দুর্নীতি মামলার তালিকাভুক্ত আসামি মনিরউদ্দিনের দুর্নীতির কিসসা

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পদত্যাগী কমিশনার মনিরউদ্দিন আহমেদের বির”দ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বহু আগ থেকেই। বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর দায়ের করা দুটি দুর্নীতি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন তিনি। তাকে যখন দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তার আগে আপিল বিভাগের তৎকালীন বিচারপতি এমএ আজিজের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটির কাছেও তার মামলার খবরটি ছিল। কিন’ অজ্ঞাত কারণে সব জেনেশুনে তাকে কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। এ বিষয়টি নিয়ে গত দু’বছর অনেক সমালোচনা হয়। দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরও মনিরউদ্দিন আহমেদের নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। দুদকের গাড়ি ও আসবাবপত্র কেনা, বিধিবহির্ভূত কমিশনের আইনে ১৭০টি মামলা দায়ের ও ৬০/৭০টি মামলার আসামির বির”দ্ধে চার্জশিট দাখিল করে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়া তিন কমিশনারের মতামত ছাড়া নিজের পছন্দের অফিসারদের মধ্যে সোর্স মানি বাবদ কমিশনের তহবিল থেকে ৮ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়টি এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত। কমিশন ছাড়ার আগে প্রফেসর এম মিনর”জ্জামান মিঞার কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বরাবরই তাকে আড়াল করে অনেক কাজ হয়েছে কমিশনে। তিনি মনে করেন বিধিবিধান ছাড়া যাদের বির”দ্ধে দুর্নীতি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে পরোক্ষভাবে তাদেরই সহায়তা করা হয়েছে। যে কারণে মামলায় জড়িতরা আদালতে গিয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আইনগত সুবিধা পেয়েছেন। বহু মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ওই সব মামলার ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মনির উদ্দিনের বির”দ্ধে ১৯৯০ ও ১৯৯৭ সালে দায়ের করা দুর্নীতি মামলা দুটির প্রসঙ্গ উঠলে তিনি সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বির”দ্ধে মামলা হল অথচ তিনি জানবেন না এটা কেমন কথা। তবে মনিরউদ্দিন আহমেদ যে মিথ্যা বলেছেন তার প্রমাণ মিলেছে মামলার সূত্র ধরেই।
এদিকে, কমিশনার পদে নিয়োগ লাভের আগে মনিরউদ্দিন আহমেদ দুদক বাছাই কমিটির কাছে যে জীবনবৃত্তান- সরবরাহ করেন তাতেও তিনি তথ্য গোপন করেছেন। কয়েক মাস আগে রাষ্ট্রপতির বরাবর লেখা একটি চিঠিতে এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন নাম প্রকাশে অনি”ছুক এক ব্যক্তি। তবে মনিরউদ্দিন আহমেদ এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন।
চিঠিটির অনুলিপি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং দুদকের তিন কমিশনারসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়। মনিরউদ্দিনের বির”দ্ধে অভিযোগ ওঠায় দুদক কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এজাহারভুক্ত মামলার আসামি দুদকের কমিশনার হয়ে এতদিন দায়িত্ব পালন করলেন কিভাবে।
মনিরউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে লেখা চিঠিতে বলা হয়, ১৯৯০ সালে বিজেএমসি’র তখনকার পরিচালক (অর্থ) মনিরউদ্দিন আহমেদসহ ১৬ জনের বির”দ্ধে সরকারের ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করেন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা আবদুল হক (মামলা নম্বর-৫৫(১২)৯০)। মনিরউদ্দিন আহমেদ ওই মামলার ২ নম্বর আসামি ছিলেন। মামলার ১ নম্বর আসামি ছিলেন ওই সময়ের পাটমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম। তদন- শেষে আবদুল হক আদালতে যে চার্জশিট দাখিল করেন রহস্যজনক কারণে তা থেকে জাফর ইমাম ছাড়া অন্যদের নাম বাদ দেন। এ অবস্থায় জাফর ইমাম হাইকোর্টে রিভিশন চেয়ে আবেদন করলে মামলার নথি জজকোর্ট থেকে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। সেই থেকে এখন পর্যন- মামলাটির কোন সুরাহা হয়নি।
তাছাড়া ১৯৯৭ সালে মনিরউদ্দিন আহমেদ বিজেএমসি’র চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় সরকারের ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে ২০০০ সালের ২৭ জুন মনিরউদ্দিন আহমেদ এবং ওই সময়ের পাটমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার (অব.) এসএম হান্নান শাহসহ বেশ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে চিঠি পাঠানো হয়। কিন’ সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের করা (মামলা নম্বর ১২(৬)৯৭) মামলার তদন- কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম, হান্নান শাহসহ বেশ কয়েকজনের নামে অভিযোগ আনলেও অজ্ঞাত কারণে মনিরউদ্দিনকে আসামি করেননি।
অভিযোগকারী উল্লেখ করেন, দুটি মামলার নথি বিলুপ্ত ব্যুরোতে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও তা এখন নেই। মনিরউদ্দিন আহমেদ কমিশনার নিযুক্ত হয়েই তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের দিয়ে মামলার নথি গায়েব করে ফেলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মনিরউদ্দিন আহমেদ ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস-ান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বর্তমানে বিসিক) উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুর” করেন। ১৯৬৮ সালে যুগ্ম-পরিচালক পদে উন্নীত হন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ পর্যন- তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন’ পূর্ব পাকিস-ান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার অনুকূলে প্রকাশিত ‘দি ঢাকা গেজেট-১৯৬৫’ অনুযায়ী উল্লিখিত পদে চাকরি করার প্রয়োজনীয় কর্ম অভিজ্ঞতা (৭ ও ১০ বছর) মনিরউদ্দিন আহমেদের ছিল না। গেজেট অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রধান হিসাবরক্ষক পদটিরও কোন অসি-ত্ব নেই।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে কমিশনার মনিরউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, তার ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। কয়েক মাস আগে দুর্নীতি মামলা ও তার বির”দ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ওই মামলা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন’ কয়েকদিন আগে তিনি মামলার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তবে বিলুপ্ত ব্যুরোতে কর্মরত ছিলেন অথচ দুদকে অন-র্ভুক্ত করা হয়নি এই শ্রেণীর বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত এক সপ্তাহ ধরে মনিরউদ্দিন আহমেদের বির”দ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যা”েছন। তারা বৃহস্পতিবার তার অফিস কক্ষে তালা মেরে দেন। তারা সেগুনবাগিচার কার্যালয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা মনিরউদ্দিনকে বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে দুদককে রাহুমুক্ত করার দাবি পেশ করেন। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-12

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: