উত্পাদন খরচই উঠছে না কৃষকের, লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা ভরা মৌসুমেও শাকসবজির দাম চড়া

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও ভালো নেই দেশের কৃষকরা৷ দফায় দফায় সার, বীজ, কীটনাশক ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের উত্পাদন খরচই উঠছে না৷ ফলে কৃষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে শস্য উত্পাদনে অনীহা৷ এতে দেশে কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে৷ জানা গেছে, অভাবের কারণে কৃষকরা তাদের উত্পাদিত ধান, পাট, সরিষা, মাষকলাই, মুগ, মসুর ডালসহ সব কৃষিপণ্যই মৌসুমের শুরুতেই পানির দামে বেচে দিতে বাধ্য হয়৷ এমনকি তাদের উত্পাদিত শীতকালীন শাকসবজিরও ন্যায্য দাম পাচ্ছে না৷ অথচ ঢাকা মহানগরসহ দেশের প্রায় সর্বত্রই শাকসবজি চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে৷
আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার শাকসবজির বাম্পার ফলন হয়েছে৷ বাজারে গেলেই চোখে পড়ে হরেক রকম শাকসবজির সমাহার৷ কিন্তু দামের কোনো কমতি নেই৷ ভরা মৌসুমেও টমাটো বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা কেজি দরে৷ একইভাবে নতুন আলু ১২ থেকে ১৫ টাকা কেজি৷ অথচ এই আলু কৃষকরা বিক্রি করছে মাত্র ৫ টাকা কেজি দরে৷ কৃষক থেকে ক্রেতাদের হাতে এই আলু পৌছাতে মাঝখানে বেশ কয়েকটি হাতবদল হয়৷ এতে দেখা যায়, কৃষকের ৫ টাকার আলু থেকে মধ্যস্বত্বভোগীরা বাগিয়ে নিচ্ছে ৮ থেকে ১০

টাকা৷ কৃষকের বিক্রয় মূল্যের চাইতে ৩০০ গুণ বেশি দামে ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে এই আলু৷
বগুড়ার পাইকার সুলেমান মিয়া জানান, তিনি কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি আলু কিনতে পারেননি৷ কিনেছেন বগুড়ার কাহালুর এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে৷ ওই ব্যবসায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে আলু কেনেন৷ তারপর জমি থেকে আলু উত্তোলন, কুলি খরচ, পরিবহন খরচ এবং মুনাফা বাবদ তার কাছে বিক্রি করেন ৭ টাকা কেজি দরে৷ সুলেমান মিয়ার বগুড়া থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত এই আলু আনতে খরচ পড়ে প্রতি কেজিতে এক টাকা৷ তিনি খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছেন প্রতি কেজি সাড়ে ৮ টাকা দরে৷ সেই আলু গতকাল নগরের বাজারগুলোতে বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে৷
উল্লেখ্য, পরিবহন খরচ এক টাকা বলা হচ্ছে৷ কিন্তু হিসাব করে দেখা গেছে, প্রতি কেজিতে পরিবহন খরচ হয় মাত্র ৬ পয়সা৷ অবশ্য এ হিসাবে চাদাবাজদের দেয় অর্থ ধরা হয়নি৷ এ ব্যাপারে খোজখবর নিয়ে জানা গেছে, বগুড়ার শিবগঞ্জ থেকে এক ট্রাক আলু ঢাকার কারওয়ান বাজারে আনতে ভাড়া পড়ে ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা৷ এতে আলু আসে ১৩ টন৷ এ আলু বোঝাই ট্রাককে সিরাজগঞ্জের মোড়ে পুলিশকে ৫০ টাকা, যমুনা সেতুর কড্ডা মোড়ে ৫০ টাকা চাদা দিতে হয়৷ সাভারের শিলাবৃষ্টি এলাকায় ট্রাফিক পুলিশকে দিতে হয় ৫০০ টাকা৷ কারওয়ান বাজারে প্রবেশের সময় দিতে হয় ৫০০ টাকা৷ হিসাব করে দেখা যায়, একজন আলু ব্যবসায়ীকে ১৩ টন আলু আনতে (১৩শ’ কেজি) অতিরিক্ত খরচ জোগাতে হয় ১১শ’ টাকা৷ এ হিসাবে ৭ টাকা ধরে আলু কেনার পর তার খরচ দাড়ায় ৯১ হাজার টাকা৷ সঙ্গে ১০ হাজার যোগ করলে এক লাখ এক হাজার টাকায় গিয়ে দাড়ায়৷ ফলে তার আলুর নিট খরচ দাড়ায় ৭ টাকা ৭৬ পয়সায়৷
মিরপুরের খুচরা ব্যবসায়ী সাইফুল ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে আলু বিক্রির হিসাবে তুলে ধরে বিভিন্ন খরচের কথা বলেন৷ তিনি বলেন, কারওয়ান বাজার থেকে মিরপুরের ১১ নাম্বার বাজারে নিয়ে যেতে তাকে বস্তাপ্রতি কুলি ভাড়া দিতে হয় ১০ টাকা, বাজার থেকে ভ্যানে ওঠানোর আগে এক জায়গায় স্তূপ করার জন্য এলাকার চাদাবাজদের ১৫ টাকা ও পরিবহন ভাড়া বস্তাপ্রতি ৪০ টাকা দিতে হয়েছে৷ এছাড়াও রয়েছে দোকান ভাড়া আর নিজের মুনাফা৷
এবার আসা যাক অন্য সবজির হিসাবে৷ কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী কুদ্দুস শেখ চাদপুরের এক পাইকারের কাছ থেকে প্রতি কেজি শিম এনেছেন ৭ টাকা দরে৷ আর বিক্রি করেছেন ৯ টাকা দরে৷ গতকাল ভোক্তারা বাজার থেকে এই শিম কিনেছেন ১৫ থেকে ১৮ টাকা দরে৷ এক্ষেত্রেও দেখা যায় কৃষকের বিক্রয় মূল্যের অনেক গুণ বেশি দরে ভোক্তাদের কিনতে হয়েছে৷
কারওয়ান বাজারের সবজি ব্যবসায়ী জয়নাল জামালপুর থেকে ফুলকপি কিনে এনেছেন বড় সাইজ ৬ টাকা আর ছোট সাইজ ৪ টাকা দাম ধরে৷ তিনি কারওয়ান বাজারে ওই কপি পাইকারি বিক্রি করেছেন বড়গুলো ৭ টাকা আর ছোটগুলো ৫ টাকা দরে৷ গতকাল ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটে এ কপি বিক্রি হয়েছে ১২ থেকে ২০ টাকা দরে৷
অর্থাত্ দেখা যাচ্ছে প্রতিটি সবজির ক্ষেত্রেই বাজারে চড়া দাম থাকলেও কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছে না৷ বগুড়ার শিবগঞ্জের আলু চাষী রহমত উল্লাহ এ বছর এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ৩০ মণ আলু পেয়েছেন৷ এই আলু বিক্রি করেছেন ছয় হাজার টাকায়৷ কিন্তু তার খরচ হয়েছে নিজের শ্রম বাদে সাড়ে ছয় হাজার টাকা৷ এর মধ্যে ৮০ কেজি বীজ বাবদ দুই হাজার ২০০, ইউরিয়া সার ৫০০, খইল এক বস্তা ৫০০, পটাশ ও ফসফেট ৫০০, কীটনাশক এক হাজার, জমি চাষাবাদ ৬০০, তিনটি সেচ ৭০০ এবং আলু উত্তোলনে মজুরি ৬০০ টাকা৷ আলু চাষী রহমত উল্লাহর লোকসান হয়েছে পাচশ’ টাকা৷ আলু একটি মধ্যবর্তী ফসল হওয়ায় লস হলেও কৃষকরা আলু চাষ করে থাকে৷ অবশ্য এবার এ অঞ্চলে লসের কারণ আলুর পাতা পচন রোগ৷ বগুড়ায় এবার ৩৯ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়৷
গতকাল সরেজমিন কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে রাতে কাচামাল নিয়ে আসছেন৷ ট্রাকে থাকা অবস্থায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এসব মাল৷ ভোর ৫টা থেকেই নগরীর বিভিন্ন বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা ভিড় জমাতে থাকে কারওয়ান বাজারে৷ ঢাকার ব্যবসায়ীরা খুচরা বিক্রির উদ্দেশ্যে মাল স্তূপ করেন রাখে রাস্তার ওপর৷ এসব মালকে কেন্দ্র করে ক্রেতা-বিক্রেতাদের চলে দরদাম নির্ধারণের হাকডাক৷ রাজধানীর খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন আইটেমের সবজি কিনে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখে৷ চাহিদা অনুযায়ী আইটেম কেনা শেষ হয়ে গেলে একটি ভ্যান কিংবা রিকশা ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া হয় গন্তব্যস্থলে৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=27152&issue=203&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: