শাসন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনা কেয়ারটেকার সরকারের

শাসন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করছে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের কেয়ারটেকার সরকার৷ নির্বাচন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও প্রশ্নমুক্ত করা এবং শাসন ব্যবস্থাকে গণমুখী ও অধিকতর জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন ছাড়া সম্ভব অন্য সব রকম পদক্ষেপই নেয়া হবে৷ এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের অভিজ্ঞ সদস্যদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করছেন চিফ অ্যাডভাইজর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ৷ কথা বলতে শুরু করেছেন অভিজ্ঞ আইনবিদদের সঙ্গেও৷ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে৷
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের লাগাতার সহিংস আন্দোলনের পটভূমিতে কেয়ারটেকার সরকারের চিফ অ্যাডভাইজর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই ড. ফখরুদ্দীন আহমদ দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কারের কথা ঘোষণা করেন৷ পরে তার ক্যাবিনেটের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া অ্যাডভাইজররাও সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে মিডিয়ায় নানা কথা বলেছেন৷ তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, সঠিক ভোটার তালিকা তৈরি, প্রত্যেক ভোটারকে আইডি কার্ড দেয়া ও স্বচ্ছ ব্যালট বক্স পদ্ধতি প্রবর্তনসহ নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের পরই কেবল নির্বাচন দেয়া হবে৷
ভোটার আইডি কার্ড বিষয়ে ইতিমধ্যেই অ্যাডভাইজর তপন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি ক্যাবিনেট কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে৷ যদিও কমিটি এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌছতে পারেনি৷ তবে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কেয়ারটেকার সরকারের মনোভাব বুঝে চিফ ইলেকশন কমিশনার জাস্টিস এম এ আজিজ ও কমিশনের অন্য সদস্যরা এর মধ্যেই পদ ছেড়ে চলে গেছেন৷ তাদের শূন্য স্থানে এখনো নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি৷
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মূলত সব মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য লোকের সঙ্কটের কারণে নির্বাচন কমিশনে এখনো কাউকে নিয়োগ দেয়া যায়নি৷ চিফ ইলেকশন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে গত সপ্তাহে সাবেক অতিরিক্ত সচিব আনিসুজ্জামান ও ফয়জুর রাজ্জাকসহ বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত আমলার নাম আলোচনায় এলেও এদের কারো ব্যাপারেই প্রধান দুই রাজনৈতিক মহল একমত হতে পারেনি৷ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন দুই বড় জোট ইতিমধ্যেই ইঙ্গিতপূর্ণ বিবৃতির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রতি নিজেদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার কথা জানান দিয়েছে৷ এ প্রেক্ষাপটে কেয়ারটেকার সরকারও ইসি পুনর্গঠন প্রশ্নে সামনে এগোচ্ছে খুব সতর্কভাবে৷
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সিইসি বা ইলেকশন কমিশনের সদস্য নিয়োগের চেয়েও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে স্বাধীন করার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার৷ এছাড়া পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কালো টাকার দৌরাত্ম্য ঠেকানো, পার্লামেন্টারি ব্যবস্থাকে অধিকতর কার্যকর ও অর্থবহ করা, পার্লামেন্ট ও নির্বাহী বিভাগের কাজের মধ্যে যথাযথ দূরত্ব বজায় রাখা, পার্লামেন্ট সচিবালয়কে স্বাধীন করা, আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উপযুক্ত জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা ইত্যাদি বিষয়গুলোকেও বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে৷ চিফ অ্যাডভাইজর ও তার ক্যাবিনেট এখন প্রধানত এসব লক্ষ্য অর্জনের উপায় নির্ধারণ নিয়ে কাজ করছেন৷
প্রস্তাবিত এসব সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত এক ঊর্ধ্বতন সরকারি অফিসার জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর গত ৩৬ বছরে রাজনৈতিক সরকারগুলো যেসব জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, তার সবই নিষ্পত্তি করে যেতে চায় বর্তমান কেয়ারটেকার সরকার৷ এ জন্য সংবিধান সংশোধন ছাড়া যা যা করা দরকার তার সবকিছুই করতে প্রস্তুত এ সরকার৷
ওই অফিসার বলেন, ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা ও ভোট নষ্ট হওয়ার ভয়ে রাজনৈতিক সরকারগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক সিদ্ধান্তই নিতে পারে না৷ আবার বিগত দুটি কেয়ারটেকার সরকারের কর্মকাণ্ডও একটি সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল৷ জাস্টিস হাবিবুর রহমান শেলী ও জাস্টিস লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন কেয়ারটেকার সরকার সংবিধান লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কায় কোনো নীতিগত বিষয়ের প্রতি আগ্রহ দেখায়নি; কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ কেয়ারটেকার সরকারের সামনে তেমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই৷ যুক্তিসঙ্গত কারণে রাজনৈতিক দলগুলোও আপাতত মুখ লুকিয়ে চলার চেষ্টা করছে৷ এটাকেই সংস্কারের বড় একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে সরকার৷
তিনি জানান, শাসন প্রক্রিয়ায় সংস্কারের এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ জারির ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ প্রয়োজনে এসব বিষয়ে সিভিল সোসাইটি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারী ও রাজনীতিকদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হবে৷ এসব কাজের জন্য যতোদিন ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজন পড়বে, ততোদিনই থাকবে বর্তমান কেয়ারটেকার সরকার৷ দীর্ঘ মেয়াদে সরকার চালানোর জন্য ক্যাবিনেটের সদস্য সংখ্যা আরো বাড়িয়ে বর্তমানের দ্বিগুণ করার বিষয়টিও চিফ অ্যাডভাইজরের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানালেন এ অফিসার৷
কেয়ারটেকার সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার বিষয়ে যায়যায়দিনের সঙ্গে আলাপে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, পার্লামেন্ট না থাকা অবস্থায় যেহেতু সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই, তাই সংস্কার যেটুকুই করা হোক, তা করতে হবে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে৷ তিনি বলেন, বর্তমান কেয়ারটেকার সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা ও শাসন প্রক্রিয়ায় যেসব সংস্কার করতে চায় বলে এরই মধ্যে প্রচার হয়েছে, তার অনেকগুলোই নির্বাহী আদেশ দ্বারা বাস্তবায়ন করা সম্ভব৷ কিছু কিছু সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ জারির প্রয়োজন হতে পারে এবং সেটা করতে কোনো বাধা নেই৷ নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও পার্লামেন্ট সচিবালয়কে স্বাধীন করার প্রশ্নে তিনি বলেন, সংবিধানের ৫৫ (৬) অনুযায়ী প্রেসিডেন্Uরে একটি নির্বাহী আদেশই এ জন্য যথেষ্ট৷
শাসন প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রশ্নে সুশাসন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও দি হাঙ্গার প্রজেক্টের কান্টৃ ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার যায়যায়দিনকে বলেন, আপাতদৃষ্টিতে কেয়ারটেকার সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলেও নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সব রকম পদক্ষেপ কেয়ারটেকার সরকারকেই নিতে হবে৷ সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য লোকেরা যাতে রাজনীতিতে আসে, নির্বাচনে প্রার্থিতার ব্যাপারে আগ্রহী হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে৷ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের লাগাম টেনে ধরা৷ এটা করা না গেলে কোনো সংস্কারই অর্থবহ হবে না৷
তিনি বলেন, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের জন্য আমলাতন্ত্রও সমান দায়ী৷ স্বাধীনতার পর গত ৩৬ বছরেও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও বিচার বিভাগ আলাদা না হওয়ার মূল কারণ আমাদের বুরোক্রেসি৷ রাজনৈতিক সরকারগুলোও নিজেদের ক্ষমতায় ফিরে আসার পথ সুগম রাখার প্রয়োজনে আমলাদের বিষয়ে সব সময় নমনীয় থাকে৷ সুতরাং বুরোক্রেসির বিষয়েও শক্ত সিদ্ধান্তটি কেয়ারটেকার সরকারকেই নিতে হবে৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=28104&issue=211&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: