ইউনূসের রাজনীতি : মিশ্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের প্রথম নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল গঠন করে সরাসরি রাজনীতিতে জড়ানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে সঞ্চার হয়েছে ব্যাপক কৌতূহলের।  ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এদেশের রাজনীতিতে ড. ইউনূসের এই আগমনী বার্তায় দেখা দিয়েছে নতুন চাঞ্চল্য। কবে কখন তিনি রাজনীতিতে আসছেন তার দিনক্ষণ না বলে তিনি অবশ্য বলেছেন, দেশের মানুষ যদি চায় তা হলেই তিনি রাজনীতিতে জড়াতে পারেন। বুধবার দেশে ফিরে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. ইউনূস তার এই ইচ্ছার কথা জানান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
ব্যবসায়িক অঙ্গন থেকে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে রাজনীতির বন্ধুর পথে ড. ইউনূসের এই যাত্রা কতোটুকু সুফল বয়ে আনবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশের রাজনীতির এক অনিত্মম মুহূর্তে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারির মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িকভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করার পর ড. ইউনূস নতুন রাজনৈতিক দল করার চিনত্মাভাবনা এবং রাজনীতিতে নামার ঘোষণাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিচার বিশ্লেষণ করে দেখছেন। তাদের অনেকেই ড. ইউনূসের আকাঙ্ক্ষাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ড. ইউনূস রাজনীতিতে এলে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি তার বিরূপ ধারণা কেটে যাবে। তবে রাজনীতিতে নামার আগে তাকে স্পষ্ট করে বলতে হবে তিনি কী কারণে রাজনীতিতে জড়াতে চান। তার কর্মসূচি কী হবে। দেশবাসীর কাছে তার ভিশন স্পষ্ট করা উচিত।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেনের কাছে এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, আমি নিশ্চিত নই ড. ইউনূস রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে আসলে কী বলেছেন। পত্রিকায় পড়েছি উনি বলেছেন দেশের মানুষ, সিভিল সোসাইটি চাইলে তিনি রাজনৈতিক দল করবেন। এটা ভালো কথা। উনার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন এটাকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। উনি ভালো মানুষ, গুণী মানুষ, সম্মানিত মানুষ, রাজনীতিতে এলে দেশের কল্যাণই হবে। তবে রাজনীতি করতে হলে দেশের জনগণকে নিয়ে করতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে। উনিতো বলেছেন, সবাই চাইলে তিনি রাজনীতিতে আসবেন। সবাই চায় কি না তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ড. কামাল বলেন, ড. ইউনূস আসলে কী চাচ্ছেন তা আরো পরিষ্কার করে বলতে হবে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিকেরই রাজনীতি করার অধিকার আছে। তবে ড. ইউনূস কী উদ্দেশ্যে রাজনীতি করতে চান তা আগে পরিষ্কার করতে হবে। যেখানে দেশে বহু প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল রয়েছে সে অবস্থায় উনি কেন নতুন দল করতে চান তা স্পষ্ট করে দেশের লোকদের জানাতে হবে। অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, ড. ইউনূস রাজনীতিতে জড়ালে দেশের জন্য কী কর্মসূচি নেবেন, তিনি কী ভাবছেন, কেমন সমাজ চান, কেমন অর্থনীতি চান, তার কর্মপন্থা কী হবে এগুলো খোলাসা করে বলতে হবে। আমরা তার মুখ থেকে আগে শুনতে চাই এগুলো। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক দল করা তো আর দোকান করা নয় যে ইচ্ছে হলেই করা যায়। জনগণের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস রাজনীতিতে এলে পৃথিবীতে নতুন দৃষ্টানত্ম স্থাপন করবেন। তার মতো আগে কোনো নোবেল বিজয়ী রাজনীতিতে আসেননি। রাজনীতিতে ড. ইউনূসকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আরো বলেন, যে কোনো লোক রাজনীতিতে আসতে পারেন। এটা তার গণতান্ত্রিক অধিকার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ড. ইউনূসের মতো লোকের প্রয়োজন রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে রাজনীতিকে যে কতো কঠিন করে তুলেছেন ড. ইউনূসরা রাজনীতিতে এলেই তা কেবল অনুধাবন করতে পারবেন। তোফায়েল বলেন, আগে আন্দোলন সংগ্রাম করে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটতো। এখন রাজনীতির ধরন পাল্টেছে।
ড. ইউনূসের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে সবারই রাজনৈতিক দল করার অধিকার আছে। তবে, এ দলের গ্রহণযোগ্যতা কী হবে তা ভবিষ্যতে জনগণই নির্ধারণ করবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেনন ড. ইউনূসের আকাঙ্ক্ষাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সবার রাজনীতি করার অধিকার আছে। ড. ইউনূস রাজনীতি করতে চাইলে উনাকে আমরা স্বাগত জানাবো। উনার দেখা উচিত রাজনীতি কেমন বিষয়।
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও ড. ইউনূসের রাজনীতিতে জড়ানোর ইচ্ছাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটা আমাদের জন্য সুসংবাদই বটে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাসন প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সরাসরি দল করার ঘোষণা ইতিবাচক সিদ্ধানত্ম। আমরা তার কর্মসূচি দেখবো। তার রাজনীতির কর্মসূচির ওপর নির্ভর করবে উনি কী করতে চান।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ড. ইউনুসের রাজনীতিতে জড়ানোর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ড. ইউনূস রাজনীতিতে এলে রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে তার যে বিরূপ ধারণা তা কেটে যাবে। তিনি যদি রাজনৈতিক দল করেন আর সেই দলের যদি দুর্নীতি, সামপ্রদায়িকতা, যুদ্ধাপরাধী এবং স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকে তা হলে তার সঙ্গে কাজ করার রাসত্মা উন্মুক্ত হবে। ইনু বলেন, যে রাজনীতিকে তিনি বিরূপ চোখে দেখতেন হয়তো এখন অনুধাবন করতে পেরেছেন দেশ বাঁচাতে হলে রাজনীতিই হচ্ছে সর্বশেষ অস্ত্র। রাজনীতিবিদদের সম্পর্কেও তার বিরূপ ধারণা রাজনীতিতে এলে কেটে যাবে। Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-02-09

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: