শ্বাসরুদ্ধকর ৫ ঘণ্টা

দাউ দাউ জ্বলছে বিএসইসি ভবন। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। ভেতরে শত শত মানুষের আর্তচিৎকার, আর বাইরে উদ্বেগাকুল হাজার হাজার মানুষ। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা- ৫ ঘণ্টাব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল কারওয়ান বাজারের এই ভবনটিকে ঘিরে। ভবনের ভেতরে আটকেপড়াদের উদ্ধার অভিযান ছিল আরও শ্বাসরুদ্ধকর। সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, দমকলসহ ১২টি বাহিনী ও সংস্থার সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।
সকাল সোয়া ১০টার দিকে ভবনটির দোতলায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এর কিছু পরই ছুটে আসেন উদ্ধারকারীরা। চারদিকে জমে যায় হাজার হাজার মানুষের ভিড়। তখন ভেতরে কেবল বাঁচার জন্য আহাজারি। কান্না। আটকেপড়াদের অনেকেই ১১ তলা সুউচ্চ ভবনটির ছাদে উঠে যান। আগুন ছড়িয়ে পড়ে একতলা একতলা করে ভবনটির একেবারে ওপরের তলা পর্যন-। সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছেন আটকেপড়াদের রক্ষায়। মানুষ মানুষের জন্য এগিয়ে এসেছেন। সবাই যেন হয়ে উঠেছেন একেকজন উদ্ধারকর্মী। আগুনে ঝাঁপ দিয়েও অসহায় মানুষকে মানুষ উদ্ধার করেছেন। দড়ি, মই, হেলিকপ্টারের সিঁড়ি। আল্লাহ ওদের রক্ষা করো- কারওয়ান বাজার মসজিদে শুরু হয় মোনাজাত। একের পর এক মানুষ যেমন উদ্ধার পেয়েছেন, তেমনি মুহূর্তে মুহূর্তে আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয় তা যেন মৃত্যুতুল্য। যারা উদ্ধার পেয়েছেন তারা ফিরে পেয়েছেন দ্বিতীয় জীবন। মিনিটে মিনিটে বদলেছে পরিস্থিতি। মানুষ তখন রাস-ায় দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে কেঁদেছেন অগ্নিকবলিতদের জন্য। মৃত্যুর হাত থেকে একটি প্রাণকে বাঁচানোর যে কতটা আনন্দ তা দেখা গেছে গতকাল কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন আটকেপড়া কাউকে ছাদের কার্নিশ থেকে মই বা রশির মাধ্যমে উদ্ধার করছিলেন তখন চারদিক থেকে হুররে ধ্বনি আর করতালির মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এ দৃশ্য দেখে ভয়াবহতার মাঝেও অনেকের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে আনন্দাশ্রু। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে কারওয়ান বাজারের শত শত ব্যবসায়ী ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। মসজিদ প্রাঙ্গণে এতিম শিশুরাও হাত তুলে আল্লাহর কাছে ভবনে আটকেপড়া মানুষের প্রাণভিক্ষা চায়। এই প্রথম কোন দুর্ঘটনায় সশস্ত্র বাহিনীসহ ১২টি বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের একযোগে উদ্ধার অভিযান চালাতে দেখা যায়। সবারই ছিল প্রাণপণ চেষ্টা। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, বিডিআর, আনসার, রেডক্রিসেন্ট, রোভার স্কাউট, স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিভিন্ন সংস্থার কয়েক হাজার সদস্য ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধার কাজে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশন থেকে ২৫টি ইউনিটের প্রায় ১ হাজার সদস্য উদ্ধার কাজে অংশ নেন। ফায়ার সার্ভিসের রিজার্ভ পানি শেষ হয়ে গেলে আশপাশের ভবনের রিজার্ভ পানির ট্যাংক থেকে পানি আনা হয়। সোনারগাঁও হোটেল তাদের রিজার্ভ পানি দিয়ে সহায়তা করে। ঢাকা ওয়াসা তাদের গাড়িতে পানি সরবরাহ করে।
বহুতল এই ভবনটিতে যখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল তখন বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজনরা ভেতরে আটকেপড়াদের কাছে মোবাইল ফোন করে অবস্থা জানতে চান। অনেকেই চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে থাকেন। ভবনের দক্ষিণপাশে টেবিল টার্ন লেডার দিয়ে প্রথমে উদ্ধার কাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে পুলিশ, র‌্যাব, বিডিআর, ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজ শুরু করে। হাজার মানুষের ঢল নামে। তারাও উদ্ধার কাজ শুরু করেন। ভবনের ৬ তলা থেকে ক্যাবল লাইনের তার ধরে ২-৩ জন নামে। ১০ তলা ও ১১ তলা থেকে আটকেপড়া অনেকেই তাদের পরনের কাপড় উড়িয়ে দিয়ে উদ্ধারের আবেদন জানান। কিন’ নিচ থেকে করার কিছুই ছিল না। আরটিভির একজন কর্মী ক্যাবল লাইনের তার ধরে ঝুলে নিচে নামার চেষ্টা করেন। কিন’ হাত ফসকে তিনি নিচে তিনজন উদ্ধার কর্মীর ওপর পড়ে যান। এতে একজন উদ্ধারকর্মী অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অপর জনের বাম পা ভেঙে যায়। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ভবনের পেছনে ৬ তলার বারান্দায় এক মহিলা চিৎকার করে আর্তনাদ করছেন তাকে বাঁচানোর জন্য। উদ্ধার কর্মীরা তাকে ভবনের দক্ষিণ পাশের বারান্দায় যেতে বলেন। সেখান থেকে ক্যাবলের তারে ঝুলে তিনি নিচে নেমে আসেন।
ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আশপাশের লোকজনও উদ্ধার কাজে এগিয়ে আসেন। বিশেষ করে আরটিভি ও এনটিভির কর্মীরা ভবনের নিচে উদ্ধার কাজে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। বেলা ১টার দিকে ভবনের সিঁড়ি দিয়ে চারতলা থেকে নেমে আসেন বিএসইসির অ্যাকাউন্ট অফিসার নূরুল হক। বের হয়েই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। চিৎকার করে আল্লাহর কাছে শোকরানা আদায় করেন। তিনি জানান, যখন বুঝতে পেরেছেন বাঁচার কোন আশা নেই তাই সিঁড়ি ধরে দৌড় দেন। কখন নিচে নেমেছেন তা তার মনে নেই। মনে হল নতুন জীবন তিনি ফিরে পেলেন। এর একটু পরই তারই সহকর্মী ওহাব মির্জা একই কায়দায় বের হন। তিনি বিএসইসির ফিন্যান্স শাখায় কর্মরত। তিনি বের হয়েই একজনের কাছে মোবাইল ফোন চেয়ে নেন। ফোন করে স্ত্রীকে জানান, তিনি দ্বিতীয় জীবন পেয়েছেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন- একের পর এক ঘটতে থাকে এ ধরনের ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে বিএসইসি ভবনের সিকিউরিটি গার্ড আবদুর রহমান জানান, ভবনের দোতলায় আগুনের লেলিহান শিখা দেখে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। তিনি নিজে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন’ তাতে কোন লাভ হয়নি। আগুন দোতলার অফিসের কাগজ ও ফাইলপত্রে ধরে তা প্রকাণ্ড আকার ধারণ করে। তিনি ওই অফিস থেকে দুই ক্যান্টিন বয়কে উদ্ধার করেন।
বিএসইসি ভবনের ১১ তলায় এনটিভির স্টুডিওর পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুই লাইটম্যান চিৎকার করছেন, বাঁচাও, বাঁচাও। সামনের প্রতিটি কক্ষ থেকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তাদের দাঁড়িয়ে থাকার মতো নিরাপদ জায়গা সেখানে আর নেই। মাত্র দু’হাত সামনের কক্ষে আগুন জ্বলছে। তখন ভবনের ছাদে হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার কাজ চলছে। এতে আগুনের লেলিহান শিখা আরও বেড়ে যায়। এনটিভি স্টুডিওর দুই লাইটম্যান হাবিবুর রহমান ও নূরুন্নবী বাবুল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কি করবেন বুঝতেও পারছেন না। তাদের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন যেন তাদের নিমিষেই গ্রাস করবে। বিএসইসি ভবনের পেছনে ৭ তলা পল্লী ভবনের ছাদ থেকে কয়েকজন এ দৃশ্য দেখে চিৎকার করতে থাকেন। এ সময় পল্লী ভবনের টেলিফোন অপারেটর আলতাফ হোসেন ছাদে রাখা ৪টি লম্বা বাঁশ দড়ি দিয়ে জোড়া দেন। বাঁশের মাথায় একটি মোটা দড়ি বাঁধা হয়। বাঁশটি বিএসইসি ভবনের ১১ তলায় পৌঁছানো হয়। বাঁশের আগায় বাঁধা রশিটি বারান্দার পিলারের সঙ্গে বেঁধে ফেলতে বলা হয়। রশির এক প্রান- থাকে পল্লী ভবনের ছাদে। রশিটি পল্লী ভবনের অন-ত ১০-১২ জন কর্মচারী টানটান করে টেনে ধরেন। ১১ তলা থেকে হাবিবুর রহমান প্রথমে রশিটি জাপটে ধরেন। এরপর ১ ফুট করে পেছাতে থাকেন। রশি ধরে দুই ভবনের মাঝামাঝি যখন তখন তার নিজের কাছেই মনে হচ্ছিল হাত ছেড়ে দিলেই একশ’ ফুট নিচে পড়ে যাবেন। চোখ বন্ধ করে তিনি রশি ধরে পেছাতে থাকেন। পল্লী ভবনের ওপর থেকে সবাই চিৎকার করছেন আল্লাহ আল্লাহ বলে। নিচে ফায়ারম্যানরাও হতবাক- এ কিভাবে সম্ভব। মাঝপথে তার পা দড়ি থেকে ফসকে যায়। দু’হাত দিয়ে রশি ধরে ঝুলতে থাকেন। আবারও তিনি দু’পা দিয়ে দড়ি জাপটে ধরেন। শুরু হয় বাঁচার চেষ্টা। পল্লী ভবনের ছাদের কাছাকাছি আসতেই সবাই হাততালি দেন। আসে- আসে- তিনি পৌঁছে যান পল্লী ভবনের ছাদে। এর কিছু সময় পর অপর লাইটম্যান নূরুন্নবী বাবুল বাঁচার তাগিদে দড়ি ধরেন। তিনি ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে যান। প্রথম দফায় দড়ি থেকে হাত ফসকে গেলে তিনি বারান্দার কার্নিশ ধরে ঝুলে পড়েন। পরে আবারও কার্নিশ থেকে বারান্দায় ওঠেন। এরপর তিনি দড়ি ধরে উল্টোভাবে ঝুলে পেছাতে থাকেন। প্রায় ১৫ মিনিট চেষ্টা করে তিনি পৌঁছে যান পল্লী ভবনের ছাদে। নেমেই তিনি হাবিবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। তারা বেঁচে আছেন- এটা তাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাবিব জানান, আগুনের হাত থেকে বেঁচে যাবেন তা তিনি কল্পনাও করেননি। একবার মনে হয়েছিল ১১ তলার ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তিনি জানান, এনটিভির স্টুডিওতে শুভসন্ধ্যা অনুষ্ঠানের শুটিং চলছিল। ভবনের নিচে আগুন লেগেছে তা তারা জানতে পারেননি। স্টুডিওর অটোমেটিক জেনারেটরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন কিছু একটা হয়েছে। স্টুডিও থেকে সবাই বের হলেও তারা পরে বের হন। কিন’ ততক্ষণে তাদের দু’জনের বের হওয়ার কোন রাস-া ছিল না। স্টুডিওর পেছনের জানালার কাচ ভেঙে তারা বারান্দায় আসেন। এরপর শুরু হয় তাদের বাঁচার চেষ্টা।
মসজিদে মাইকিং
আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে উদ্ধার কাজে মানুষকে এগিয়ে আসার জন্য কারওয়ান বাজার মসজিদ থেকে মাইকিং করা হয়। মসজিদে শুরু হয় মোনাজাত। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। মসজিদের এতিমখানায় শিশুরা শুরু করে মোনাজাত। বিকাল ৩টা পর্যন- মাইকিং চলে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-27

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: