চারদলীয় জোটের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানালেন মান্নান ভূঁইয়া কোনো অজুহাতেই নির্বাচন যেন বিলম্বিত না হয়

কোনো অজুহাতেই যাতে নির্বাচন বিলম্বিত না হয় সে ব্যাপারে সক্রিয় থাকার জন্য কেয়ারটেকার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া বলেছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে দীর্ঘ মেয়াদে যা কিছু করা প্রয়োজন তা করার দায়িত্ব জনগণের নির্বাচিত সরকারের৷ তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যথাশিগগির সম্ভব সেই সরকার গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য কেয়ারটেকার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি৷ গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বনানীতে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি এ আহ্বান জানান৷ মূলত গত রবিবার জাতির উদ্দেশে দেয়া কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের ভাষণের প্রতিক্রিয়া জানাতে চারদলীয় জোট এ কনফারেন্সের আয়োজন করে৷
মান্নান ভূঁইয়া প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে উঠে আসা বিষয়গুলোকে প্রাসঙ্গিক হিসেবে স্বীকার করলেও নতুন হিসেবে মানতে রাজি হননি৷ উপরন্তু ভাষণে উল্লিখিত বেশ কিছু বিষয়ের সমালোচনাও করেন তিনি৷ প্রধান উপদেষ্টার নাগরিক হয়রানি বিষয়ক বক্তব্য প্রসঙ্গে মান্নান ভূঁইয়া বলেন, আমরা

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া-যাযাদি

আশা করবো তার বক্তব্য ও বাস্তবতা প্রাসঙ্গিক হবে৷ প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের একটি অংশ থেকে দেশ-বিদেশে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন বিএনপি মহাসচিব৷ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের কিছু সাফল্যের কথা প্রধান উপদেষ্টা স্বীকার করলেই ঠিক করতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি৷
প্রেস কনফারেন্সে মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, খেলাফত মজলিস মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, ইসলামী ঐক্যজোট মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামী, জাতীয় পার্টির একাংশের মহাসচিব শামীম আল মামুন ছাড়াও বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ, এম কে আনোয়ার, নজরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন৷
জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে অঙ্গীকার করেছেন সে জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান মান্নান ভূঁইয়া৷ একই সঙ্গে এ বক্তৃতাকে বিলম্বিত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দেশবাসী তার বক্তব্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করছিল৷ কেয়ারটেকার সরকারকে তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মান্নান ভূঁইয়া বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করাই হলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কাজ৷ পরিপূর্ণ আন্তরিকতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ কাজ সুচারুভাবে সম্পাদন করতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি৷
মান্নান ভূঁইয়া আরো বলেন, প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছেন, তার প্রায় সব বিষয়ই প্রাসঙ্গিক৷ কিন্তু কোনোটাই নতুন নয়৷ তিনি বলেন, শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, দেশের সামগ্রিক শান্তি, কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্যই সন্ত্রাস ও দুর্নীতি নির্মূল করা প্রয়োজন৷ এ প্রয়োজনীয়তাকে যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়েই বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার সন্ত্রাস দমনে দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতায় অপারেশন ক্লিনহার্ট পরিচালনা ও র‌্যাব গঠনের মাধ্যমে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে৷ গত পাচ বছরে তার আগের পাচ বছরের মতো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো গডফাদার সৃষ্টি হয়নি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসও চালানো হয়নি৷ দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের ফলে জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছিল উল্লেখযোগ্যভাবে৷ একই ভাবে দেশকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জোট সরকারই নির্বাচনপূর্ব প্রদত্ত ওয়াদা অনুযায়ী এ দেশের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়৷
নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব বিলোপের দাবিকে সর্বজনীন উল্লেখ করে মান্নান ভূঁইয়া বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে ক্রমান্বয়ে এসব অপশক্তির ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস পেয়ে থাকে৷ আমাদের দেশেও তাই ঘটছিল৷ বিগত নির্বাচনে অনেক বিত্তবান ও শক্তিধর প্রার্থীর পরাজয় তার প্রমাণ৷ তিনি বলেন, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে চারদলীয় জোট সরকার প্রকৃতপক্ষে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব বিলোপের জন্যই কাজ করেছে৷
বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথক করার কাজ প্রায় পুরোটাই চারদলীয় জোট সরকার সম্পন্ন করেছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান সরকার সুপৃম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী তা কার্যকর করেছে মাত্র৷ তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা এ ব্যাপারে শুধু তার সরকারের পরিপূর্ণ কৃতিত্বের দাবি না করে গত সরকারের অবদানের কথা স্বীকার করলে তা যথার্থ হতো৷
চারদলীয় জোট নেতা মান্নান ভূঁইয়া বলেন, প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে এমন বহু সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন, যা সময় সাপেক্ষ এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যক্রম ছাড়া সম্ভব নয়৷ তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে দীর্ঘ মেয়াদে যা কিছু করা প্রয়োজন তা করার দায়িত্ব জনগণের নির্বাচিত সরকারের৷ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যথাশিগগির সম্ভব সে সরকার গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের এবং কোনো অজুহাতেই যাতে নির্বাচন বিলম্বিত না হয় সে ব্যাপারে সক্রিয় থাকার জন্য আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷
মান্নান ভূঁইয়া বলেন, প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে আসন্ন নির্বাচনে বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণের কথা বলেছেন৷ অথচ সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না- এমন কথা বলে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা দেয়া হয়েছে৷ বিভিন্ন দল বলতে তিনি সব দলই বোঝাতে চেয়েছেন কি না এটা তারই স্পষ্ট করে বলা উচিত৷
ধর্মের ভিত্তিতে কোনো অশুভ বিভাজন বাংলাদেশে নেই উল্লেখ করে মান্নান ভূঁইয়া বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং পরমতসহিষ্ণু হওয়া ইত্যাদি অনেক ইতিবাচক কথা বলেছেন৷ কিন্তু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে ধর্মভিত্তিক ও সামাজিক বিভাজনের অশুভ রাহুগ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত রাখতে হবে- তার বক্তব্যের এ অংশটুকু দেশ-বিদেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে৷ কেননা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বের বুকে নজিরবিহীন এবং প্রশংসিত ও ধর্মভিত্তিক বিভাজনের অশুভ রাহুগ্রাস বলে এ দেশে কিছু আছে বলে দেশবাসী মনে করেন না৷ এ দেশে সবাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন৷
বিএনপি মহাসচিব বলেন, কোনো নিরপরাধ নাগরিক যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যাপারে তিনি তার সদিচ্ছার কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন৷ অথচ বিভিন্ন পত্রিকায় আজই (গতকাল সোমবার) আমরা বেশ কয়েকটি অপমৃত্যুর খবর দেখেছি৷ এটা দুর্ভাগ্যজনক৷ আমরা আশা করবো তার বক্তব্য ও বাস্তবতা সঙ্গতিপূর্ণ হবে৷ দেশের কোনো নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষ যেন কোনোভাবে হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার না হয় সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি৷
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে মান্নান ভূঁইয়া বলেন, দেশের অন্য একটি প্রধান দল প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে তাদের দাবির যৌক্তিকতার মিল খোজার চেষ্টা করছে৷ আমরা প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের সঙ্গে তাদের অতীত ও বর্তমান কাজের মিল খোজার পরামর্শ দেবো৷ সীমাহীন সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও দুর্নীতির কারণে বিগত নির্বাচনে যারা জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যাদের সাম্প্রতিক পৈশাচিক নৃশংসতা, জনগণকে জিম্মি করার অপকৌশল ও জাতীয় অর্থনীতির বিপুল ক্ষতিসাধন জনমনে ঘৃণা সৃষ্টি করেছে, যাদের হিংসাশ্রয়ী কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ বিলম্বিত হলো তাদের আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে আছে বলে আমরা মনে করি না৷
নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদ থেকে এম এ আজিজের পদত্যাগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মান্নান ভূঁইয়া বলেন, পদত্যাগ যে কারো ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ আমরা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে চাই৷ ব্যক্তি নিয়ে মাথা ঘামাই না৷ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বর্তমান সরকারকে কেয়ারটেকার সরকারেরই ধারাবাহিকতা বলে উল্লেখ করেন তিনি৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=26944&issue=201&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: