অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার

বাঁচাও! বাঁচাও!! আর্তচিৎকার আর অসহায় স্বজনদের আর্তনাদে গতকাল কাওরান বাজারের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। বেলা সাড়ে ১১টায় প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসাবে চার তলা থেকে লাফিয়ে পড়া মোকসেদা বেগমের করম্নণ মৃত্যুর দৃশ্য পুরো পরিস্থিতিকে আরো ভয়ঙ্কর ও শোকাবহ করে তোলে। আতংকে বেশ কয়েকজন লাফিয়ে পড়ে।

এদের সাতজনকে ঢাকা মেডিক্যাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানানত্মর করা হয়। আগুন লাগার পর বিএসইসি ভবনের সামনে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে। পুলিশ, বিডিআর, সেনাবাহিনীর সম্মিলিত চেষ্টাতেও জনতার ভিড় ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

দোতলায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হলে ভবনে আটকাপড়ে কয়েকশ’ মানুষ। আটকেপড়া অনেকেই সিঁড়ি ও লিফটে বের হয়ে আসে। বেলা ১১টা থেকে পুরো ভবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আগুন ক্রমশঃ উপরের তলায় ছড়িয়ে পড়ে। আটকেপড়াদের অনেকেই কাঁচের জানালা ভেঙ্গে ভবনের কার্নিশে আশ্রয় নেয়। তারা প্রচণ্ড ধোঁয়ার মধ্যে পরনের জামা-কাপড়, রম্নমালসহ নানা কিছু উড়িয়ে সাহায্যের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আতংকিত মানুষকে ধৈর্য ধারণ করতে কাওরান বাজার জামে মসজিদের মাইক থেকে পরামর্শ দেয়া হয়। বেলা ১১টায় দড়ি বেয়ে বেরিয়ে আসেন ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের প্রকৌশলী বেলাল উদ্দিনসহ পাঁচজন। তিনি বলেন, পুরো ভবন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, কিছুই দেখা যায় না।

তিনি অসংখ্য নারী ও পুরম্নষ কণ্ঠের চিৎকার শুনেছেন। বেলা ১১টার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধারের কাজ শুরম্ন করে। ফায়ার সার্ভিসের স্নোরকেলের সাহায্যে প্রথমে এনটিভির কয়েকজন সাংবাদিক ও কর্মীকে বের করে আনে। উপস্থিত জনতা ও আটকেপড়া মানুষের স্বজনদের মধ্যে আতংক ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ধার কাজ ত্বরান্বিত করতে জনতা চিৎকার শুরম্ন করলে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা জনতার ওপর চড়াও হয়। এ সময় হাজার হাজার মানুষ পাল্টা সেনাবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতে উদ্যত হয় এবং জুতা, স্যান্ডেল ছুঁড়তে থাকে। পরে একজন সেনা কর্মকর্তা হ্যান্ডমাইকে জনতার কাছে ড়্গমা প্রার্থনা ও সাহায্যের আবেদন জানালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। দুপুর ১২টায় হেলিকপ্টারের সাহায্যে অবরম্নদ্ধ মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। ভবনের ছাদে হেলিপ্যাড না থাকায় তারা বাধাগ্রসত্ম হয়। তারা কয়েকজনকে উদ্ধার করে।

সকাল থেকে আরটিভির কর্মী আবদুস সালাম অপেড়্গা করছিলেন সাহায্যের জন্য। সোয়া ১২টায় তাকে কার্ণিশ থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করে। সাড়ে ১২টায় ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের অফিসে দ্বিতীয় দফা আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আতংকিত আটকেপড়া মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকে। নিরূপায় হয়ে দুই শতাধিক নারী-পুরম্নষ-শিশু ভবনের ছাদে আশ্রয় নেয়। শাড়ি পরার কারণে অনেক মহিলাই ফায়ার সার্ভিসের সাহায্য নিয়ে নামতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। আরটিভি এবং আমার দেশ পত্রিকার অনেকেই আটকা পড়েন। দীর্ঘ একঘণ্টা প্রচেষ্টার পর ১২-৪৮ মিনিটে ড্যান্ডি ডাইংয়ের সাব্বির ও মাহমুদ নামে দুই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করা হয়।

এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমানসহ ৭ জন লিফটে আটকা পড়েন। পৌনে ১টায় সেনা সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আেেস। একটার পর ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তা মনির হোসেনসহ উদ্ধার করে আরো চারজনকে। মনির হোসেন জানান, তাদের এমডিসহ আরো ৭/৮ জন ভবনের ভিতরে আটকা পড়েছেন। একই সময় শামীম আরা নামে আরেক মহিলাকে উদ্ধার করা হয়। তাকে উদ্ধারের পর জ্ঞান হারিয়ে ফেললে দ্রম্নত হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। উদ্ধারকৃত এসেনশিয়াল ড্রাগের প্রকৌশলী আশরাফ আবেগ আপস্নুত কণ্ঠে বলেন,ওদের উদ্ধার করম্নন। এখনো অনেক মহিলা-পুরম্নষ প্রতিটি ফ্লোরে আটকা পড়ে আছে। দেড়টায় সেনা সদস্যরা ভবনের ভিতর থেকে শামসুল হক নামের এক বৃদ্ধসহ ২ জনকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে সিএমএইচ হাসপাতালে প্রেরণ করে। শামসুল হক ইসলামী ফারইস্ট কোম্পানিতে কর্মরত পুত্র মাহমুদ হাসানের কাছে এসেছিলেন।

পৌনে দুইটায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির পানি শেষ হয়ে গেলে সমবেত মানুষের মধ্যে কান্নার রোল উঠে। সেনা সদস্যরা দ্রম্নত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। দুইটায় বহু চেষ্টার পর ড্যান্ডির আরো দুই ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। আড়াইটায় ড্যান্ডির এমডিসহ উদ্ধার করা হয় দুই কর্মকর্তাকে। উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে ফায়ার ব্রিগেডের উপ-পরিচালক নেওয়াজ ভুঁইয়া আহত হয়। তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে।

স্বজনের খোঁজে অনেকেই ভিড় জমান কাওরানবাজার এলাকায়। কঠোর পুলিশী বেষ্টনী পার হতে না পেরে সেখানেই বসে পড়েন তারা। স্বজনদের আহাজারি ছুঁয়ে যায় প্রতিটি মানুষের হৃদয়। ভবনের কোন ফাঁকে কাউকে দেখামাত্র জনতার উচ্ছ্বাস, উদ্ধার না করার ব্যর্থতায় পরড়্গণেই তাদের মাঝে নেমে এসেছিল বিষাদের ছায়া। Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-02-27

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: