুষ এখন নির্বাচনমুখী৷ তাই তাদের আন্দোলনে সাড়া দেয় না৷ লগি-বৈঠা দিয়ে যারা মানুষ খুন করে জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে৷
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রমনা৷ রক্ত দিয়ে যে গণতন্ত্র এনেছি, সে গণতন্ত্র আমরা রক্ষা করবো৷ কেউ গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারার না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি৷
এ সময় নিজ নির্বাচনী আসন কুমিল্লা-৮ (সদরে) ভোট চান খালেদা জিয়া৷ তার নেতৃত্বাধীন জোট আবারো ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিতে পারবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি৷
কুমিল্লা সদর উপজেলা (দক্ষিণ) সভাপতি এস এ বারীর সভাপতিত্বে পদুয়ার বাজারের জনসভায় অন্যদের মধ্যে বিএনপি স্থায়ী কমিটির মেম্বার ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব হারিছ চৌধুরী, কুমিল্লা-৯ আসনে চারদলীয় জোট প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী, বিএনপি কেন্দ্রীয় সহসভাপতি রাবেয়া চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী রাজিয়া ফয়েজ, কুমিল্লা-১২ (চৌদ্দগ্রাম) আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত চারদলীয় প্রার্থী আবদুল্লাহ মোঃ তাহের, কুমিল্লা-১১ আসনের চারদলীয় প্রার্থী আবদুল গফুর ভুইয়া প্রমুখ বক্তব্য রাখেন৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=25566&issue=189&nav_id=1

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: