দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের দায়িত্ব নেবে না বিএনপি ও আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের দায় নিতে রাজি নয়। আওয়ামী লীগ তাদের যেসব নেতাকর্মীর নামে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিরুদ্ধে শাসি-মূলক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে- লুটেরা, দুর্নীতিবাজ ও রিলিফের মালামাল আত্মসাৎকারীদের দায় পার্টি কেন বহন করবে? আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড অপেক্ষা করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার প্রশ্নে সরকার বা নির্বাচন কমিশন কি পদক্ষেপ বা প্রস্তাব দেয় তা দেখার জন্য। আর বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। আগামী মাসে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা ডাকা হলে এ নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে।
দু’দলেরই নেতাকর্মীরা মনে করেন, যারা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, যাদের বাড়িতে রিলিফের মাল পাওয়া যাচ্ছে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হোক, ছিন্ন করা হোক দলীয় সম্পর্ক। মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া এ বিউটেনিস গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

এর পর থেকে দু’দলের অভ্যন্তরে দলীয় সংস্কারের কথা জোরেশোরে চলছে। দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, গডফাদার ও কালো টাকামুক্ত রাজনীতির পক্ষে প্রবল জনমত গড়ে ওঠায় এবং এসব অভিশাপমুক্ত একটি নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদক্ষেপ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে শক্ত ঝাঁকুনি দিয়েছে। বিএনপি জোট সরকারের বিগত পাঁচ বছরের শাসনামলে মন্ত্রী-এমপি, নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠজনরা স্মরণকালের নজিরবিহীন লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত। অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন, অনেকে গাঢাকা দিয়েছেন। বিএনপি হাইকমান্ডসহ সকল স-রে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। আওয়ামী লীগ শাসনামলেও অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হয়েছেন, কেউবা জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর আত্মগোপনে চলে গেছেন। এ অবস্থায় প্রধান দু’দলের মধ্যেই শুদ্ধি অভিযান বা সংস্কারের দাবি উঠেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যৌথ বাহিনীর অভিযানের শিকার দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করলেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন- কার কত সম্পদ হয়েছে তার হিসাব নেয়া হোক।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বলেছেন, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, গডফাদাররা দেশের শত্রু। তাদের দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য সব মহলেই প্রশংসিত হয়েছে। সব মহল থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমকে সমর্থন জানানো হচ্ছে। সূত্র জানায়, পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমেই রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার কাজ শুরু হবে।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল রাজনৈতিক দলের সংস্কার প্রশ্নে যুগান-রকে বলেন, তাদের ৩১ দফা প্রস-াবেই দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, কালো টাকামুক্ত নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদক্ষেপকে তারা স্বাগত জানান। আইনে দলের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আওয়ামী লীগ তাদের বিরুদ্ধে শাসি-মূলক ব্যবস্থা নেবে। আওয়ামী লীগ দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীর দায় বহন করবে না। কারণ দল কোন ব্যক্তির জন্য নয়, আদর্শের জন্য। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি কোন ব্যক্তির জন্য নয়। দলের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে বিএনপি তা বহন করবে না। আইনের পাশাপাশি দলগতভাবেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত কি ধরনের সংস্কার চায় তার সুনির্দিষ্ট প্রস-াব দেয়নি। তবে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের স্বার্থে অর্থবহ নির্বাচনের জন্য সংস্কারে রাজি। এমনকি সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দায়ে দলের কেউ অভিযুক্ত হলে তার দায় আওয়ামী লীগ বহন করবে না। তারা চান নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার করুক। সংলাপ উন্মুক্ত করুক।

সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, মীর নাছির উদ্দীন, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সালাহউদ্দিন আহমদ, আমানউল্লাহ আমান, মোসাদ্দেক আলী ফালুসহ সাবেক কয়েকজন সাংসদ গ্রেফতার হয়ে জেলে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানও গ্রেফতার হয়ে জেলে আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনও আটক হয়েছেন। রিলিফের ঢেউটিনসহ খাদ্য সামগ্রী পাওয়া গেছে বিএনপির সাবেক সাংসদ মোসাদ্দেক আলী ফালু, হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, শহীদুল ইসলাম মাস্টার, শাহ আবু জাফর, শফি আহমেদ চৌধুরী ও হারুনুর রশিদের বাড়িতে। বিএনপির শাসনামল থেকে এ পর্যন- প্রতিদিন মিডিয়ায় বিএনপির অসংখ্য দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-এমপি ও নেতার নাম এসেছে, এসেছে সন্ত্রাসী মুখ। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলাবলি করছেন, যাদের বাড়িতে রিলিফের মাল পাওয়া গেছে, দুর্নীতি করে যারা সম্পদ গড়েছেন তাদের দায় বিএনপি কেন বহন করবে? আওয়ামী লীগের আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শামীম ওসমান, ডা. এইচবিএম ইকবাল, হাজী সেলিমসহ দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে অনেকেই পলাতক রয়েছেন। পার্টির অভ্যন-রে কথা উঠেছে, রাজনৈতিক কারণ-বহির্ভূত অভিযোগে যাদের পালিয়ে বেড়াতে হয়, তাদের দায় পার্টি বহন করবে কেন? ঋণখেলাপি, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ও রাতারাতি ব্যবসায়ী-আমলাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা না দেয়ার জন্য দাবি উঠবে আগামীতে বর্ধিত সভায়। আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও যৌথ বাহিনীর অভিযানকে এ কারণেই স্বাগত জানিয়েছে, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগের পাহাড় যেখানে বিএনপির ওপর সেখানে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলে তাদের দলীয় লোকসান কম হবে। হাইকমান্ড মনে করে, দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের সংখ্যা বিএনপিতে যত বেশি, আওয়ামী লীগে তত কম। সংস্কারবাদীরা অবশ্য বলছেন, আমার গডফাদার ভালো অন্যের গডফাদার খারাপ- এই নীতির ওপর দাঁড়ালে রাজনৈতিক সংস্কারকে স্বাগত জানানো সম্ভব নয়। নীতিগতভাবে সবাইকে একটি পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রত্যাশা পূরণে গডফাদার, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-20

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: