গভীর রাতের অভিযানে ১৫ পলিটিশিয়ান গ্রেফতার

সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, এমপিসহ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অন্তত ১৫ নেতাকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী৷ রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ অভিজাত এলাকায় রবিবার গভীর রাতে যৌথ বাহিনী এ অভিযান চালায়৷
১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর যৌথ বাহিনীর সাড়া জাগানো এ অভিযানে যাদের আটক করা হয়েছে তারা হলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাবেক বিমান প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান, সাবেক বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে এবং সাবেক এমপি নাসের রহমান, সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া, সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী৷ তারা সবাই বিএনপি নেতা৷
গ্রেফতার করা আওয়ামী লীগ নেতারা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগ

সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা ও শিল্পপতি সালমান এফ রহমান, কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক সাবেক এমপি আ ন হ মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) এবং আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ কুমার দেবনাথ৷ এছাড়াও গ্রেফতার করা হয়েছে টিঅ্যান্ডটির সিবিএ সভাপতি ফিরোজ মিয়াকে৷ তাদের সবাইকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়৷
কেয়ারটেকার সরকারের অ্যাডভাইজর ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন গতকাল রবিবার সচিবালয়ে তার অফিসে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আটককৃতদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে মামলা দায়ের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে৷
এদিকে দেশব্যাপী চলমান যৌথ অভিযানে গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩৮ জনকে৷ এর মধ্যে ১২ জন রয়েছে সাজাপ্রাপ্ত আসামি৷ বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে ২০টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র৷
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুর্নীতিবাজ ও কালো টাকার মালিক হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার এ পর্যায়ে মোট ৪৯ ব্যক্তির একটি তালিকা বানিয়েছে৷ সেই তালিকা অনুযায়ীই চালানো হয় রবিবার রাতের অভিযান৷ এতে ১৫ জনকে আটক করা সম্ভব হলেও বাকি ৩৪ জনকেই তাদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি৷
সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, রবিবার রাত দেড়টার পর যৌথ বাহিনীর সদস্যরা একযোগে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, নিউ ডিওএইচএসসহ অভিজাত এলাকায় গ্রেফতার অভিযানে নামেন৷ রাত দেড়টার কিছু সময় পর ধানমন্ডি ২৭ নাম্বার রোডে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বাসায় অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী৷ জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে নাসিমকে বাসা থেকে বের করে যৌথ বাহিনীর গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়৷ মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে এ লেভেলে পড়–য়া তন্ময় মনসুর বলেন, রাত পৌনে ২টার দিকে বাসা থেকে তার বাবাকে সেনা ও বিডিআর সদস্যরা নিয়ে যান৷ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সকালে তাদের ধানমন্ডি থানায় যোগাযোগ করতে বলেন৷
রাত ৩টার দিকে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার ধানমন্ডি ৫ নাম্বার রোডের ৩১ নাম্বার বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে যৌথ বাহিনী৷ নাজমুল হুদার চেম্বার থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে৷ তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি৷
আসাদগেট এলাকার বাসা থেকে আটক করা হয় সাবেক বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে৷ ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের পাশে অ্যাসেটের অ্যাপার্টমেন্টের ৬ তলা থেকে আটক করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথকে৷ গভীর রাতে যৌথ বাহিনী সদস্যরা বনানীর বি ব্লকের ২৫ নাম্বার রোডের ১৬ নাম্বারে অবস্থিত সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে নিয়ে যায়৷ মহীউদ্দীন খান আলমগীরের স্ত্রী সিতারা আলমগীর জানিয়েছেন, তার স্বামীকে ৠাব অফিসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে আটককারী কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন৷
সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুকেও আটক করা হয় তার গুলশানের বাসা থেকে৷ মহাখালী নিউ ডিওএইচএসের বাসা থেকে আটক করা হয় সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমানকে৷ এছাড়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, সাবেক এমপি নাসের রহমান, শিল্পপতি সালমান এফ রহমান ও লোটাস কামালকেও গুলশানের নিজ নিজ বাসভবন থেকে আটক করা হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে৷
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে ধানমন্ডি ৮ নাম্বার রোডের বাসা থেকে৷ তার ছোট ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী জানান, বাবাকে যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তারা নিয়ে গেছেন৷ এর বেশি কিছু আমি বলতে পারবো না৷ গত ২৮ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় সাকা চৌধুরীর ভাই গিয়াস কাদের চৌধুরীকে যৌথ বাহিনী জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে৷
এদিকে বিএনপির সাবেক এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে শনিবার গভীর রাতে জেলা সদরে কলাবাগানের বৈঠক নামের বাসা থেকে আটক করা হয়৷ আটকের পর ভোর রাত ৪টায় তাকে বিডিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে৷ খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার লুত্ফর কবিরসহ সংশ্লিষ্টরা ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন৷
ওদিকে সাবেক চিফ হুইপ ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ঢাকার কলাবাগানের বাসা ও বরিশালের দুটি বাসায় যৌথ বাহিনী শনিবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়েছে৷ আবুল হাসানাতের স্ত্রী শাহান আরা জানিয়েছেন, কলাবাগানের বাসায় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা এসেছিল, তবে কাউকে আটক করেনি৷ হাসানাত আবদুল্লাহ গত ৫ জানুয়ারি থেকে ইনডিয়ার আজমির শরিফে অবস্থান করছেন বলে জানান তিনি৷ এদিকে বরিশাল অফিস জানিয়েছে, শহরের কালীবাড়ি সড়কে অবস্থিত আবুল হাসানাতের বাসায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালায় রাত ৩টার দিকে৷ প্রায় একই সময়ে অভিযান চালানো হয়েছে আগৈলঝড়া উপজেলার সেরাল গ্রামের বাসভবনে৷ দুটি স্থানেই ব্যাপক তল্লাশি চালানো হলেও কাউকে গ্রেফতারের সংবাদ পাওয়া যায়নি৷
এদিকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নাটোরে অবস্থিত দুটি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে৷ সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৩৭ রাউন্ড গুলিসহ দুটি আগ্নেয়াস্ত্র৷ নাটোর প্রতিনিধি জানান, শনিবার রাতে যৌথ বাহিনী প্রথম অভিযান চালায় দুলুর আলাইপুরে অবস্থিত বাসভবনে৷ এখানে তল্লাশিকালে পাওয়া যায় একটি পয়েন্ট টুটু বোর রাইফেল ও ৭৬ রাউন্ড গুলি৷ সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ ক্যালিবারের ৫০ রাউন্ড গুলিও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়৷ যৌথ বাহিনী নলডাঙ্গা রামসা কাজীপুর গ্রামে অবস্থিত দুলুর পৈতৃক নিবাসেও তল্লাশি চালায়৷ সেখান থেকে একটি শটগান ও ১১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়৷ শটগানটির বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে সেনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন৷ অন্যদিকে দুলুর ভাই অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন টগর দাবি করেছেন, দুটি অস্ত্রেরই লাইসেন্স আছে৷ টুটু রাইফেলটি দুলুর এবং শটগানটি বড় ভাই রফিকুল ইসলাম তালুকদারের৷
জরুরি অবস্থা জারির পর একযোগে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের আটকের ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়৷ তাদের কি কারণে আটক করা হয়েছে তা জানতে উদগ্রীব ছিলেন দলীয় নেতাকর্মী ও পরিবার-পরিজন৷ তবে যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি৷
যৌথ বাহিনীর হাতে আটক মহীউদ্দীন খান আলমগীরের স্ত্রী সিতারা আলমগীর ও পংকজ দেবনাথের স্ত্রী মনিকা দেবনাথ রবিবার সকালে সুধা সদনে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন৷ তারা তাদের স্বামীর মুক্তির জন্য শেখ হাসিনার কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন বলে জানা গেছে৷ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের পরিবার-পরিজনও যোগাযোগ করছেন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে৷ কিন্তু কেউই তাদের আশ্বস্ত করতে পারছেন না৷ গডফাদার গ্রেফতারে গত ৪৮ ঘণ্টায় আলোচিত এ অভিযানের পর অনেক রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি আত্মগোপনে চলে গেছেন৷ বিগত সময়ের প্রতাপশালী ব্যক্তিরাও কেউ এখন নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না৷ দলের শীর্ষ নেতারা পরিবর্তিত এই পরিস্থিততে মাঝারি নেতাদের গ্রেফতার ঠেকানোর আশ্বাস দিতে পারছেন না৷
এদিকে দেশব্যাপী অভিযানে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩৮ জনকে৷ এর মধ্যে ১২ জন রয়েছে সাজাপ্রাপ্ত আসামি৷ বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে ২০টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র৷
পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দুটি রিভলভার, সাতটি পাইপগান, একটি বন্দুক, তিনটি পিস্তল, চারটি এলজি ও তিনটি শাটারগান উদ্ধার হয়েছে৷ গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার এ অভিযানের সময় ১২ রাউন্ড গুলি ও ২৩টি বোমা উদ্ধার হয়েছে৷ এ সময় পুলিশ ১২ জন সাজাপ্রাপ্ত আসামি, ৭০৬ জন গ্রেফতারি পরোয়ানার আসামিসহ ১ হাজার ৪৩৮ জনকে গ্রেফতার করেছে৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=28311&issue=213&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: