দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই : প্রধান উপদেষ্টা

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রের সব স্তরে এবং সমাজের সর্বত্র সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে দুর্নীতি ও নীতিহীনতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কোন বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি সুশাসন ও নৈতিকতার সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে নিজেদের আত্মশুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে এগুনোর জন্য ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
শনিবার সকালে রাজধানীর নিকুঞ্জে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নতুন ভবন ‘ডিএসই টাওয়ারের’ ভিত্তিপ্রস-র স্থাপন অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। ডিএসই’র সভাপতি আবদুল্লাহ বোখারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ, বাণিজ্য এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানে ডিএসই’র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমদ রশীদ লালী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমদ খান বক্তব্য রাখেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অতীতের অনিয়ম ও অনিশ্চয়তা পুঁজিবাজারের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস- করেছিল। অন্যান্য খাতের মতো এ খাতের দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, অদক্ষতাও এর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। বর্তমান সরকার দেশের সব খাতে, বিশেষ করে আর্থিক খাতে শৃংখলা ও জবাবদিহিতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে সুশাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল-প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি এবং জাতির অনাগত ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল ও টেকসই আর্থ-সামাজিক কাঠামো বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে এ কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, জিডিপি বিবেচনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার প্রতিবেশী ভারত, পাকিস-ান এবং শ্রীলংকার চেয়ে অনেক ছোট। এর মূল কারণ ব্যাংকিং খাতের ওপর দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতভিত্তিক অর্থায়নের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপের ফলে অন্যান্য খাতভিত্তিক অর্থায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তিনি দেশের পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগ অর্থায়নে আরও বলিষ্ঠ ও সম্প্রসারিত ভূমিকা
পালনের আহ্বান জানান।
ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বলেন, পুঁজিবাজারের বিকাশ ঘটাতে হলে এর কার্যক্রমে সর্বোচ্চ মাত্রায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বজায় রাখতে হবে। ম্যানিপুলেশনের সুযোগ দূর করতে হবে। পুঁজিবাজারের অপারেটর এবং নিয়ন্ত্রকদেরকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে। তিনি একটি স্বনিয়ন্ত্রিত সংস্থা হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে লিস্টিং ও অন্যান্য বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় তৎপর থাকার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ দেন, যাতে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ তহবিলের বিকল্প যোগানদাতা হিসেবে শেয়ার বাজারকে দক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের দ্রুত বিকাশের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে। এতে করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ী ও বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলের প্রত্যক্ষ অংশীদার হতে পারবে। তিনি দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রায় স্টক এক্সচেঞ্জের গুরুত্ব সম্পর্কে সর্বদা সজাগ ও সচেতন থাকার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান দাবি পূরণ এবং পুঁজিবাজারের বিকাশের সহায়তায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি অর্থনীতির চাকা সকল রাখতে এবং উন্নয়নের ধারা তরান্বিত করতে সময়োচিত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বলেন, ব্যক্তিখাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে করপোরেট গভর্ন্যান্সের কোন বিকল্প নেই। স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত কোম্পানি এবং তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। কোম্পানিগুলো যাতে তাদের হিসাব বিবরণীতে আন-র্জাতিক ও দেশীয়ভাবে স্বীকৃত অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিনিয়োগকারী ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় কোম্পানি আইনও যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তথ্য সরবরাহ অবাধ না হলে বাজার কারও কারও কুক্ষিগত হয়ে যেতে পারে। বাজারের বড় বিনিয়োগকারী, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে তথ্য প্রাপ্তিতে বেশ অসমতা আছে বলে তিনি মন-ব্য করেন। তিনি তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ে যত্নবান থাকার জন্য ডিএসই কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেন। এগুলো হচ্ছে- সময়মতো তথ্য সরবরাহ করা, স্বল্প খরচে তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং তথ্য পরিবেশনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা বাজার পরিচালনায় ন্যূনতম নৈতিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাজার সংশ্লিষ্টরা লাগামহীন মুনাফা অর্জন অথবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস- হয়ে পড়লে বাজার কখনও স্থিতিশীল হতে পারে না।
ডিএসই সভাপতি আবদুল্লাহ বোখারী বলেন, সম্প্রতি স্টক এক্সচেঞ্জে যে দৈনিক শত কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হচ্ছে তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সরকারের সংস্কারমূলক কর্মসূচির প্রভাবেই এটি হচ্ছে। তিনি একটি ঋণ বাজার প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে বলেন, এটি হলে তারল্য প্রবাহ অনেক বাড়বে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে চলে আসবে। ফলে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যে গতি বাড়বে। পরে প্রধান উপদেষ্টা ডিএসই টাওয়ারের ফলক উন্মোচন করেন। এক দশমিক ৩৩ একর জমিতে ১৪ তলাবিশিষ্ট এই টাওয়ার ডিএসই’র নিজস্ব অর্থে তিন বছরের মধ্যে নির্মিত হবে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-25

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: