এত দুর্নীতি! বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও হতবাক

সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির ব্যাপকতা দেখে স্তম্ভিত বিএনপি হাইকমান্ড। এত দুর্নীতি! বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও হতবাক। দুর্নীতির এমন ভয়াবহতা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির ব্যাপকতায় বিস্মিত হন দলের হাইকমান্ড। রিলিফের টিন, বিস্কুট, চাল-ডাল, কাপড় চুরির ঘটনায় দলের সৎ ও আদর্শবান নেতাকর্মীরাও রীতিমতো হতবাক। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা অবিলম্বে দুর্নীতিবাজদের দল থেকে বহিষ্কারের মাধ্যমে শুদ্ধি অভিযান চালানোর দাবি তুলছেন।
এ পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বিএনপি হাইকমান্ড সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার চিন-াভাবনা করছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোন ঘোষণা দেননি তারা। দলের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান যুগান-রকে বলেছেন, কারও দুর্নীতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে তার দায়-দায়িত্ব বিএনপি নেবে না। তবে সবার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ সঠিক নাও হতে পারে।
প্রথমদিকে দলের সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেফতারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপি হাইকমান্ড। চলমান গ্রেফতার অভিযানকে তারা রাজনৈতিক হয়রানি বলে আখ্যায়িত করেন। এমনকি গ্রেফতারকৃত নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া দলের আর কোন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার বা হয়রানি না করার আহ্বান জানান। যৌথ বাহিনী গত কয়েকদিন সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সাবেক সাংসদ মোসাদ্দেক আলী ফালুর ফ্যাক্টরির শ্রমিক বাসস্থানে থেকে ত্রাণসামগ্রীর টিন উদ্ধার করে। ফরিদপুরের সাবেক সাংসদ শাহ মোহাম্মদ আবু জাফরের বসতবাড়ির চাল থেকে ত্রাণের টিন খুলে আনা হয়েছে। সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নাটোরের বাড়ি থেকেও ত্রাণের টিন উদ্ধার করা হয়। এমনকি সিলেটের সাবেক সাংসদ দিলদার হোসেন সেলিমের পুকুর থেকে লুকিয়ে রাখা দুস্থদের টিন উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। যৌথ বাহিনী ঝিনাইদহের সাবেক সাংসদ শহিদুল ইসলামের বাড়ির আঙ্গিনার মাটির নিচ থেকেও চুরি করা টিনসহ ত্রাণসামগ্রী উদ্ধার করে। এভাবে সারাদেশে প্রায় প্রতিদিন সাবেক মন্ত্রী-এমপির কব্জা থেকে চুরির ত্রাণসামগ্রী উদ্ধার হচ্ছে। দলের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের এমন গর্হিত অপরাধ দেখে দলের হাইকমান্ড রীতিমতো হতভম্ব বনে গেছেন।
এতদিন দলের মন্ত্রী-এমপিরা দুর্নীতি করেননি বলে দাবি করলেও এখন আর করছেন না। এমনকি দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া দলের গ্রেফতারকৃত নেতাদের মুক্তি দাবি করলেও গত একুশে ফেব্রুয়ারির আলোচনা সভায় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কৌশলে প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দলের আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতাও মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে অভিন্ন সুরে বলেন, এখন আত্মোপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির সময় এসেছে। তারা দলের নেতাকর্মীদের শহীদ জিয়াউর রহমানের সৎ ও আদর্শকে বুকে লালন করে দলকে এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার গ্রহণের আহ্বান জানান। এই কৌশলী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলের দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেন তারা।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া দলের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতি সম্পর্কে কিছু বলেননি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-এমপিরা অনেক সময় তাদের দুর্নীতির খবর প্রধানমন্ত্রী পর্যন- পৌঁছতে দিতেন না।
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি হাইকমান্ড এতদিন অনেকটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন। দলের সর্বশেষ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় কয়েকজন সদস্য দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ দল পরিচালনায় নতুন কৌশল গ্রহণের প্রস-াব করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আগের সব হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণের কথা বলেন তারা। তবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাতে সাড়া দেননি। বেগম জিয়া ধীরে চলার নীতি গ্রহণ করতে বলেন তাদের। এমনকি গ্রেফতারকৃতদের আইনি সহায়তা দিয়ে নির্দোষ প্রমাণ করতে বলেন। এ প্রেক্ষাপটে হতাশ হয়ে পড়েন দলের স্থায়ী কমিটির ওই সদস্যরা।
দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান-রকে বলেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তখনও মনে করতেন মন্ত্রী-এমপিরা নির্দোষ। তারা তেমন কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেননি। তাই তিনি কয়েকজনের নাম ধরেও বলেছেন, ‘অমুক’কে সেভ করতে হবে। শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এভাবে দুর্নীতিবাজদের সম্পর্কে ধারণা পোষণ করা হয়েছে। এখন মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ি-ঘর, পুকুর-আঙ্গিনা থেকে ত্রাণসামগ্রী উদ্ধারের পর দেরিতে হলেও কিছুটা বোধোদয় হয়েছে। এখন নতুন চিন-াভাবনা শুরু হয়েছে।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের কয়েক নেতা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এতদিন তার বক্তব্য-বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ‘কম্বল চোর’ বলে আখ্যায়িত করতেন। এখন তিনি কি বলবেন? তার দলের নেতারা টিন চুরির মাধ্যমে কম্বল চোরদেরও হার মানিয়েছেন। এই দুর্নাম তিনি কিভাবে ঘুচাবেন?
সাবেক যেসব মন্ত্রী-এমপি দুর্নীতির দায়ে আদালতে অভিযুক্ত হবেন, বিএনপি হাইকমান্ড তাদের কোন দায়-দায়িত্ব বহন করবে না। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার চিন-াভাবনা শুরু করা হচ্ছে। তাছাড়া দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে যেসব এলাকায় সাবেক মন্ত্রী ও এমপি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, সেসব এলাকায় বিকল্প নেতা কে আছেন তার খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-24

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: