এনটিভি আরটিভি শিগগিরই সীমিত সম্প্রচারে যাবে

সোমবারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এনটিভি ও আরটিভির যন্ত্রপাতির ভয়ংকর ক্ষতি হয়েছে। এই দুটি বেসরকারি টিভি কেন্দ্র সহসাই পূর্ণ সম্প্রচারে যেতে পারবে না। এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান বাপ্পি জানিয়েছেন, অবিরাম সম্প্রচারে যেতে ৩-৪ মাস সময় লাগবে। তবে সপ্তাহ দু’য়েকের মধ্যে এনটিভি ও আরটিভি সীমিত সম্প্রচার শুরু করতে সক্ষম হবে। এই দুটি সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিকালে সুন্দরবন হোটেলে এনটিভি ও আরটিভি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন বাপ্পি। তিনি জানান, এনটিভির নিহত সিকিউরিটি গার্ডের পরিবারকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে ও আহত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। বুধবার বেতন পরিশোধ করা হবে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীরা অকৃত্রিম সহানুভূতি প্রকাশ করায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দৈনিক আমার দেশও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পূর্ণ কলেবরে প্রকাশিত হবে। সোমবার অগ্নিকাণ্ডের পর তারা অন্য একটি জাতীয় দৈনিকের অফিস থেকে চার পৃষ্ঠার দৈনিক প্রকাশ করলেও মঙ্গলবার থেকে নিজস্ব প্রেসে আট পৃষ্ঠার দৈনিকের ছাপার কাজ শুরু করেছে।
গতকাল ইস্পাত ভবনে প্রবেশাধিকার ছিল খুবই সংরক্ষিত। র‌্যাবের অনুমতি ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। শত শত লোক দিনভর ওই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছে। তাদের মনে প্রশ্নের যেন শেষ নেই। আগুনে কি পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, মোট কতজন মারা গেছে, কোথা থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে, আগুন লাগলো কিভাবে, কোথা থেকে লাগলো, কিভাবে লাগলো, এনটিভি, আরটিভির সম্প্রচার কবে শুরু হবে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন দিনভর জানতে চেয়েছে তারা। অগ্নিদগ্ধ ভবনের সামনের রাস-ায় বসেছিলেন এনটিভি-আরটিভির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে গেছে এনটিভি, আরটিভির ১১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। তবে এনটিভির মূল্যবান এসএনজি মেশিনটি রক্ষা পেয়েছে। এনটিভির ৭০ কোটি ও আরটিভির ৪০ কোটি টাকার বিনিয়োগ ছিল বলে জানা গেছে। আগুনে এনটিভির অফিসের ভেতরে ক্ষতি না হলেও আগুনের লেলিহান শিখার মাত্রাতিরিক্ত তাপে যন্ত্রপাতি সব নষ্ট হয়ে গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের ভয়াল স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে সেদিন ভবনে আটকেপড়া মানুষদের। রাতে ঘুমের বড়ি খেয়েও অনেকে ঘুমাতে পারেননি। চোখ বুজলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে আগুনের ফুলকি, ধোঁয়া, ছাদে অসহায়ের মতো দৌড়াদৌড়ি করা, শত শত মানুষের হৈচৈ, বাঁচাও বাঁচাও শব্দ।
এনটিভির বিশেষ প্রতিনিধি জুলফিকার মানিক। সকাল হতেই উপস্থিত হতেন অফিসে। অফিসের ১১টি ক্যামেরা নিয়ে তিনিসহ অন্য রিপোর্টাররা ট্রাইপট, মাইক্রোফোন ও গাড়ি নিয়ে ছুটতেন ঘটনাস্থলে বা নির্ধারিত অ্যাসাইনমেন্টে। তিনি বললেন, আজ থেকে অন্য চ্যানেলের বন্ধুরা, কলিগরা অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ছুটবে, আমাকে বসে থাকতে হবে। আমরা এখন রাস-ায় পথচারীদের কাতারে দাঁড়ালাম। একই মন-ব্য করলেন এনটিভির রিপোর্টার শফিক শাহিন, ফয়জুল্লাহ মাহমুদ, ইব্রাহিম হারুন ও আরটিভির রিপোর্টার আসমা আক্তার সাথীসহ অনেকেই। এনটিভির বিশেষ প্রতিনিধি মোস-ফা ফিরোজ জানালেন, সোমবার তার একটি প্রোগ্রামের ভয়েস এডিটিংয়ের কাজ ছিল। তিনি নতুন জামা পরে অফিসে আসছিলেন। অন্যান্য দিন আগে এসে রিপোর্টারদের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে বাইরে পাঠাতেন। এদিন একটু দেরি করেই অফিসে পৌঁছেন। কাছাকাছি পৌঁছতেই তিনি মোবাইলে জানতে পারেন ভবনে আগুন লেগেছে এবং অনেক কলিগ আটকা পড়েছে। তিনি বলেন, প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। আমি মোবাইলে শুনেছি র‌্যাব এসেছে। একথা শুনে তিনি বিস্মিত হননি। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে তদন- হতে পারে, এ ব্যাপারে আমরা সবাই মানসিকভাবে প্রস’ত ছিলাম। সেই ঝামেলা মোকাবেলা রাজনৈতিকভাবে করা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল। কিন’ এভাবে সব পুড়ে যাবে, তা ভাবতেই পারিনি। এনটিভির চিফ নিউজ এডিটর খায়রুল আনোয়ার মুকুল সোমবার মিডিয়ার সঙ্গে কথা বললেও গতকাল তিনি নিশ্চুপ হয়ে যান। এনটিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমেদ জানান, সারারাত ঘুমাতে পারেননি। তিনি জানান, অক্টোপাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাদের কাজ চলত। যে কোন ফাইলের নাম লিখে বোতাম টিপলেই ওই সংক্রান- সব ফাইল চলে আসত। তাছাড়া তাদের আর্কাইভে গত কয়েক বছরে এনটিভিতে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান সংরক্ষিত ছিল। পুরনো সার্ভার বদলে নতুন সার্ভার বসানোর জন্য কেনা যন্ত্রপাতি ৮ তলায় রাখা ছিল। আগুনে সেগুলো সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
এনটিভির ফাহমিদা হক অনি মঙ্গলবার এসেই সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। তিনি জানান, রাতে ৩টি রিলাক্সিন ট্যাবলেট খেয়েও ঘুমাতে পারেননি। চোখ বন্ধ করলেও ভেসে উঠছিল সেই দৃশ্য।
এনটিভির নির্বাহী পরিচালক হাসনাইন খুরশেদ যুগান-রকে জানান, বৃহস্পতিবারের মধ্যে সীমিত সম্প্রচারের চূড়ান- তারিখ নির্ধারণ হবে। এদিনও ভবনটির সামনে শত শত কৌতূহলী মানুষের ভিড় ছিল। ফার্মগেট থেকে এদিক দিয়ে যে বাসগুলো যাচ্ছিল সেগুলো এ ভবনের সামনে এসে কিছুটা আসে- আসে- চলছিল। সবাই পোড়া ভবনের ধ্বংসযজ্ঞ দেখছিল।
ভবনের অদূরে একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন দুই বুয়া জুলেখা ও মাকসুদা। ভবনটি পোড়া গেছে বলে দেখতে এসেছেন। মাগুরার শ্রীপুর থানার মাঝাইল মান্ধারতলা গ্রামের আবদুল হান্নান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে এখানে ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে দেখছেন বলে জানালেন। কারওয়ানবাজারের এ ভবনটি এখন যেন এক দর্শনীয় ভবন। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-02-28

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: