তারেকের পাশে কেউ নেই

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের পাশে আজ কেউ নেই। বিগত পাঁচ বছরে তার পৃষ্ঠপোষকতায় এবং অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বদলি-পদোন্নতি, কমিশন গ্রহণসহ নানা অনৈতিক পথে কোটি কোটি টাকা লুটপাটকারী সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা কেটে পড়েছেন। অবৈধভাবে অর্জিত কালো টাকা রক্ষায় ব্যস- তারা। ইতিমধ্যে তার আশীর্বাদপুষ্ট বেশ কয়েকজনকে যৌথ বাহিনী গ্রেফতার করেছে। গা ঢাকা দিয়েছেন বাকিরা। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। তাই নিঃসঙ্গ তারেক রহমান এখন আর বনানীর হাওয়া ভবনেও যাচ্ছেন না।

ক্যান্টনমেন্টে মা বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে অনেকটা অন্তরীণ দিনযাপন করছেন তিনি। তাকে নিয়ে আজ নানা গুজব।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই তারেক রহমান এবং হাওয়া ভবনকে ঘিরে গড়ে ওঠে বিএনপির তরুণ নেতা ও ব্যবসায়ীদের একটি চক্র। তারেক রহমানকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান হিসেবে আখ্যায়িত করে নানা চাটুকারিতার মাধ্যমে দ্রুত চাটুকাররা তারেকের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। প্রায় প্রতিদিনই হাওয়া ভবনে গিয়ে তারেকের বন্দনায় ব্যস্ত থাকতেন তারা। সুবিধাবাদী ওইসব নেতা তারেক রহমানের বিশ্বস্ততা অর্জন করে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে আসীন হন।

দলের অনেক সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে তাদের অনেককে ২০০১ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। এমনকি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দলের অনেক প্রবীণ নেতাকে বাদ দিয়ে জেলা পর্যায়ের কিছু তর”ণ নেতাকে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী করা হয়। এরপর থেকে হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান তারা। ফলে বিগত পাঁচ বছর লাগামহীনভাবে তারা চালিয়ে যান নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাট। প্রশাসনের নানা জায়গায় তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনের নাম ব্যবহার করে জোরপূর্বক আদায় করেন নানা সুবিধা। অনেক সিনিয়র মন্ত্রী ও নেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অপদস্থ করেন তারা। কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া এবং অধিক সুবিধাভোগী এ নেতারা আজ তারেক রহমানকে ছেড়ে আত্মরক্ষায় মরিয়া।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রভাবশালী তারেক রহমান ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হাওয়া ভবনের আশীর্বাদপুষ্ট নেতাদের মধ্যে ছিলেন- সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সাবেক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, মির্জা ফখর”ল ইসলাম আলমগীর, সাবেক এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়া, সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু ও বরিশালের মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার, সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা বরকতউল্লা বুলু, সাবেক ত্রাণ ও পুনর্বাসন উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু, সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রাজশাহী-৪ আসনের সাবেক সাংসদ নাদিম মোস্তফা, জামালপুর-১ আসনের এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, ঢাকা-৮ আসনের নাসিরউদ্দিন আহাম্মেদ পিন্টু, সিলেট-২ আসনের এম ইলিয়াস আলী, খুলনা-২ আসনের আলী আসগার লবী, ভোলা-৪ আসনের মোঃ নাজিমউদ্দিন আলম, বরিশাল-১ আসনের মোঃ জহিরউদ্দিন স্বপন, খাগড়াছড়ি আসনের আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ভোলা-২ আসনের হাফিজ ইব্রাহিম, বরিশাল-২ আসনের সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, রংপুর-৩ আসনের হাবিব-উন-নবী সোহেল, নীলফামারী-২ আসনের শাহ্‌রিন ইসলাম তুহিন, কুষ্টিয়া-৩ আসনের অধ্যক্ষ সোহরাবউদ্দিন, গাজীপুর-৩ আসনের একেএম ফজলুল হক মিলন, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের আবুল খায়ের ভূঁইয়া, কুমিল্লা-৪ আসনের মঞ্জুর”ল আহসান মুন্সী, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, বাগেরহাট-১ আসনের এমএএইচ সেলিম, নোয়াখালী-১ আসনের জয়নাল আবেদীন ফার”ক, নরসিংদী-১ আসনের খায়র”ল কবির খোকন প্রমুখ।

মন্ত্রী-এমপি ছাড়াও তর”ণ বেশকিছু নেতা এবং ব্যবসায়ী হাওয়া ভবনের সুবিধাভোগী। চুটিয়ে ব্যবসা করেছেন তারা ৫ বছর। তবে হাওয়া ভবনের মূল সুবিধাভোগী তারেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। তিনিই তারেকের পক্ষে সব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। মামুন গ্রেফতারের পর থেকেই আতংকে তারেক রহমান।
দলের সহ-দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি, ঢাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম, ছাত্রদল সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল ও সাধারণ সম্পাদক শফিউল বারী বাবু, হাওয়া ভবনের কর্মকর্তা আশিক ইসলাম, রকিবুল ইসলাম বকুল, সাজ্জাদুল ইসলাম জয়, মিয়া নূর”দ্দীন অপু, ড্যাব নেতা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, কৃষিবিদ জাবেদ ইকবাল, শাজাহান সিরাজের ছেলে অমিতাভ সিরাজ অপুসহ অন্য অনেকে তারেক রহমানের ছত্রছায়ায় সুযোগ-সুবিধা লুটেছেন।
জানা গেছে, ১১ জানুয়ারি দেশে জর”রি অবস্থা ঘোষণা ও রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের পর তারেকঘনিষ্ঠ এসব সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতা সতর্ক চলাফেরা শুরু করেন। আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করেন। প্রথমদিকে কিছুদিন মুষ্টিমেয় কিছু নেতা হাওয়া ভবনে যাতায়াত করতেন। তখন তারেক রহমানও নিয়মিত হাওয়া ভবনে যেতেন। সেখানে কিছুসংখ্যক সাবেক তরুণ সাংসদ ও নেতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করতেন তিনি। গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে গ্রেফতারে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের খবরে হাওয়া ভবনে নেতাদের যাতায়াত কমে যায়। এ সময় তারেক রহমানকে হাওয়া ভবনে প্রায় একাই বসে সময় কাটাতে হতো। যেখানে জোট সরকারের পাঁচ বছর দলের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দিনের পর দিন ঘুরতে হতো- এখন সাধারণ নেতারা তো দূরের কথা, নিয়মিত যাতায়াতকারী নেতারাও আর সেখানে যাচ্ছেন না। এতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান উভয়েই দলের নেতাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। এ পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে গ্রেফতারের পর তারেক রহমান নিজেও হাওয়া ভবনে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। মা বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শে তিনি হাওয়া ভবনে যা”েছন না বলে জানা গেছে। ফলে বেশ আতংকের মধ্যে গত এক সপ্তাহ ক্যান্টনমেন্টের ৬, মইনুল রোডের বাসভবনে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

দলীয় সূত্র জানায়, তারেক রহমানকে বাসায় বসে অন্যের মোবাইল ফোনে ঘনিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ ঘনিষ্ঠ নেতা তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ রক্ষা করতে চাচ্ছেন না। তারা মনে করছেন, তারেক রহমান এবং হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পাওয়াই এখন তাদের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিডিয়ায় তাদের নানা দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। কেউ কেউ টেলিফোনেও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিচ্ছেন। হাওয়া ভবনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উড়োচিঠি ও টেলিফোনের মাধ্যমে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছে অনেকে। তাই এ মুহূর্তে হাওয়া ভবনঘনিষ্ঠ নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি তারা হাওয়া ভবনে গিয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ করতে রাজি নন। বেগম জিয়া অনেক নেতাকে ডেকেও এখন হাওয়া ভবনে নিতে পারছেন না।
দুর্নীতিবাজ হাওয়া ভবনঘনিষ্ঠ এসব প্রভাবশালী নেতা গ্রেফতার হওয়ায় বাকি নেতারা গোপন আস্তানায় চলে গেছেন। যৌথ বাহিনীর গ্রেফতার তালিকায় তাদের নামও রয়েছে। তারা সবাই গা ঢাকা দেয়ার পাশাপাশি আগের মোবাইল ফোনগুলোও বন্ধ করে দিয়েছেন।
অনেকে বিদেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ দু-একজন নেতা এবং হাওয়া ভবনের কয়েকজন কর্মকর্তা তারেক রহমানের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টে তার সঙ্গে অবস্থান করছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবন হওয়ায় সেখানে তারা অনেকটা নিরাপদ বলে মনে করছেন। পাশাপাশি তারা তারেক রহমানকে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় চেষ্টা করছেন বলেও সূত্র জানায়। যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আশংকায় তারেকঘনিষ্ঠ নেতারা অনেকে আত্মগোপনে কিংবা ঢাকার বাইরে অবস্থান করায় যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না। গ্রেফতারের আশংকায় তারেক রহমান নিজেও নিঃসঙ্গ দিন কাটাচ্ছেন।
বিগত পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি দেশ পরিচালনায় হাওয়া ভবনের গুর”ত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আর সেই ক্ষমতার মধ্যমণি ছিলেন তারেক রহমান। সেই তারেক রহমানকে ঘিরে ছিল সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠী। সেখানে দলের পুরনো ত্যাগী, সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতারা যেতে পারেননি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ের অনেক প্রবীণ নেতা হাওয়া ভবনঘনিষ্ঠ নেতাদের কারণে দলে ও এলাকায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সরকার ও দল পরিচালনায় তারেক রহমান তর”ণ নেতাদের গুর”ত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। তাতে দলের ত্যাগী ও প্রবীণ নেতারা ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের আগুনে জ্বললেও ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাননি।

প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাও হাওয়া ভবন কর্মকর্তাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন।
ইতিমধ্যে সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ ১২ জন নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। যৌথ বাহিনীর হাতে গত ৪ ফেব্র”য়ারি ভোররাতে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আমানউল্লাহ আমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নাসের রহমান, মঞ্জুর”ল আহসান মুন্সী, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া গ্রেফতার হয়েছেন। এরপর ৪ ফেব্র”য়ারি রাতে মোসাদ্দেক আলী ফালু এবং ৫ ফেব্র”য়ারি রাতে সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম যশোর ও এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক ত্যাগী নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারেক রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া নেতারা এখন কোথায়? তারেক রহমানের পাশে তাদের দেখা যা”েছ না কেন? এখন তারেক কেন ঘর থেকে বের হতে পারছেন না? তারা জানান, দুর্নীতিবাজ সুবিধাবাদী নেতাদের উত্থান না ঘটলে আজকে বিএনপি, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানসহ সর্বোপরি দেশে এই ক্রানি-কালের সৃষ্টি হতো না। তাদের মতে, ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সালের সরকার পরিচালনা এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সরকার পরিচালনায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। তাদের মতে, এজন্য দায়ী তারেক রহমান। আর বেগম খালেদা জিয়ার প্রশ্রয়েই এসব হয়েছে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-08

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: