আটক শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতির তদন্ত শুরু

সালাহউদ্দিন ও আলী আজগর লবী গ্রেফতার ।। তরিকুল ও ফালু জেল হাজতে

দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে শত শত কোটি টাকার মালিক, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী এবং তাদের গডফাদারদের গ্রেফতারে যৌথবাহিনীর বিশেষ দল দেশব্যাপী অভিযানের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ভোর পর্যনত্ম রাজধানীতে অর্ধশতাধিক সাবেক মন্ত্রী, এমপি, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও ভূমিদস্যুর বাসা এবং সম্ভাব্যস্থানে অভিযান পরিচালনা করে। মঙ্গলবার সকালে যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিএনপি সরকারের সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে বনানীর বাসা থেকে এবং বিকেলে সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা আলী আজগর লবীকে গুলশানের বাসা থেকে আটক করে। গত কয়েকদিন ধরে প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের খবর পেয়ে অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। এমনকি কয়েকজনের বাসায় এবং সম্ভাব্যস্থানে যৌথবাহিনী একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তাদের খুঁজে পায়নি। তার বাসা থেকে বলা হয়, আলী আজগর লবী স্বেচ্ছায় যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এছাড়া বিএনপি’র আরও কয়েক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়। বিএনপি’র সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব মোসাদ্দেক আলী ফালু ও তুরাগ থানার হরিরামপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি মোঃ আবুল হোসেনকে একমাসের আটকাদেশ দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়। অপরদিকে যশোরে গ্রেফতারকৃত বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী তরীকুল ইসলামকে গতকাল কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আটকাদেশে দুর্নীতি, অবৈধ মজুদদার, দেশের অর্থনৈতিক ড়্গতিসাধন ও আইন-শৃঙ্খলা বিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ উলেস্নখ করা হয়েছে।

গ্রেফতারকৃত আলোচিত ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল-মামুনের দেয়া তথ্যানুযায়ী যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিএনপি’র বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও ব্যবসায়ী গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করছে। মামুনকে যৌথবাহিনীর হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

গতকাল সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আলী আজগর লবীকে নিয়ে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতারের সংখ্যা ১৫তে দাঁড়ালো। গ্রেফতারকৃত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এবং ব্যবসায়ীসহ শীর্ষস্থানীয় ২৪ নেতার বিরম্নদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে মামলা করার প্রক্রিয়া শুরম্ন হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গতকাল যৌথবাহিনীর দুইজন সদস্যসহ ৬ জন দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ধানমণ্ডির বাসায় যান। তারা মিসেস নাসিমের কাছে নাসিমের ব্যাংক একাউন্ট নম্বরসহ সম্পদের কাগজপত্র প্রদানের কথা জানালে তিনি ২/৩ দিনের মধ্যে সব কিছুই উক্ত তদনত্মকারী কর্তৃপড়্গের কাছে হসত্মানত্মর করবেন বলে জানিয়েছেন। কর্মকর্তারা একঘন্টা ধরে মোহাম্মদ নাসিমের বাসায় অবস্থান করে। মিসেস নাসিম তদনত্ম কর্মকর্তাদের বলেন, আমার স্বামীর সম্পদ সম্পর্কে যা যা কাগজপত্র প্রয়োজন সবই হসত্মানত্মর করা হবে এবং আমরা চাই ন্যায় বিচার। পর্যায়ক্রমে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা গ্রেফতারকৃত শীর্ষ নেতা ও ব্যবসায়ীদের বাসা এবং তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাবেন। তাদের সম্পদের হিসেব ও কাগজপত্র তদনত্ম করে দেখবেন বলে জানা যায়।

রবিবার রাতে আটককৃত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব ও সাবেক সংসদ সদস্য মোসাদ্দেক আলী ফালুকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখা হয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকা সিএমএম কোর্টে পাঠানো হলে সেখান থেকে তাকে এক মাসের আটকাদেশ দিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত সোমবার রাত দেড়টার দিকে র‌্যাব হেড কোয়ার্টার থেকে তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুরো এলাকা জুড়ে ছিল কড়া নিরাপত্তা। বহিরাগত কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। পুলিশ জানায়, তার বিরম্নদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট মামলা কিংবা অভিযোগ নেই। তবে একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং তার বিরম্নদ্ধে মজুতদারি ও দুর্নীতিসহ রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে তাকে কোর্টে পাঠানো হয়।

আমাদের কোর্ট রিপোর্টার মোহাম্মদ শাহজাহান খান জানান, মোসাদ্দেক আলী ফালু ও আবুল হাসেমকে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে মঙ্গলবার জেলে প্রেরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ফালুকে যৌথবাহিনী গত শনিবার রাতে ও হাসেমকে গত সোমবার আটক করেছিল। ফালুর বিরম্নদ্ধে জন নিরাপত্তা বিঘ্ন সৃষ্টি করাসহ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পত্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া ও হাসেমের বিরম্নদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত ও অবৈধভাবে জমি দখল করা সংক্রানত্ম অভিযোগ আনা হয়েছে।

ফালুর পড়্গে জামিনের আবেদনে তার আইনজীবীরা আদালতে বলেন, ফালু দুইটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চেয়ারম্যান, একটি দৈনিক পত্রিকার মালিক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব ও ঢাকা-রমনা-তেজগাঁও আসনের সাবেক এমপি। তার এসব প্রতিষ্ঠানে বহু লোক চাকরি করেন। দেশ ও জাতির উন্নয়নে এসব প্রতিষ্ঠান অবদান রাখছে। তিনি দেশের স্বার্থবিরোধী ও জনশৃংখলা বিঘ্নকারী কোন কাজ করেননি। তিনি স্বেচ্ছায় যৌথবাহিনীর কাছে ধরা দিয়েছেন। ২৪ ঘন্টার বেশি তাকে বে-আইনীভাবে আটক রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার বিরম্নদ্ধে মজুদদারির অভিযোগ আনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হতো। জনসমড়্গে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেলখানায় তাকে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া যেতে পারে।

আবুল হাসেমের পড়্গে আদালতে বলা হয়, তিনি ১৮ বছর হরিরামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি অন্যের জমি অবৈধভাবে দখল করেছেন এমন কোন অভিযোগ নেই। তিনি উত্তরা থানায় একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাকে জামিন দেয়া যেতে পারে।

গতকাল মোসাদ্দেক আলী ফালুকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুপুর ৩টা ৫মিনিটের সময় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সফিক আনোয়ারের আদালতে আনা হয়। তাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দেখা গেছে। সরকার পড়্গ থেকে বলা হয়েছে ফালু দুর্নীতি ও অবৈধ ব্যবসা মজুদদারি, জনস্বার্থ বিরোধী ও দেশের স্বার্থ বিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। দেশের প্রচলিত আইনে ফালুকে বিচারের সম্মুখীন করা সম্ভব নয়। তিনি দেশের বড় ধরনের দুর্নীতির সাথে জড়িত এবং অবৈধ ব্যবসা, বাণিজ্য করে কালো টাকার মালিক বনে গেছেন। তাই তাকে জরম্নরি আইনের ১৬(২) ধারায় গ্রেফতার করে জনস্বার্থে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ড়্গমতা আইনের ৩০ দিনের আটকাদেশের প্রসত্মাব করা হয়েছে।

সরকার পড়্গে ছিলেন এসি প্রসিকিউশন মকবুল হোসেন এবং এডভোকেট সানাউলস্নাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আব্দুল বাতেন, সাহারা খাতুন, এহসানুল হক সমাজি, খোরশেদ আলম আসামিদ্বয়ের পড়্গে জামিনের শুনানি করেন।

তরিকুল ইসলাম

যশোর অফিস জানায়, মঙ্গলবার তরিকুল ইসলামকে এক মাসের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে তাকে আদালতে নিয়ে গেলে শতাধিক আইনজীবী তার জামিনের আবেদন জানান।

গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তরিকুল ইসলামকে শহরের ঘোপের বাসা থেকে গ্রেফতার করে যৌথবাহিনী। রাতে যৌথ বাহিনীর ৭/৮টি গাড়ি তরিকুল ইসলামের বাস ভবনের সামনে যায় এবং বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে তাকে গ্রেফতার করে। এ সময় তরিকুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার ডেকে তার চিকিৎসা করা হয়।

মঙ্গলবার সকালে তাকে কোতয়ালি থানায় সোপর্দ করা হয়। এ ব্যাপারে থানায় একটি জিডি করা হয়েছে। কোতয়ালী থানার অভ্যনত্মরে তার ইসিজি শেষে চিকিৎসকরা জানান, তার শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে। থানা থেকে তরিকুল ইসলামকে আদালতে নেয়া হয়। ওসি আব্দুল কাদের বেগ আদালতে তার গ্রেফতারের ব্যাপারে উলেস্নখ করেন, তিনি ড়্গমতাসীন থাকার সময় দুর্নীতি, টাকা আত্মসাৎ, তার পরিবারবর্গ অন্যের জমি দখল, চাকরি দেয়ার নাম করে অর্থ আদায় করেছে।

তিনি তরিকুল ইসলামের এক মাসের আটকাদেশের প্রর্থনা জানান। তরিকুল ইসলাম আদালতের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি অসুস্থ। তিনি যশোরের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ফলে তার জামিন মঞ্জুর করা হোক। এ সময় এ্যাডভোকেট নজরম্নল ইসলাম, এ্যাডভোকেট ইসহাক, সাবেরম্নল হক সাবু, আবু মুরাদসহ বিপুল সংখ্যক আইনজীবী তার জামিনের জন্য উঠে দাঁড়ান। শুনানি শেষে সদর আদালতের ম্যাজিষ্ট্‌্েরট মলিস্নকা খাতুন তার জামিন না মঞ্জুর করে আদালতে প্রেরণ করেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, তার এক মাসের আটকাদেশ দেয়া হয়েছে। আদালত থেকে কারাগারে নেয়ার সময় তরিকুল ইসলাম কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা আদালত চত্বরে শেস্নাগান দেয়।

শ্যামল সিংহ রায় জেল হাজতে

খুলনা অফিস জানায়, মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা ও মহানগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শ্যামল সিংহ রায়কে দ্রম্নত বিচার আইনে গ্রেফতার দেখিয়ে জেল হাজতে পাঠান হয়েছে। পুলিশ জানায়, গত সোমবার সহকারি কমিশনার (ভূমি) শাহাদাত হোসেনের কার্যালয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে শ্যামল সিংহ রায়কে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। রাতে তার বিরম্নদ্ধে দ্রম্নত বিচার ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করা হয়।
Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-02-07

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: