ঢাকায় সালাহউদ্দিনের আত্মসমর্পণ : সিলেটে শামীম ও টাঙ্গাইলে আজাদ সিদ্দিকী গ্রেফতার

ঢাকায় সন্ত্রাসের গডফাদার ও বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমদ আদালতে আ্তসমর্পণ করেছেন। তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যৌথ বাহিনীর হাতে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার হোসেন শামীম ও ছাতক পৌরসভার চেয়ারম্যান আবুল কালাম চৌধুরীসহ ১২ জন এবং টাঙ্গাইলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকীর (বীরউত্তম) ভাই আজাদ সিদ্দিকী গ্রেফতার হয়েছেন। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলমও গ্রেফতার হয়েছেন। মাগুরায় বিএনপি নেতা আলী আহম্মদ ও আব্বাস উদ্দিনকে ঢাকার মিরপুর থেকে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে।
ঢাকা-৪ (ডেমরা-শ্যামপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন আহমদ যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার এড়াতে কৌশল ফেঁদে সোমবার আত্বসমর্পণ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে শ্রীঘরে যেতে হল। বরাবর নানা ছলাকলায় বিপদ-আপদ থেকে পার পেয়ে গেলেও এ যাত্রায় জামিন মেলেনি তার। যৌথ বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে পারে- এ আলামত পেয়েই তিনি পূর্বে দায়েরকৃত অস্ত্র আইন ও মুদ্রা পাচার সংক্রান- মামলায় সোমবার আদালতে আত্বসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানান। বেলা ১টায় এজলাসে উঠে নিজেই শুরু করেন মামলার শুনানি। এলাকায় জনগণের সেবা করার দোহাইয়ে জামিন প্রার্থনা করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপিপন্থী জনাচারেক আইনজীবী। আদালত তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে পাঠিয়ে দেন কারাগারে।
কারাগার সূত্র জানায়, সাবেক এমপি সালাহউদ্দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিভিশন পেয়েছেন। সালাহউদ্দিনের আত্বসমর্পণের খবরটি ছিল সোমবার রাজনীতিতে ‘টক অব দ্য টাউন’। এ নিয়ে ডেমরা-শ্যামপুরে আলোচনার ঝড় বইছে। জানা গেছে, যৌথ বাহিনী গত ৪ ফেব্রুয়ারি সালাহউদ্দিনকে গ্রেফতারের জন্য তার বাড়িতে অভিযান চালায়। তখন তিনি ছিলেন আ্তগোপনে। বাসা থেকে যৌথ বাহিনী উদ্ধার করে পাঁচশ’ ইউএস ডলারসহ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, ৩টি তলোয়ার ও ১টি ছুরি। এর আগে তার বিরুদ্ধে ৮ জানুয়ারি শ্যামপুর থানায় এসআই আবুল খায়ের বাদী হয়ে দায়ের করেন দুটি মামলা। এই দুই মামলায় সোমবার তিনি হাজির হন ঢাকার সিএমএম আদালতে। বেলা সাড়ে ১১টায় সালাহউদ্দিন আদালত প্রাঙ্গণে হাজির হন। তবে তার সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীরা তেমন উপস্থিত ছিলেন না।
কোর্ট রিপোর্টার জানান, আদালতে ‘আমাকে জামিন মঞ্জুর করে এলাকার জনগণের উন্নয়ন ও সেবা করার সুযোগ দিন’- বলেও পার পেলেন না সালাহউদ্দিন আহমদ। গ্রেফতার এড়াতে শ্যামপুর থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের করা পৃথক দুটি মামলায় ঢাকার সিএমএম কোর্টে আ্তসমর্পণ করে তিনি জামিনের আবেদন করেন। ম্যাজিস্ট্রেট মামুন আল রশিদ সালাহউদ্দিনের জামিনের আবেদন নাকচ করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। পরে তার আইনজীবীরা জেলখানায় তাকে ডিভিশন দেয়ার আবেদন করলে ম্যাজিস্ট্রেট জেলকোডের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করেই এলাকা থেকে উধাও হয়ে যান সালাহউদ্দিন। তিনি এলাকায় সংগোপনে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বিশেষ করে গত বছরের ৫ মে শনির আখড়ায় জনরোষের মুখে দৌড়ে পালানোর পর সালাহউদ্দিন আহমদ তার এলাকায় আর স্থির হতে পারেননি। সেদিন তিনি গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিবঞ্চিত বিক্ষুব্ধ জনতার দাবি উপেক্ষা করে পুলিশকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন মিছিলে। জনরোষ থেকে জীবনরক্ষা করতে ৫ মে সালাহউদ্দিনের সেই দৌড়ের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে এলাকাবাসী এখন বলছেন- ‘সেদিন দৌড়ে পালিয়ে গেলেও এ যাত্রায় পালাতে পারেননি সালাহউদ্দিন।’ ডেমরা-শ্যামপুর ঘুরে জানা গেছে সাবেক এমপি বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনের নানা কীর্তি।
সেই সালাউদ্দিন এবং শনির আখড়ার ঘটনা : জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি অঢেল বিত্তবৈভবের মালিক বনে যান তিনি। অনেকটা আলাদিনের চেরাগের মতো সবকিছুই তার হাতে চলে আসে। খুন, চাঁদাবাজি, জমি দখল, জবরদখল, সরকারি অর্থ আ্তসাৎ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ নিয়োগ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মামলা-হামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানিসহ এহেন কোন অপকর্ম নেই যা সালাহউদ্দিন করেননি। স্কুল-কলেজের শিক্ষক থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম পর্যন- এমন কোন শ্রেণী-পেশার মানুষ নেই যাকে সালাহউদ্দিন অপমান-অপদস- করেননি। কথায় কথায় গায়ে হাত তোলা তার স্বভাবসুলভ আচরণ। এলাকার বা নিজের কোন সমস্যা সমাধানে তার সহযোগিতা চেয়ে মার খেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। তার বিপক্ষে যে যায় তার ওপরই নেমে আসে চরম অত্যাচার, জুলুম আর নির্যাতন। কাউকে কাউকে বাড়িতে ডেকে এনে নিজ হাতে শায়েস-া করতেন। কারও ওপর ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে দিতেন। কাউকে মামলা বা পুলিশ দিয়ে হয়রানি করতেন। নিজ দলের কর্মী-সমর্থকরাও তার অত্যাচারের আওতামুক্ত নয়।
গত বছরের ৫ মে শনির আখড়ায় জনরোষের মুখে দৌড়ে পালানোর পেছনেও অনেকটা দায়ী ছিল তার আচরণ। পানি-বিদ্যুতের মতো ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা পাওয়ার দাবিতে জনগণ যখন রাস-ায় নেমে এসেছিল। সেদিন সাবেক সাংসদ সালাহউদ্দিন তাদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস না দিয়ে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন গুলি করতে। ওই ঘটনার পর শুধু বিএনপি বা তার এলাকা নয়, বরং সারাদেশের মানুষের কাছে সাবেক এই সাংসদ ‘শনির আখড়া সালাহউদ্দিন’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এর পরও আচরণের পরিবর্তন দূরের কথা তিনি এতটাই বেপরোয়া ও হিংস্র হয়ে ওঠেন যে, যাকে ইচ্ছা যখন-তখন টেলিফোনে হত্যার হমকি দিতেন বলে অভিযোগ আছে। তার শ্যালক রুবেল ও ছেলে এমরান আহমেদ রাসেল। এই রুবেল-রাসেল বাহিনী এখন ডেমরা-শ্যামপুরের খুন-খারাবি ও চাঁদাবাজির মূল হোতা বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। তাদের রয়েছে একটি নিজস্ব দুর্মুজ বাহিনী। এই দুর্মুজ বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ একাধিক মামলা। এই বাহিনীর মূল নিয়ন্ত্রক হল সালাহউদ্দিনের শ্যালক রুবেল ও ছেলে রাসেল।
শ্যামপুর এলাকার খুবই সাধারণ পরিবারে জন্ম সাবেক সাংসদ সালাহউদ্দিনের। দাদা হাজী জুলফিকার আলী সর্দার ও পিতা হাজী আবদুল বারেক সর্দার ইটের ব্যবসা করতেন। পৈতৃক সূত্রে সালাহউদ্দিন যা পেয়েছিলেন তা খুবই যৎসামান্য। চাচার ইটখোলায় চাকরির পাশাপাশি গুলিস-ান স্টেডিয়াম মার্কেটের সিঁড়ির নিচে ছিল তার ছোট্ট একটি রেডিওর দোকান। এতে যা আয় হতো তা দিয়ে কোনরকমে চলত তার সংসার। এ বক্তব্য শ্যামপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদেরই। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। ডেমরার সাবেক এক ছাত্রদল নেতাকে দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ১৯৭৫ সালে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ্লাতক পাস করেন। ক্ষুদ্র ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতিতে নাম লেখান তিনি। ১৯৭৭ সালে তখনকার ঢাকা মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস-াফিজুর রহমান খোকনের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন। অনেক কাকুতিমিনতি করার পর শ্যামপুর ইউনিয়ন জাগ যুবদলের সদস্য হিসেবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ডেমরা থানা যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পান। ’৮০-পরবর্তী বিএনপির স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দলের শীর্ষ নেতাদের নজরে আসেন সালাহউদ্দিন। মারমুখী আচরণের কারণে দলীয় ক্যাডারদের সারিতে নাম লেখা হয় তার। পুরস্কার হিসেবে ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। ঢাকা-৪ আসনের বিএনপির সাবেক সাংসদ ডা. আবদুর রউফের মৃত্যুর পর কপাল খুলে যায় সালাহউদ্দিনের। এলাকায় দলের উল্লেখযোগ্য কোন নেতা না থাকায় ’৯১-এর নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে যান তিনি। দু’বছর যেতে না যেতেই ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উডসাইড কুইন্স এলাকায় বিলাসবহুল বাড়ি কেনেন তিনি। শ্যামপুর এলাকায় নিজের বাড়ির পূর্ব পাশে গরিব আ্তীয়-স্বজনের ৩ বিঘা জমি জবরদখল করে বিলাসবহুল বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর গুলশানের ১৬/এ রোডে আরও একটি ৩ তলা বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী হাবিবুর রহমান মোল্লার কাছে পরাজিত হন। চলে যান আমেরিকায়। ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে আবারও দেশে ফেরেন তিনি।
চাঁদাবাণিজ্য : চাঁদা আদায়ের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন সালাহউদ্দিন। ’৭৮ সালে ডেমরা যুবদলের সভাপতি হয়েই তিনি এলাকার ফুটপাতের দোকানপাট, পরিবহন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় শুরু করেন। চাঁদাবাজির কারণে তাকে তখন সংগঠন থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছিল বলে জানান সেই সময়কার ঢাকা মহানগর যুবদল নেতা মোস-াফিজুর রহমান খোকন। ’৯১ সালে সাংসদ হওয়ার পর তার চাঁদাবাজির মাত্রা বেড়ে যায়। ডেমরা-শ্যামপুরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পরিবহন এমনকি ফুটপাত থেকে তার নামে চাঁদা তোলা হয়। এলাকায় কোন নতুন বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করতে গেলেই সালাহউদ্দিকে ৫০ হাজার থেকে ২/৩ লাখ টাকা সেলামি দিতে হতো। এসব টাকা দিয়ে সালাহউদ্দিন নিউইয়র্কের উডসাইড কুইন্সে বাড়ি কেনেন। ২০০১ সালে এমপি হওয়ার পর বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি নিয়মিত চিঠি দিয়ে চাঁদা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। ঢাকা-৪ আসনের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের টেন্ডার নিজ ছেলে রাসেলকে দিয়ে করান। কিছু দলীয় লোকদের দিলেও তা থেকে নির্ধারিত হারে কমিশন নেন।
দখলবাজি : শুধু বুড়িগঙ্গার বা সাধারণ জনগণের সম্পত্তি দখল করেই ক্ষান- হননি সালাহউদ্দিন। এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জমিও রেহাই পায়নি তার হাত থেকে। এক্ষেত্রে তিনি ওই ব্যক্তিদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সালাহউদ্দিনের ক্যাডাররা শুধু জমি দখল করেই ক্ষান- হয়নি, উল্টো মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে। গুরুনগরে ২৫ বিঘা সম্পত্তি দখল করে নেন তিনি। কাজলা পেট্রল পাম্প সংলগ্ন বেশকিছু সরকারি জায়গা ও কাজলা মহিলা মাদ্রাসার জায়গা দখল করে সেখানে এস আহম্মেদ ফাউন্ডেশন নামে একটি মার্কেট গড়ে তোলেন। যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল হাইস্কুলের পাশে ৮৬ নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মনিরের জায়গা স্কুল সম্প্রসারণের নামে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়। পরে সেখানে তিনি নিজেই বাড়ি নির্মাণ করেন। সায়েদাবাদের আর কে চৌধুরী স্কুল ও কলেজ ফান্ডের টাকায় শ্যামপুরে ১০ কাঠা জমি কিনে নিজেই দখল করেন। এ ধরনের বিস-র দখলদারির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অর্থ আ্তসাৎ : ডেমরা ও শ্যামপুর থানায় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন সাবেক সাংসদ সালাহউদ্দিন আহমদ। যার প্রত্যেকটিতেই অর্থ আ্তসাৎ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যেসব শিক্ষক এসবের প্রতিবাদ করতেন তাদেরই অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে। দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষকেও একই কারণে বিদায় নিতে হয়।
গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত রিলিফের টিনের লোভও সামলাতে পারেননি সালাহউদ্দিন। শ্যামপুর বাজারের কাছে সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা বসি-বাসীর জন্য দেয়া রিলিফের টিনও আ্তসাৎ করেন তিনি। ক্যাডারদের দিয়ে উচ্ছেদ করেন বসি-বাসীদের।
সিলেটে শামীম, কালামসহ ১২ জন আটক
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে সন্ত্রাসী, গডফাদার ও ভূমিদস্যুসহ ১২ জন আটক হয়েছে যৌথ বাহিনীর অভিযানে। রোববার রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন- অভিযান চালিয়ে এদের আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে রয়েছে- সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার হোসেন শামীম, ছাতকের পৌর চেয়ারম্যান আবুল কালাম চৌধুরী, খাদিমপাড়া ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন, ভূমিদস্যু দারা মিয়া, মোহাম্মদ আলী মক্কু, আবদুল কাদির মেম্বার ছাড়াও আরও ৬ দুর্বৃত্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আটক হওয়া ছাতক পৌরসভার চেয়ারম্যান আবুল কালাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় রয়েছে নানা অপকর্মের। অভিযোগ রয়েছে, হত্যা ছাড়াও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক তিনি। এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৬টি মামলা রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা দফতরে লিখিত বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন তার লালিত কালাম বাহিনীর নির্যাতনে পঙ্গুত্ব বরণকারীরা। এসব মামলায় শাসি-র মুখোমুখি হতে হয়নি অর্থ-বিত্ত ও প্রভাবের কারণে। রোববার রাতে সিলেটের মিরাবাজার এলাকা থেকে তাকে যৌথ বাহিনী আটক করে। তাকে আটকের খবর পাওয়ার পর সোমবার সকালে ছাতক পৌর সদরে মিষ্টি বিতরণ করেন তার প্রতিপক্ষ ও নির্যাতিতরা। কালামকে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করা হয়। বিকালে কোতোয়ালি পুলিশ তাকে ছাতক থানায় হস-ান-র করে। ছাতক থানা তাকে সুনামগঞ্জ আদালতে সোপর্দ করে। সোমবার বেলা ১১টায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় আটক হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক ইফতেখার হোসেন শামীম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অতীতে তিনি নগরীর শেখঘাটস্থ খ্রিস্টান পরিবার ডা. বীণা রানী ও ডা. হাসি রানী আলফ্রেডের মালিকানাধীন কোটি টাকার ভিটেমাটি আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন। এছাড়াও সিলেট তপোবন আবাসিক এলাকার নামে সরকারি ভূমি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ডা. হাসি রানী ও ডা. বীণা রানীর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার নেপথ্য নায়ক বলেও আলোচিত হয়ে উঠেছিলেন শামীম। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুর্বৃত্ত লালনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সুবিধা ভোগ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিকালে তাকে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করা হয়। খাদিমপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ চৌধুরীর বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। ভূমিদস্যুতা ছাড়াও সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুর্বৃত্ত লালনের ব্যাপারে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে তাকে আদালতে হাজির করা হয় বিদ্যুৎ বিল অনাদায়ের একটি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে। তাকে কোতোয়ালি থানায় সোপর্দের পর বিকালে আদালতে হাজির করা হলে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করায় আদালত তাকে জামিন দেন।
খাদিমনগর এলাকার দারাবাজারের কথিত জমিদার ভূমিদস্যু দারা মিয়া। প্রবাসীসহ বেশ কয়েকটি পরিবারের কোটি কোটি টাকার ভূ-সম্পত্তি ভাড়াটে দখলদারদের নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দখলবাজ সন্ত্রাসী লালন ও ভূমিদখলের ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাও রয়েছে। সোমবার দক্ষিণ সুরমার কুচাই এলাকাস্থ তার বাড়ি থেকে তাকে আটক করে যৌথ বাহিনী। দক্ষিণ সুরমার অপকর্মের ঘটনায় বহুল আলোচিত ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালামের চাচা। দারা মিয়ার বিরুদ্ধে ভুয়া পুত্রবধূ সাজিয়ে নাম ঠিকানা ও ছবি জালিয়াতির মাধ্যমে জমি বন্দোবস- গ্রহণের দায়ে ২০০৫ সালের ৮ জুন গোয়াইনঘাট উপজেলা ভূমি অফিস লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। তাছাড়া গুলনী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাস-া দখল, জোরপূর্বক জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট আদায়সহ খাদিমের ফড়িংউড়া মৌজায় ভূমিদস্যু বলে পরিচিতি রয়েছে তার।
সিলেটের জালালাবাদ গ্যাস ভবনের গডফাদার সিবিএ নেতা মাসুক উদ্দিনের গ্যাস কোয়ার্টারের বাসায় হানা দিলেও যৌথ বাহিনী তাকে আটক করতে পারেনি। তবে তার সহযোগী সিবিএ নেতা গোলাম হামিদ বাবুলসহ ৩ জনকে আটক করা হয়। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জালালাবাদ গ্যাসের কোটি কোটি টাকা লুটপাট, টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এ সময় মাসুকের বাসা থেকে আটক করা হয় মাসুকের সহযোগী আলী আকবর, জাকারিয়া ধলাকে। জৈন-ায় দুই ভূমিখেকোকে আটক করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল কাদির ও মোহাম্মদ আলী মাক্কু। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় একটি গবেষণা কেন্দ্রের জায়গা জোর করে দখলের অভিযোগ রয়েছে। গাছ কাটার ঘটনায়ও তারা অভিযুক্ত। এছাড়া যৌথ বাহিনীর অভিযানে আটক হয়েছে ছাত্রদলের ৩ ক্যাডার। তারা হচ্ছে মুন্সীপাড়ার মানিক মিয়া, ঝালোপাড়ার মোস-ফা ও চঞ্চল। তাদের দক্ষিণ সুরমা থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলে আজাদ সিদ্দিকী গ্রেফতার
যুগান-র রিপোর্টার জানান, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের ছোট ভাই, টাঙ্গাইলের শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজ আজাদ সিদ্দিকীকে যৌথ বাহিনী সোমবার ভোর রাতে জেলার কালিহাতী উপজেলার ইছাপুরের বাদশা মিঞার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে। তার বিরুদ্ধে ৩টি হত্যাসহ ২৬টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে তাদের অপর ভাই মুরাদ সিদ্দিকীকে যৌথ বাহিনী গ্রেফতার করে।
সিদ্দিকী পরিবারের ছোট দুই ভাই মুরাদ সিদ্দিকী ও আজাদ সিদ্দিকী ‘আজাদ-মুরাদ’ বাহিনী নাম ধারণ করে ৮০’র দশকে একটি বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে। এই বাহিনী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে টাঙ্গাইল শহরের আধিপত্য বিস-ার করে একে একে সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি ও ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের সব উন্নয়ন কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে শত কোটি টাকা লুটে নেয়। আজাদ সিদ্দিকীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ফলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এক সময় তার অফিস গুটিয়ে ময়মনসিংহে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে জোট সরকারের হস-ক্ষেপে আবার টাঙ্গাইলে ওই অফিস চালু হয়। কোন ঠিকাদার এই বাহিনীর বিরুদ্ধ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। বিএনপি সরকারের শেষ সময় পর্যন- এ বাহিনীর দাপট ছিল অপ্রতিরোধ্য। ৩০ জানুয়ারি ৩টি হত্যা ও ২৩ মামলার অভিযুক্ত সিদ্দিকী পরিবারের সদস্য মুরাদ সিদ্দিকী যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জেলহাজতে পাঠানো হয়। রোববার মুরাদ সিদ্দিকীকে পুনরায় ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জয়েন্ট ইন্টারগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
আজাদ সিদ্দিকী গ্রেফতারের ফলে টাঙ্গাইলের জনমনে স্বসি- নেমে এসেছে। যৌথ বাহিনীর সন্ত্রাসী গ্রেফতার অভিযানকে জনগণ স্বাগত জানিয়েছে।
বগুড়ায় পৌর চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর গ্রেফতার
বগুড়া ব্যুরো জানায়, বগুড়ায় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সোমবার দুপুরে দুপচাঁচিয়া পৌরসভা থেকে চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও থানা বিএনপির সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করেছেন। বিকালে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে তাকে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
জানা গেছে, দুপচাঁচিয়ার বেরুঞ্জ গ্রামের আফতাব হোসেনের ছেলে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর চারদলীয় জোট সরকারের আশীর্বাদে পৌর চেয়ারম্যান হন। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, ভূমিদখল ও অবৈধ পন্থায় হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর তিনি গা ঢাকা দেন। সোমবার বেলা ২টার দিকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা তাকে পৌরসভা থেকে গ্রেফতার করেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তাকে আদালতে সোপর্দ করার পর ডিটেনশনের আবেদন করা হবে। জাহাঙ্গীর গ্রেফতার হওয়ায় এলাকার জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সেই সঙ্গে তার সহযোগী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
মাগুরার দুই বিএনপি নেতা গ্রেফতার
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আহম্মদ বিশ্বাস এবং জেলার শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্বাসউদ্দিনকে র‌্যাব ঢাকার মিরপুর থেকে সোমবার বিকালে গ্রেফতার করেছে। মাগুরার জাহিদ নামের এক ব্যবসায়ীর অফিসে এ দু’জন আত্বগোপন করেছিল বলে সূত্র জানায়। ঢাকায় র‌্যাব-৪ অফিসে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গেছে। এ দু’জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-13

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: