বিচার বিভাগ পৃথক করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পে কমিশন বিধিমালা আপিল বিভাগে উপস্থাপন, বাকি ৩টি রবিবারে

সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জারিকৃত বিধিমালার মধ্যে জুডিশিয়াল পে কমিশন সম্পর্কিত বিধিমালা গতকাল বুধবার সুপৃম কোর্টের আপিল বিভাগে উপস্থাপন করা হয়েছে৷ বাকি তিন বিধিমালা আগামী রবিবার আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ৷ সরকারের জারিকৃত এসব বিধিমালা আপিল বিভাগ প্রণয়ন করেছিল৷ গত ১০ জানুয়ারি পরবর্তী সাতদিনের মধ্যে চার বিধিমালা জারির নির্দেশ দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত৷ সময়সীমার শেষ দিন ১৬ জানুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিধিমালা চিফ অ্যাডভাইজরের কাছে পাঠান৷ এরপর প্রেসিডেন্Uরে অনুমোদন সাপেক্ষে ওই দিনই এগুলো জারি করা হয়৷
এ চার বিধিমালা হলো জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা, জুডিশিয়াল পে কমিশন বিধিমালা, জুডিশিয়াল সার্ভিসে লোক নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ সংক্রান্ত বিধিমালা এবং জুডিশিয়াল সার্ভিসে চাকরিজীবীদের কর্মস্থল, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুর, নিয়ন্ত্রণ ও চাকরির অন্যান্য শর্ত সম্পর্কিত বিধিমালা৷
গতকাল বুধবার রাষ্ট্রের প্রধান আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী চারটি বিধির একটি চিফ জাস্টিস সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে উপস্থাপন করে বলেন, অন্যান্য বিধিগুলো ছাপা হচ্ছে৷ একটি এসেছে, তিনটি এখনো ছাপাখানায় রয়েছে৷
আদালত বলে, বাকি বিধিগুলো দিচ্ছেন না কেন? এটা তো পে কমিশনের বিধিমালা৷ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা কোথায়?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালতের সংশোধিত বিধিমালাগুলো ছাপা শুরু হয়েছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে৷ আদালত বলে, আমরা ওইগুলো দেখতে চাই৷ এ সময় আদালত সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলে, ‘সুন্দর সকাল দেখে বোঝা যায় দিন কেমন যাবে? (মর্নিং শোজ দি ডে)৷’
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘উজ্জ্বল দিন (ব্রাইট সানি ডে)৷’
আদালত এ সময় ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন সংক্রান্ত আপিল বিভাগের নির্দেশনার অবস্থা সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জানতে চান৷ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এর জন্য একটু সময় লাগবে৷ তবে ১০ দিনের মধ্যেই ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন৷ তখন আদালত এই নির্দেশনা জারি করে তা আদালতে উপস্থাপন করার জন্য বলে৷
বিচার বিভাগ পৃথকের বিষয়ে ১৯৯৯ সালে মাজদার হোসেন মামলার রায়- সাত বছরে দুই নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলেও তাদের সদিচ্ছার অভাবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে৷ আইনজীবীরা মনে করেন, সরকারের এ পদক্ষেপ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে কারণ বিচারকরা এখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন৷ আদালতের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে৷
১৯৭২ সালে সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিধান রাখা হলেও সংবিধানেরই অন্য বিধান ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে কার্যত বিচার বিভাগ হয় পরাধীন৷ সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন৷’ আবার অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ১১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বিচার বিভাগীয় পদে বা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দান করিবেন৷’
কিন্তু সুপৃম কোর্টের প্রণীত এসব বিধিমালার অধীনে বিচার করার জন্য লোক নিয়োগ করবে কেবল জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন৷ এতোদিন সহকারী বিচারক নিয়োগ করতো পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে৷ আবার বর্তমানে যেসব ম্যাজিস্ট্রেট বিচারের কাজ করছেন তাদের জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন নিয়ন্ত্রণ করবে৷ এতোদিন তাদের সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো৷ ধারণা করা হয়, এ প্রক্রিয়ায় বিচারক নিয়োগে সরকারের প্রভাব থাকবে না৷
সুপৃম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক যায়যায়দিনকে বলেন, এ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন প্রেসিডেন্ট গঠন করলেও এতে বিচার বিভাগীয় লোকদের প্রাধান্য থাকবে এবং বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা দেয়া হবে৷ আর বিচারকদের বদলি ও নিয়ন্ত্রণ করবে সুপৃম কোর্ট৷
এদিকে বিচার বিভাগ পৃথক করতে গিয়ে আদালতের নির্দেশনা বিকৃত করায় যে নয় মধ্যপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করা হয়েছিল তারা বরাবরের মতো গতকালও আপিল বিভাগে উপস্থিত ছিলেন৷ আগামী রবিবার বিধিমালা উপস্থাপনের দিন তাদের উপস্থিত থাকতে আদালতের আদেশে বলা হয়েছে৷
২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সাতদিনের মধ্যে তাদের প্রণীত বিধিমালা জারির নির্দেশ দিয়েছিল৷ এক সপ্তাহের মধ্যে আদালতের এ আদেশ বাস্তবায়ন না করা হলে সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি আদালত অবমাননার রুল জারি করা হবে বলে আদালত মন্তব্য করে৷
১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাজদার হোসেন মামলার রায়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ সংক্রান্ত ১২ দফা নির্দেশনা দেয় সরকারের প্রতি৷ বিভিন্ন সময় সরকার নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্পর্কিত বিবরণ আদালতে পেশ করে এবং আদালত থেকে সময় নেয়৷ গত দুই সরকার মিলে ২৪ বার সময় নেয়ার পর আপিল বিভাগ সরকারের আবেদন নামঞ্জুর করে৷ সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৭ নভেম্বর ৬ সপ্তাহের সময় দিয়ে পৃথকীকরণের বিষয়টি আদালতে অবহিত করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়৷
এদিকে আদালতের নির্দেশনা বিকৃত করে নিজেদের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করায় আপিল বিভাগ স্ব-প্রণোদিত হয়ে ২০০৪ সালের ২৯ নভেম্বর নয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করে৷ তারা হলেন, তত্কালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব লোকমান হাকিম, বদরুল আলম তরফদার, আবদুর রউফ হাওলাদার, উপসচিব আঃ কালাম আজাদ চাকলাদার, আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঃ সফিকুল ইসলাম তালুকদার, সহকারী সচিব মোঃ হারুনুর রশিদ, খলিলুর রহমান, মন্ত্রী পরিষদ উপসচিব মোঃ ফজলুল হক, অর্থ উপসচিব এ কে এম মোতালেব হোসেন ৷ এ নয় কর্মকর্তা দুই বছর ধরে প্রতি শুনানির তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকেন৷
এদিকে ২০০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেয়ায় ১০ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে আগের মামলাটি হালনাগাদ করেন৷ আদালত পরবর্তী ৩ এপৃল চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করে৷ এ চার সচিব হলেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকী, অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান, আইন সচিব আলাউদ্দিন সরদার ও সংস্থাপন সচিব ড. মাহবুবুর রহমান৷ ২৪ এপৃল চার সচিবের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা রুলের জবাব দেন৷
সরকারের চার শীর্ষ সচিব ও নয় মধ্যপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুলসহ নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়ে গত ১০ জানুয়ারি রায়ের দিন ধার্য ছিল৷ অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের পদক্ষেপ ও অগ্রগতির রিপোর্ট আপিল বিভাগে দাখিল করেন৷ আদালত সুপৃম কোর্টের প্রণীত বিধিমালা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়৷
মাজদার হোসেন মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, কেবল রুল জারি করলেই হবে না৷ অতীতে অনেক বিষয়ে রুলের অপব্যবহার করা হয়েছে৷ তিনি জুডিশিয়াল রিফরম কমিশন গঠনের দাবি জানান৷
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. এম জহির বলেন, ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়৷ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকার সাত বছরে বিচার বিভাগ পৃথক করতে পারলো না অথচ দুই দিনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার তা করতে পারলো৷ তিনি বর্তমান আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে এ জন্য ধন্যবাদ জানান৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=26356&issue=196&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: