হেন কুকর্ম নেই যা তিনি করেননি

ঢাকা-৪ ডেমরা-শ্যামপুর আসনের সাবেক বিএনপি সাংসদ সালাউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা ৪০টি অভিযোগের  তদনত্ম ও বিচার দাবি করেছে এলাকাবাসী। ডেমরা-শ্যামপুর এলাকার অপরাপর জনপ্রতিনিধিরাও চান সালাউদ্দিনের উপযুক্ত শাসিত্ম হোক। সেই সঙ্গে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন নিজ দলে তার প্রবল প্রতিপক্ষ, খোদ ডেমরা বিএনপির সভাপতি নবী উল্লাহ নবী। ‘আমরা ডেমরা-শ্যামপুর-যাত্রাবাড়ীবাসী’র নামে প্রচারপত্র-দেয়াল লিখনেও তার বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। এদিকে ‘ডেমরার গডফাদার’ নামে পরিচিত সালাউদ্দিনের আত্মসমর্পণে ডেমরা-শ্যামপুর-যাত্রাবাড়ি এলাকায় মানুষের মনে স্বসিত্ম ফিরে এসেছে। প্রতিদিনই এলাকায় চলছে মিষ্টি বিতরণ। সালাউদ্দিনের নিজ দলের লোকজনও তার আটক হওয়ায় খুশি। ‘আমরা ডেমরা-শ্যামপুর-যাত্রাবাড়ীবাসী’র পক্ষে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর ১১ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা অভিযোগগুলোর মধ্যে প্রথম অভিযোগে রয়েছে ৭টি অংশ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্যামপুর-ডেমরা এলাকার ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাবেক সভাপতি হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাৎ। এছাড়া ধনিয়া হাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে তার ব্যক্তিগত সহকারী রফিক ও শিক্ষক একরামুল হক লিটনের নেতৃত্বে কর্মচারী ও ছাত্র ভর্তির নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ। যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের পাশে ভবন নির্মাণের নাম করে স্কুল ফান্ডের ৩০ লাখ টাকা দিয়ে ১৪/৫ উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ীতে বাড়ি নির্মাণ। ধনিয়া হাইস্কুল এন্ড কলেজের ফান্ড থেকে ১৮ লাখ টাকা নিয়ে কালো রঙের ২টি ভিসতা গাড়ি ক্রয়। এর একটি ব্যবহার করে তার ছেলে রাসেল। গাড়ির নম্বর ঢাকা-১৪-৭৩০৬। এছাড়া স্কুলের পাশে থাকা সরকারি খাসজমি স্কুলের টাকায় কিনে পরে তা বিক্রি করেন সালাউদ্দিন। জমি বিক্রির কয়েক কোটি টাকা স্কুল শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম ভুঁইয়াসহ ভাগাভাগি করে নেন। এ ছাড়া শহীদ জিয়া স্কুলের সাইনবোর্ড এবং বিলবোর্ডের নামে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত সাহায্য আত্মসাৎ করে ২০ কোটি টাকা আয়।
এছাড়া নিজ মালিকানায় প্রকাশিত ‘দেশ জনতা’ পত্রিকার নামে সরকারি বরাদ্দকৃত কাগজ কালোবাজারে বিক্রি করে ১০ বছরে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন সালাউদ্দিন। আরো রয়েছে শ্যামপুর ওয়াসার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের পানিতে অবৈধভাবে মাছ চাষ করে ২ কোটি টাকা আয়, মাতুয়াইল শিশু মাতৃসদন হাসপাতালের টেন্ডার ২০% কমিশনের মাধ্যমে অনুগত লোকদের দেওয়া এবং অবৈধভাবে ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ডিএনডি বাঁধ সংস্কারের নামে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, নির্বাচনী এলাকায় ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে সমজিদ-মন্দিরের নামে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ গায়েব, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে এলাকাবাসীর জন্য বরাদ্দ আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, ঢাকা-৪ আসনের বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বরদের অধীনে এলাকার উন্নয়নের জন্য চাল, গম ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে নেওয়া, কাবিখা ও এনজিওর টাকা, মাতুয়াইল-ধামড়িপাড়া রাসত্মা উন্নয়নের ৩১ লাখ টাকা, কবরস্থান ভরাটের ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। সরকারি টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে। নির্বাচনী এলাকার ছোট-বড়ো প্রায় ৫০০ শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ বছরে ৩০ কোটি টাকা এবং পাগলার মুন্সিখোলা ও শ্যামপুরের বিভিন্ন ইটভাটা, বালি-সিমেন্ট ও রডের গদিসহ সেনাকল্যাণ ঘাট বাসস্ট্যান্ড থেকে ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। বাংলাদেশ কোঅপারেটিভ ইনস্যুরেন্সসহ আরো কয়েকটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যনত্ম সংসদে আধিপত্য বিসত্মারের মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং মোহাম্মদি হাউজিং লিমিটেড কোম্পানিসহ বহু নিরীহ মানুষের জায়গা দখল। এ ছাড়াও রয়েছে হাউজিং কোম্পানির পক্ষে জায়গা দখল করে দিয়ে বিগত ৫ বছরে ১০ কোটি টাকা আয়ের অভিযোগ। রয়েছে কুখ্যাত খুনি, সন্ত্রাসী, চোরাচালানকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের পালন এবং তাদের থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ। সারুলিয়া গরুর হাট থেকে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা, সালাউদ্দিনের ছেলে রাসেলের ঢাকা জেলা পরিষদ থেকে টেন্ডারবাজির মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা আয়। এছাড়াও রয়েছে ধনিয়া এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী জুম্মনসহ অপরাধীদের আশ্রয়ের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ। ডেমরা-শ্যামপুর এলাকায় ভূমিগ্রাসী হিসেবে সালাউদ্দিন ব্যাপকভাবে কুখ্যাত। তার পছন্দের জমি যে কোনো উপায়ে দখল করেছেন তিনি। অনুগত ক্যাডারদের দিয়ে সালাউদ্দিন এলাকায় দখলের রাজত্ব কায়েম করেন। থাকতে চেয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে-ই প্রতিবাদ করেছে তাকেই শিকার হতে হয়েছে সালাউদ্দিনের পৈশাচিকতার। দেওয়া হয়েছে হত্যার হুমকি। বিভিন্নভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে মামলায়। গত বছরের ৫মে এলাকাবাসী তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ধাওয়া দেয়। এর পর থেকে ধস নামে তার রাজত্বে। ফাঁস হয়ে যায় সালাউদ্দিনের নানা কুকীর্তির কথা। প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে নির্যাতিত এলাকাবাসী। দুদকে দায়েরকৃত অভিযোগে সালাউদ্দিনের সন্ত্রাস, ভূমিগ্রাস ও অবৈধ আয়ের চিত্র ফুটে ওঠে।
সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে আরো রয়েছে রাজধানীর ৭৪, মতিঝিলে দেশ জনতা পত্রিকার নামে জমি দখল, কাজলায় জমি দখল করে এস আহম্মেদ ফাউন্ডেশন নির্মাণ (জমিটির দাগ নম্বর- ৩২৩-৩২৪), গুলশান ১-এর ১৬/এ নম্বর রোডের ১/এ নম্বর ২২ তলা বাড়ি (যা ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়), মাতুয়াইলের বড়ো কাটারায় ২০৫৮ নং দাগের ২০ কাঠা জমি জোরপূর্বক নামমাত্র মূল্যে দখল, শনির আখড়ায় ৪০৭ নম্বর দাগের ৫ কাঠা জমি অবৈধ ক্রয়ের মাধ্যমে মার্কেট নির্মাণ, জুরাইনে মাজার দখল করে পাম্প নির্মাণ, বুড়িগঙ্গার পাড়ে খাসজমিতে নিজের বাড়ি তৈরি, পাগলার মুন্সিখোলায় ২টি সিএনজি স্টেশন স্থাপন, জুরাইনের ঋষিপাড়ায় মন্দিরের জায়গা দখল, যাত্রাবাড়ীর টামপাড়ায় ১ বিঘা জমি দখল, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে উড সাইড কুইন্স স্ট্রিটে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ভবন নির্মাণ, মদিনায় বাদশাহ কিং আবদুল আজিজ বিন ফাহাদ-এ ১০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি ক্রয়। এ ছাড়া বিগত ১০ বছরে সালাউদ্দিন বিদেশে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার এবং বেনামে আরো প্রায় ১৩০ কোটি টাকার সম্পত্তি কিনেছেন বলে অভিযোগে প্রকাশ। ‘আমরা ডেমরা-শ্যামপুর-যাত্রাবাড়ীবাসী’র পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের আহ্বায়ক মোসত্মাক আহমেদ। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি- অবিলম্বে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদনত্ম হোক। সংগঠনের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াসহ তদনেত্মর মাধ্যমে অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও দাবি জানানো হয়েছে।
ডেমরা থানা বিএনপির সভাপতি নবী উল্লাহ নবী এ ব্যাপারে বলেন, দুর্নীতিবাজ সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে আমি ১০ বছর যাবৎ আন্দোলন করছি। দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে অনেকবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি। কিন’ কোনো কাজ হয়নি। আমি মনে করি সালাউদ্দিনের সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে এলাকায় দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হয়। দল থেকে তাকে আগেই বহিষ্কার করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ৯১ থেকে এ পর্যনত্ম সালাউদ্দিন অবৈধভাবে ১ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। আমার দাবি থাকবে অবৈধ উপায়ে অর্জিত তার সকল অর্থ-সম্পদ যেন সরকার বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে এবং রাষ্ট্রীয় খাতে যেন নিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান নবী উল্লাহ নবী।
ডেমরা এলাকার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আমীর হোসেন বলেন, সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ঘটনাই সত্য। এলাকার সাধারণ মানুষের মতো আমারও দাবি থাকবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগের সুষ্ঠু তদনত্ম হোক এবং বিচার হোক। এ কথা সত্য, সে অবৈধ পন্থায় অর্থ আত্মসাৎ করেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।
৮৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার মোবারক হোসেন বলেন, দেশে বহু মন্ত্রী-এমপি ছিলেন, সালাউদ্দিনের মতো নিকৃষ্ট মনের কেউ আছে বলে আমার জানা নেই। হেন অপকর্ম নেই, যা তার দ্বারা হয়নি। সালাউদ্দিন আমার জায়গা পর্যনত্ম দখল করেছে। সে কোনো মানুষের কাতারেই পড়ে না। সে ভালো লোক নয়। একজন সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ হিসেবে সালাউদ্দিনের বদনাম ডেমরা-শ্যামপুর এলাকার অলিগলিতে, মানুষের মুখে মুখে। আমার দাবি তার চূড়ানত্ম শাসিত্ম হোক।
৮৫ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার বাদল সরদার বলেন, সালাউদ্দিন আহমদ এলাকায় একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। আমার দাবি, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদনত্ম হোক। তবে এ কথাও সত্যি যে, এখন অনেক ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-02-15

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: