গ্রেপ্তার এড়াতে কূটনীতিকদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন বাবর

গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। যৌথবাহিনী দুর্নীতিবাজ ও গডফাদার মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের পাকড়াও অভিযান শুর” করায় গা বাঁচাতে পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন এক সময়ের ক্ষমতাকেন্দ্র হাওয়া ভবনের একানিষ্ট ঘনিষ্ঠ এ রাজনীতিক। অভিযোগ রয়েছে, বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ, জঙ্গিবাদ লালনকারী ও সন্ত্রাসের গডফাদারদের মধ্যে বাবর অন্যতম। জানা গেছে জরুরি অবস্থা জারির পর একবার তার বাসায় অভিযানও চালিয়েছে যৌথবাহিনী। তবে সে সময় তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে ‘রুই-কাতলা’ পাকড়াও অভিযান জোরদার করায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবর। যৌথবাহিনীর ধরপাকড় থেকে বাঁচতে ধর্না দিতে শুরু করেন প্রভাবশালী বিদেশী কূটনীতিক মহলে।
কূটনীতিকদের সঙ্গে সম্পর্ককে আত্বরক্ষার লক্ষ্যে বাতাবরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন বাবর। আর বিএনপির হাই কমান্ড তার এই কৌশলে উৎসাহ জোগাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস ও ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন লুৎফুজ্জামান বাবর। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গুলশানের বাসভবনে এ সাক্ষাৎকালে বাবর যৌথবাহিনীর অভিযানে যাতে তাকে আটক না করা হয় সে জন্য কূটনীতিকদের হসত্মক্ষেপ কামনা করেন বলে জানা গেছে। এর আগে গত ২১ জানুয়ারি বাবর তার গুলশানের বাসভবনে প্রভাবশালী পশ্চিমা কূটনীতিকদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন। এ অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানও উপস্থিত ছিলেন। বাবরের বাসভবনে এ ভোজসভা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এটা প্রমাণ করা যে তিনি বিএনপির গুর”ত্বপূর্ণ নেতা। প্রভাবশালী কূটনীতিকদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানে তাকে স্পর্শ করা যাবে না। জানা যায়, বিএনপি হাই কমান্ড বাবরকে আটক বা জিজ্ঞাসাবাদের হাত থেকে রক্ষার বিষয়টিকে গুর”ত্ব দিচ্ছে। কারণ তিনি শুধু নিজেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন, হাওয়া ভবনের যাবতীয় অপকর্মের অন্যতম সারথিও। তাছাড়া, বাবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে (প্রতিমন্ত্রী) থাকাকালে তার জ্ঞাতসারেই দেশে জঙ্গিবাদের চূড়ানত্ম বিস্ফোরণ ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ধরা পড়লে এসব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেতে পারে বলে দলের নীতিনির্ধারকরাও ভেতরে ভেতরে শঙ্কিত।
লুৎফুজ্জামান বাবর বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের অন্যতম ক্ষমতাধর ও সর্বাধিক আলোচিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। দলে বড়ো কোনো পদ না থাকলেও হাওয়া ভবনের পুষ্ট হওয়ায় তার ছিল প্রচণ্ড দাপট। জোট সরকারের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের তালিকায়ও তার নাম ছিল শীর্ষে। দুর্নীতির মাধ্যমে মাত্র ৫ বছরে তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার আমলে পুলিশের গাড়ি কেনা, পুলিশের পোশাক বদলে ব্যাপক দুর্নীতিসহ মন্ত্রণালয়ের যে কোনো টেন্ডারে ১০ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগ আছে তার বির”দ্ধে। পুলিশে নিয়োগ ও পোস্টিঙের ক্ষেত্রে উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পুলিশকে অনেকটা দলীয় বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন বাবর।
অভিযোগে জানা যায়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের নির্দেশ ছাড়া পুলিশের কোনো নিয়োগ, বদলি কিংবা পদোন্নতি হতো না। আর এ জন্য তাকে দিতে হতো মোটা অংকের উৎকোচ। গত বছরের জুনে ডিএমপিতে সাড়ে ৭০০ কনস্টেবলকে এএসআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ পদোন্নতিতে জনপ্রতি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ শানিত্ম মিশনে পুলিশ পাঠানোয় অনিয়ম ও দুর্নীতি ছিল ওপেন সিক্রেট। পুলিশের এএসআই পদে পদোন্নতি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র হাজার হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত বছরের ১৩, ১৪ ও ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে পুলিশের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে ঐ পরীক্ষা বাতিল করে ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে বাবরের নির্দেশে পিএসসির মাধ্যমে দলীয় পরিচয়ে ২০০ এএসপি নিয়োগ করা হয়। এ নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরো জানা যায়, ২০০৪ সালে এসআই পদের জন্য দরখাসত্ম আহ্বান করা হয়। ঐ বছরের নভেম্বর মাসে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৩ হাজার প্রার্থী। কিন’ লিখিত পরীক্ষায় পাস করে মাত্র ৩০০ জন। পরে ২০ মার্ক গ্রেস দিয়ে পাস করানো হয় ১ হাজার ১০০ জনকে। এর মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয় ৮৩০ জনকে। এরা সাবই ছিল বিএনপি-জামাতের দলীয় লোক। তা সত্ত্বেও এদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা উৎকোচ আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
র‌্যাব, পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডের হাজার হাজার কোটি টাকার গাড়ি ক্রয়ে বাবর দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগে প্রকাশ। সার্ক সম্মেলনকে সামনে রেখে ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ১ হাজার ৯৪৮টি গাড়ি কেনার সিদ্ধানত্ম নেয় সরকার। র‌্যাব ও পুলিশের জন্য এ গাড়ি ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়া ছিল দুর্নীতি আর অনিয়মে ভরা। তড়িঘড়ি করে কিছু শর্ত আরোপের মাধ্যমে একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ঐ গাড়িগুলো আমদানি করা হয়। হাওয়া ভবনের নির্দেশে এর নেপথ্যে যাবতীয় কলকাঠি নেড়েছেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর নিজে। এই গাড়ি আমদানির মাধ্যমে হাওয়া ভবন ও বাবর কোটি কোটি টাকা কমিশন খেয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।
ভূমি দখলবাজিতেও বাবর পিছিয়ে ছিলেন না। সাভারের মিথুন গ্রামে বাবর শতাধিক খ্রিস্টান পরিবারকে উচ্ছেদ করে ৯০ বিঘা জমি দখল করেন। এই নিয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলে তিনি পরে এই জমির দখল ছেড়ে দেন।
বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার নির্বাচনী এলাকা নেত্রকোনা-৪ এর মোহনগঞ্জে গড়ে তুলেছিলেন ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। জয়নাল হাজারীর স্টিয়ারিং কমিটির আদলে গঠিত এই কমিটি ছিল ‘এইট কমিটি’ নামে পরিচিত। ৮ নেতার সমন্বয়ে গঠিত বলে কমিটি এই নামে পরিচিতি পায়। এই এইট কমিটি মোহনগঞ্জকে সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এইট কমিটির সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে প্রতিপক্ষের কমপক্ষে ৩ জন খুন হয়। আহত হয় অসংখ্য। অনেক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায় এইট কমিটির সন্ত্রাসীরা। একটি ঘটনায় আদালত ৫ সন্ত্রাসীকে শাসিত্ম দিলেও বাবরের প্রচেষ্টায় তাদের সাজা মওকুফ করে আবার মাঠে নামানো হয়। এলাকায় ব্যাপক প্রভাব ছিল এইট কমিটির। কেউ তাদের বির”দ্ধে মুখ খোলার সাহস করতো না। ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, কাবিখা-টিআরের বরাদ্দ বণ্টন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব সবই ছিল এইট কমিটির হাতে।
সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের বির”দ্ধে সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ জঙ্গিবাদ লালনের। সামপ্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর বির”দ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। হাওয়া ভবনসহ বিএনপি-জামাতের শীর্ষ মহলের ইঙ্গিতে জঙ্গি দমনের পরিবর্তে তাদের মদদ দিয়েছিলেন বাবর। তার ও হাওয়া ভবনের মূল দুশ্চিনত্মা এখানেই। বাবর যৌথ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সবকিছু ফাঁস করে দিতে পারেন এই আশঙ্কায় বাবরকে রক্ষায় মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি হাইকমান্ড।
Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-02-07

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: