পুলিশে অবৈধ নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা বাবরের

পুলিশ বাহিনীতে লোক নিয়োগে জোট সরকারের নগ্ন দলীয়করণের ঘটনা ধরা পড়ায় পুলিশের মধ্যেই তোলপাড় শুরু হয়েছে। ৮ শতাধিক সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে জনপ্রতি ২ থেকে ৫ লাখ টাকা করে আদায়ের মাধ্যমে জোট সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা। পুলিশ সদর দপ্তরে এ নিয়ে রীতিমতো হই চই পড়ে গেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়া এই ৮৩৫ জন সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে কিভাবে চাকরিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তা জানতে যেকোনো সময় তাদেরকে গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জোট সরকার এবং পুলিশের কারা কারা জড়িত গোয়েন্দারা তাও খতিয়ে দেখতে শুর” করেছেন।
এদিকে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তরা গতকাল রোববার রাজধানীর রমনা পার্কের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তারা আজ সোমবার রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ ব্যাপারে স্মারকলিপি দেবেন বলে জানিয়েছেন।
শুধুমাত্র সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট নয়, জোট সরকারের আমলে এএসপি ও কনেস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও নগ্ন দলীয়করণ এবং দুর্নীতির অভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিধিমালা ও কোনোরকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র দলীয় আনুগত্যের বিবেচনায় এবং মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট পদে যে ৮৩৫ জনকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছিল তা বাতিল হওয়ায় জোট সরকারের গত ৫ বছরে পুলিশ বাহিনীতে সব ধরনের নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জোট সরকার কি তাহলে পুলিশ বাহিনীকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করতে যাচ্ছিল?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুলিশ বাহিনীতে লোক নিয়োগে দলীয়করণ ও দুর্নীতির সঙ্গে জোট সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং হাওয়া ভবন ঘনিষ্ঠরা সরাসরি জড়িত। তবে কনস্টেবল থেকে এএসপি পর্যন্ত দলীয় লোক নিয়োগের ব্যাপারে সাবেক স্বরাাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। দলের নেতা এবং তৎকালীন মন্ত্রী-এমপিরা এ ব্যাপারে তার দ্বারস্থ হতেন। শুধুু নিয়োগ নয়, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সবাই সরাসরি তারই শরণাপন্ন হতেন।
সূত্র মতে, বহুল আলোচিত হাওয়া ভবনের ফর্মুলায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয়টি যাচাই বাছাইয়ের পর প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ বাণিজ্য করা হয়েছে। সরকারের শেষ সময়ের নিয়োগের এই ঘটনা ধরা পড়লেও এর আগের সকল বিতর্কিত নিয়োগের ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের অনেকে এসব ব্যাপারে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে লুৎফুজ্জামান বাবরের মোবাইল ফোনে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বারবার তিনি লাইন কেটে দিয়েছেন। পরে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবনের অফিস সহকারী পলিন ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অফিস সহকারী রফিকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা এই প্রতিবেদককে বলেন, মন্ত্রিত্ব শেষ হওয়ার পর বাবর সাহেবের কোনো ফোন নম্বর তাদের জানা নেই।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরি পাওয়ার প্রথম শর্তই ছিল চাকরি প্রত্যাশী এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিএনপি বা জামাতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সাংসদের লিখিত সুপারিশকে গুর”ত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এই সুপারিশের নামে হয়েছে কয়েক কোটি টাকার খেলা। প্রতিজনের চাকরির জন্য যেন হাঁকডাক করে টাকা নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি এবং জেলা কোটা সরাসরি লঙ্ঘন করে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রতিবেদনের (ভেরিফিকেশন) গুর”ত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করা হয়েছে। রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপারদের কাছেও তৎকালীন মন্ত্রী, এমপিরা এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে সরাসরি তদবির করেছেন।
অপর একটি সূত্র জানায়, সমপ্রতি পুলিশের শীর্ষ পদসহ গুর”ত্বপূর্ণ পদে বড়ো ধরনের রদবদলের পরই পুলিশ নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়টি আইজিপি নূর মোহাম্মদের নজরে আনা হয়। পরে তার নির্দেশে গোপনে এর তদন্ত শুর” হয়। এ সংক্রান্ত নানা তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়ার পর দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফাইল তৈরি করা হয়। পরে সেই ফাইল পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।
পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, নূর মোহাম্মদ অতিরিক্ত আইজিপি থাকা অবস্থায়ই নিয়োগের পুরো বিষটি জ্ঞাত ছিলেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তখন তার কিছু করার ছিল না।
আইজিপি নুর মোহাম্মদ বলেন, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা কোটা মানা হয়নি। পরীক্ষা পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপে ব্যাপক অস্বচ্ছতা ছিল। স্বচ্ছতা না থাকায় এবং বিধি না মানায় বৃহত্তর স্বার্থে এই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। পুলিশের জনবল বৃদ্ধিতে আগামী ৩ মাসের মধ্যে বিধি মোতাবেক পুলিশে নতুন নিয়োগ করা হবে।
এদিকে চাকরি নামের সোনার হরিণ পেয়েও যারা নিয়োগ লাভের ঠিক আগ মুহূর্তে বঞ্চিত হলেন তারা দার”ণভাবে ভেঙে পড়েছেন। এসব যুবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, দলীয় বিবেচনায় নয়, তাদের চাকরি হয়েছিল টাকার জন্য। এ ক্ষেত্রে তারা ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণসহ সব নিয়মই পালন করেছেন।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেল থেকে এআইজি মতিউর রহমান গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ভোরের কাগজকে বলেন, ৮৩৫ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল মানে তারা আর কোনোভাবেই চাকরিতে নিয়োগ পাবেন না। তবে এখনো এ নিয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এছাড়া এর আগে নিয়োগকৃতদের ব্যাপারে কোনো কিছু এখনো আলোচনা হয়নি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৮৩৫ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বির”দ্ধে কোনো ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না তা তার জানা নেই।
ক্ষতিগ্রস্তদের বিক্ষোভ : গতকাল রোববার সকাল থেকেই পুলিশে নিয়োগ বঞ্চিতদের অনেকেই একে একে রমনা পার্কের সামনে জড়ো হতে থাকেন। দুপুর গড়াতেই সেখানে ৩৫০ থেকে ৪০০ জন জড়ো হন। বিকালে রমনা ও শাহবাগ থানা পুলিশ সেখানে পৌঁছে তাদেরকে চলে যেতে অনুরোধ করলে তারা রমনা পার্কে ঢুকে পড়েন। পরে সন্ধ্যায় তারা ফিরে যান।
নিয়োগ বঞ্চিত মুন্সীগঞ্জের আবু হেনা মোস্তফা ক্ষোভের সঙ্গে ভোরের কাগজকে জানান, ২০০৫ সালের ১৯ এপ্রিল দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন অনুযায়ী তারা প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষায় অংশ নেন। ২৭, ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষায়ও তারা উত্তীর্ণ হন। তৎকালীন এআইজি(আর এন্ড এম) হাসান উল হায়দার ছিলেন নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব। তিনি প্রশ্নপ্রত্র ব্লাকবোর্ডে লিখে দেওয়ার পদ্ধতি চালু করেন। গত বছর ৩ আগস্ট মৌখিক এবং ১৯ সেপ্টেম্বর শারীরিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এরপর ’০৫ সালের ২০ জুলাই ভিআর ফরম পূরণের পর পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর এখন তারা চাকরিতে যোগদানের অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের দাবি, কোনোরকম দলীয় বিবেচনায় নয় সবরকম নিয়মনীতি মেনেই তারা পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পর শেষ মুহূর্তে সরকার তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করায় তারা দার”ণভাবে মর্মাহত হয়েছেন।
এদের একজন চাঁদপুরের মিলন জানান, ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাদের লিখিত পরীক্ষা হয়। ১১ মাস ১৩ দিন পর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এরপর ভাইভা ও মেডিকেল পরীক্ষা হয়েছে। কুমিল্লার মনির হোসেন জানান, শনিবার রাতে তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হওয়ার খবর শুনেই তারা মোবাইল ফোনে এক অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন।
কুমিল্লার আবুল হোসেন জানান, যাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল হয়েছে তাদের মধ্যে ৪৯৬ জন সাব-ইন্সপেক্টর, ২২১ জন সার্জেন্ট ও ৪০ জন মহিলা সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন। এই চাকরি নিশ্চিত হওয়ায় অনেকেই তাদের পূর্বের অন্য চাকরি ছেড়েছেন। এখন চোখে তিনি সর্ষে ফুল দেখছেন। Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-02-12

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: