আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমা আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত তুরাগ তীর

হঠাত্ থেমে গেল মানুষের কোলাহল৷ চারদিকে নেমে এলো পিনপতন নিস্তব্ধতা৷ পরম করুণাময়ের নৈকট্যলাভের আশায় গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে গেল লাখো মানুষের সমাবেশ৷ হেদায়েতি বয়ান শেষে মাইকে মোনাজাত শুরুর ঘোষণা হওয়ামাত্রই পাল্টে গেল দৃশ্যপট৷ মহান আল্লাহর করুণা প্রার্থী লাখ লাখ মুসল্লি আমিন, সুম্মা আমিন ধ্বনিতে সমগ্র তুরাগ তীর প্রকম্পিত করে আকাশের পানে তাদের দু’হাত তুলে ধরেন৷
টঙ্গীর তুরাগ নদীর পাড়ে আখেরি মোনাজাত ও গুরুত্বপূর্ণ বয়ানের মধ্য দিয়ে রবিবার দুপুরে শেষ হয়েছে তিনদিনব্যাপী তাবলিগ জামাতের ৪১তম বিশ্ব ইজতেমা৷ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম এ জমায়েতে এ বছর প্রায় ৪৫ লাখ মুসল্লি অংশ নেন বলে আয়োজকরা জানান৷
দুপুর পৌনে ১টায় শুরু হয়ে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয় আখেরি মোনাজাত৷ দিল্লির মারকাজে শূরা সদস্য মাওলানা জুবায়েরুল হাসান আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন৷ মোনাজাতের সময় টঙ্গীর আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার কামারপাড়া-টঙ্গীর চেরাগ আলী পর্যন্ত কোথাও তিলধারণের ঠাই ছিল না৷ সকালের শীত, কুয়াশা, উপেক্ষা করে মোনাজাত শুরুর আগ পর্যন্ত চারদিক থেকে ছুটেছেন

ছবি ২

মানুষ৷ গন্তব্য ছিল একটাই- তুরাগ তীর৷ লক্ষাধিক মানুষ ইজতেমাস্থলে পৌছতে না পেরে যে যেখানে পারেন সেখান থেকেই মোনাজাতে শামিল হন৷
বাংলাদেশের লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন ৬৫টিরও বেশি দেশ থেকে আসা প্রায় সাড়ে চার হাজার মেহমান৷ তাদের অনেকেই আজ থেকে দেশে ফেরা শুরু করলেও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে অবস্থান করে দীনের দাওয়াতের কাজ সেরে দেশে ফিরবেন বলে একটি সূত্র জানায়৷ তবে এবারে বিদেশি মুসল্লিদের বাংলাদেশে ৪৫ দিনের বেশি থাকার অনুমতি না দেয়ায় এ সময়ের মধ্যেই তাদের দেশে ফিরতে হবে৷ গত বছর এ সময় ছিল সর্বোচ্চ ১২৫ দিন৷
মোনাজাতে মুসল্লিরা অংশগ্রহণের সুবিধার্থে উত্তরার প্রধান সড়কের কাছে জসীম উদ্‌দীন মোড়, সাত ও নয় নাম্বার সেক্টর থেকে টঙ্গী চেরাগ আলী মার্কেট পর্যন্ত এবং টঙ্গী সড়ক থেকে আশুলিয়া সড়কের শেষ মাথা পর্যন্ত অনেকগুলো মাইক বসানো হয়৷ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুসল্লির সুবিধার্থে আখেরি মোনাজাত সরকারি-বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে৷
বিশ্ব মুসলমানের পক্ষ থেকে তাদের অপরাধের জন্য মুরব্বিরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, ‘ইসলামকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি বলে বিশ্ব মুসলিমরা আল্লাহর মদদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ আল্লাহকে রাজিখুশি করতে হবে৷ নবীর তরিকা নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে৷ নিজের ঘর, মহল্লা ও প্রতিবেশী মুসলিম ভাইকে দীনের মেহনতে শামিল করতে হবে৷ যে যতো বেশি দীনের মেহনত করবে তার দিল ততো বেশি জিন্দা হবে৷ এ তরিকাতেই দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি৷’
মোনাজাতে যোগ দেয়ার আকুতি : শনিবার রাত থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়৷ ফলে মুসল্লিরা রাতভর হেটে ইজতেমা ময়দানের আশপাশে অবস্থান নেন৷ টঙ্গী ও আশপাশের লোকজন হেটে রওনা দেন ভোররাতে৷ অনেকে রওনা দেন গতকাল সকালে৷ মুসল্লিদের বাধভাঙা জোয়ারে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়৷ লাখ লাখ মুসল্লির সমাবেশে মহাসড়কে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট৷ মহাসড়ক ধরে মুসল্লিদের কাফেলার পর কাফেলা হেটে এগুতে থাকে৷ মোনাজাত শুরুর আগ পর্যন্ত টঙ্গীমুখো মানুষের এই ঢল অব্যাহত ছিল৷ আগেই টঙ্গীর তুরাগ পাড়ের মূল ময়দানসহ দুই কিলোমিটার উত্তর চেরাগ আলী মার্কেট, দক্ষিণে আশুলিয়া সড়ক, পুরো উত্তরা এলাকা কানায় কানায় মানুষে ভরে যায়৷ ফাকা জায়গা ভরে গেলে আশপাশের সব বাড়িঘর, কল-কারখানার ছাদ, গাছের ডাল, রেল স্টেশন, নদীতে নৌকা, ট্রলার এবং রাস্তায় ট্রাকে এবং গাড়ির ছাদে বসে মুসল্লিরা মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন৷ এছাড়া বিভিন্ন ভবনের ছাদে ও মাঠে বসে বিপুলসংখ্যক নারী আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন৷
ভিআইপিদের মোনাজাতে অংশগ্রহণ : আখেরি মোনাজাতে ভিআইপিরা তিনটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন৷ মাঠের উত্তরপাশে মোনাজাত মঞ্চের পাশের সামিয়ানায় প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এবং চিফ অ্যাডভাইজর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এসে উপস্থিত হন এবং মাঠে হেদায়েতি বয়ান শুনেন৷ তাদের সঙ্গে ছিলেন এলজিআরডি অ্যাডভাইজর আনোয়ারুল ইকবাল৷
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সকাল ১১টা ১৯ মিনিটে বাটা ফ্যাক্টরিতে বসে মোনাজাতে অংশ নেন৷ তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব প্রফেসর এম এ মান্নানসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা৷
এটলাস হোন্ডা ফ্যাক্টরিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আসেন সকাল ১১টা ২০ মিনিটে৷ তার সঙ্গে মোনাজাতে শরিক হন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ৷ বিদেশিদের ক্যাম্পে বসে মোনাজাতে শরিক হন সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ৷
কয়েক হাজার পরিত্যক্ত জুতা : আখেরি মোনাজাত শেষে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে কয়েক হাজার জুতা-স্যান্ডাল ফেলেই খালি পায়ে মাঠ ত্যাগ করেন মুসল্লিরা৷ মোনাজাত শেষে ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের সড়কগুলোতে কয়েক হাজার জুতা-স্যান্ডাল পড়ে থাকতে দেখা যায়৷ স্থানীয় কিছু লোক ও টোকাইরা ওইসব পরিত্যক্ত জুতা-স্যান্ডাল বস্তায় ভরে নিয়ে যায়৷
ওয়্যারলেস সেট ও মোবাইলে মোনাজাত : ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় হাজার হাজার মানুষ বোর্ডবাজার, চেরাগ আলী মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েন৷ আশুলিয়ায়ও একই অবস্থা সৃষ্টি হয়৷ এসব স্থানের আটকে পড়া মানুষ কর্তব্যরত পুলিশের ওয়্যারলেস সেট এবং মাঠে থাকা আত্মীয়-স্বজনের মোবাইল ফোনের সঙ্কেতের মাধ্যমে মোনাজাতের উদ্দেশে হাত তোলেন৷ চান্দনা চৌরাস্তার ঈদগাহ ময়দান, বাসন সড়কেও অনুরূপ উপায়ে মোনাজাত হয়৷
বিশ্ব ইজতেমায় দুই হাজার জামাত গঠিত : বিশ্ব ইজতেমার পর ময়দান থেকে বিভিন্ন মেয়াদে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুই হাজার নতুন জামাত পাঠানো হচ্ছে৷ নতুন জামাতগুলো ঢাকার কাকরাইল থেকে পাওয়া নির্দেশনামতো বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=28313&issue=213&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: