লালুর বাড়ি থেকেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারের বিপুল পরিমাণ সামগ্রী উদ্ধার

গম কেলেঙ্কারি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজিসহ বহু অপকর্মের নায়ক বগুড়ার শীর্ষ গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত বগুড়া-৭ আসনের সাবেক সাংসদ হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুকে গতকাল বুধবার দুপুরে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার মধ্য রাতে দেশের দ্বিতীয় হাওয়া ভবন বলে পরিচিত বগুড়া শহরের সূত্রাপুরের রিয়াজ কাজী লেনের তার বাসভবন ‘চমপা মহল’ থেকে যৌথবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে এবং তার বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারের বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী, একটি অবৈধ ওয়্যারেলস টাওয়ার ও বেশ কয়েকটি ওয়্যারলেস সেট উদ্ধার করে। এই অভিযানকালে যৌথবাহিনীর সদস্যরা চমপা মহলের দ্বিতীয় তলায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের কক্ষও তল্লাশি করে এবং সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। রাতেই সাবেক সাংসদ লালুকে বগুড়া সদর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
গত মঙ্গলবার রাতেই এই ঘটনায় বগুড়া সদর থানার এসআই আতাউর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় বিতর্কিত এই সাংসদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলকভাবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারের মালামাল নিজ জিম্মায় রেখে আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সাবেক সাংসদ লালুকে আদালতে হাজির করা হলে তার পক্ষ থেকে আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। ম্যাজিস্ট্রেট নূরুন্নাহার বেগম তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১১টায় যৌথবাহিনী তার বাড়ি ঘিরে ফেললেও সাড়ে ১১টায় তার বাসভবনের মধ্যে ঢুকে অভিযান শুরু করে যা চলে ১২টা ১০ মিনিট পর্যনত্দ। এসময় তারা তার বাসার গ্যারেজে তল্লাশি চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভাণ্ডার থেকে পাঠানো বিপুল সংখ্যক কম্বল, ৩৫টি টিউবওয়েল ও ১৬০টি টিউবওয়েলের পাইপ; জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বিভিন্ন ক্লাব, পাঠাগার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঠানো ক্যারাম বোর্ডসহ ক্রীড়া সামগ্রী, ১৪ বসত্দা বিভিন্ন প্রকার কাপড়, ৮৫টি সুয়েটার, মেয়েদের ব্যবহারের জন্য পাওয়া ৩ বসত্দা ম্যাক্সি, ২ বসত্দা থ্রিপিস এবং বিপুল পরিমাণ শার্ট ও প্যান্ট উদ্ধার করে। একই অভিযানকালে কোনো বৈধ কাগজপত্র না পেয়ে চমপা মহলে ব্যবহৃত একটি ওয়্যারলেস টাওয়ার ও বেশ কয়েকটি ওয়্যারলেস সেট জব্দ করে।
২০০১ সালের নির্বাচনের পর বগুড়ার গাবতলীতে এক জনসভায় নিজেকে ফেনীর সাবেক সাংসদ জয়নাল হাজারীর সঙ্গে তুলনাকারী সাবেক সাংসদ হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু গত ৫ বছর জোট সরকারের শাসনামলে গাবতলীতে বিরোধী দলের জন্য ছিলেন ত্রাস। সাংসদ লালুর নির্দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা এমনকি প্রশাসনও গাবতলীতে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কোনো সভা-সমাবেশ এমনকি মিছিলও করতে দেয়নি। এছাড়া তার নির্যাতনের কারণে গাবতলীর বেশ কয়েকজন চেয়ারম্যানকে এলাকা ছেড়ে থাকতে হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় থানায় একাধিক মামলা দায়ের করে লালুর সহযোগীরা। প্রশাসনের সহযোগিতায় লালু তার পোটোয়া বাহিনী দিয়ে মামলা হামলা করে বিরোধীদলীয় নেতাকমর্ীদের এলাকা ছাড়া করেছিলেন।
বগুড়ার বহুল আলোচিত সাবেক সাংসদ লালু ১৯৮১ সালে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি বগুড়া -৭ (গাবতলী) আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সাংসদ নির্বাচিত হন। প্রতিবারই তিনি বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া এই আসনের উপনির্বাচনে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। শহরের সূত্রাপুরের রিয়াজ কাজী লেনে অবস্থিত লালুর বাসভবনটি চমপা মহল নামে পরিচিত হলেও বিগত ৫ বছরে এই ভবনকে মানুষ হাওয়া ভবন হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। কারণ তারেক রহমান রাজনীতি শুরু করার পর থেকে এই চমপা মহলে এসে থাকতেন। এ জন্য ওই বাড়ির দোতলায় অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ঘরও তৈরি করে দেওয়া হয় তারেক রহমানের জন্য। তারেক রহমানের সঙ্গে বিশেষ সমপর্ক থাকায় বিএনপির এই সাবেক সাংসদ চলাচল করতেন বেপরোয়াভাবে এবং এ কারণে গম কেলেঙ্কারি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি ও লুটপাট করেছেন কাউকে কোনো তোয়াক্কা না করেই।
২০০২ সালের আগস্ট মাসে জোট সরকারের সময় নিম্নমানের ভারতীয় গম এনে বগুড়ার খাদ্য গুদামে জমা করে লালুর এক সহযোগী এবং সমপ্রতি উদঘাটিত মসুর ডাল মজুদদারির অন্যতম নায়ক পরিমল সিং। সেসময় লালু বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে চিঠি দিয়ে তার সহযোগী চেলোপাড়া এলাকার ওই পরিমল কুমার সিং-এর এই নিম্নানের পোকাযুক্ত গম কেনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময় সারাদেশে গম কেলেঙ্কারির বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় । এই গম কেলেঙ্কারির তদনত্দে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব ইয়াকুব আলীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের তদনত্দ কমিটির রিপোর্ট সাংসদ লালু ও খাদ্য বিভাগের ১০ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এজন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০২ সালের ২২ অক্টোবর লালুকে তার কার্যালয়ে ডেকে এনে গম সংগ্রহে অনিয়মের জন্য তার কাছে ব্যাখ্যা চান এবং তিরস্কার করেন। এরপর থেকে বগুড়ার লোকজনের কাছে তিনি ‘গম লালু’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
বগুড়ায় বিগত ৫ বছরে উন্নয়নমূলক কাজের যতো টেন্ডার হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক সাংসদ লালু। বগুড়ায় হাওয়া ভবন বলে পরিচিত চমপা মহলে তারেক রহমান এসে থাকতেন বলে তিনি কোনো কিছুই তোয়াক্কা করতেন না। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর লালু শুধু তার নির্বাচনী এলাকা বগুড়ার গাবতলীই নয় সারা জেলার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিগত ২০০৩ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক সাংসদ লালুর বাসভবন চমপা মহলে এলজিইডি’র ১৪ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগ বাটোয়ারার সময় হইচই করাকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের হাতে ধরা পড়েন দলের শীর্ষ জেলা নেতারা। এই ঘটনায় দল থেকে বেশ কয়েকজনকে বহিষ্কার এবং তৎকালীন জেলা সমপাদককে (বর্তমান জেলা সভাপতি) তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন\’ লালুর বাড়িতে এই ভাগাভাগির ঘটনা ঘটলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া প্রায় ২০০ বিঘা জলাশয় ও বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পত্তি জবরদখল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া তার নির্বাচনী এলাকা গাবতলীতে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির গম-চালের নির্দিষ্ট অংশ না দিলে কোনো কাজ হতো না। এমনকি মসজিদ-ঈদগাহ’র উন্নয়নে বরাদ্দকৃত গম থেকেও তাকে তার নির্ধারিত অংশ দিতে হয়েছে। হাজারো অভিযোগ তার বিরুদ্ধে থাকলেও কেউ টুঁ শব্দটি করতো না শুধু একটিই কারণে, তাহলো তারেক রহমানের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য। তাই তিনি যা মনে করতেন, স্বেচ্ছাচারের মতো তা করতেন। বাধা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। বরং ভয়ে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাসহ অনেকেই তার এ অন্যায় কাজে সহযোগিতা করতেন।
সূত্রঃ http://bhorerkagoj.net/online/news.php?id=43218&sys=1

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: