দোতলা ও তিনতলার আগুন হঠাৎ লাফ দিয়ে ন’তলা গ্রাস করলো কি ভাবে – বিএসইসি ভবনের ছাদে ফেনসিডিল বোতলের স্তুপ

রাজধানীর কারওয়ান বাজার বাণিজ্যিক এলাকার বহুতল বিএসইসি ভবনে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের প্রকৃত কারণ দু’দিন পরও উদ্‌ঘাটিত হয়নি। তবে দোতলা থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত সম্পর্কে তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু কি থেকে আগুন লেগেছে তা এখনো পরিষ্কার হয়নি। এই প্রথম আগুনের ‘হাইজাম্প’ নানা জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। আগুনের স্বাভাবিক ধর্ম হচ্ছে নিচে পুড়িয়ে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে যাবে। কিন্তু ভবনের দোতলা ও তিনতলা আগুনে পুড়ে যাওয়ার পরই হাইজাম্প দিয়ে নয়তলা গ্রাস করল কি করে? ভবনের নিচের প্রবেশ পথ থেকে প্রতিটি ফ্লোরে ছিল সার্বড়্গণিক কড়া নিরাপত্তা। নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করে ভবনের ছাদে মাদকদ্রব্য ফেনসিডিলের বোতলের সত্মূপ হলো কি করে? সোমবার সাড়ে পাঁচ ঘন্টা আগুনের সাথে মানুষের শ্বাসরম্নদ্ধকর লড়াইয়ের পর গতকাল বুধবার পর্যনত্ম ভবনের অভ্যনত্মর গরম ছিল। নয়তলার ছাদ এবং দশতলার ফ্লোর আগুনের তাপে ফেটে গেছে। তিনটি ফ্লোর পুড়ে কয়লা হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি ফ্লোরের প্রত্যেকটি আংশিক আগুনে পুড়ে গেছে। এসব ফ্লোরে আগুন ও পানি এ দু’য়ের সমন্বয়ে ড়্গতির পরিমাণ অনেক বেশী। ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রফিকুর রহমানের কথায়, তদনত্ম সম্পন্ন করতে আরো দু’একদিন লেগে যাবে।

অগ্নিকান্ডের পর গতকাল ছিল তৃতীয় দিন। গোটা ভবন রয়েছে র‌্যাবের নিয়ন্ত্রণে। ভবনের সামনে রয়েছে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের একটি ইউনিট। ভবনের দোতলায় আবুল খায়ের লিটুর বেঙ্গল গ্রম্নপের ক্যান্টিনে গ্যাসের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এমন তথ্য ঘটনার দিন পাওয়া গিয়েছিল। নিরাপত্তা রড়্গী আবদুর রহমানের বক্তব্য, ‘গ্যাসের চুলা থেকে আগুন লাগে। আমি সাথে সাথে এ্যালার্ম বাজিয়ে দেই। ক্যান্টিনে যারা ছিল তারা কাউকে প্রবেশ করতে না দিয়ে নিজেরাই নিভিয়ে দেয়ার কথা বলেছিল’। এদিকে সোমবার সকালে ক্যান্টিনে যে ক’জন ছিল গতকাল পর্যনত্ম তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভবনের একাধিক প্রতিষ্ঠানের লোকদের মতে, দোতলার ক্যান্টিনের ২/৩ জনের গা ঢাকা দেয়াটা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেন তারা ঐ সময় কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হলে দোতলা থেকে উপরের দিকে যেতে বেশ সময় নিয়েছে। দোতলা পুড়িয়ে সাড়ে ১১টায় গ্রাস করে তিনতলা। এরপরই হাইজাম্প দিয়ে আগুন চলে যায় নয়তলায়। অগ্নিকান্ডের ব্যাপারে ভবনের লোকজন স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারছেন না। গঠিত তদনত্ম কমিটি কোন প্রকার মনত্মব্য করা থেকে বিরত রয়েছে। পুলিশের সর্বোচ্চ তদনত্মকারী সংস্থা সিআইডি’র মতে, ভবন থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব আলামত পরীড়্গার পরই মনত্মব্য করা যাবে।

দ্বিতীয় দিনের তদনত্ম

গতকাল তদনত্ম কমিটির সকল সদস্য দ্বিতীয় দিনে ভবনের প্রতিটি ফ্লোর পরিদর্শন করেছেন। ভবনের প্রতিষ্ঠানের মালিক কিংবা মালিকের প্রতিনিধি নিয়ে তদনত্ম কমিটির সদস্যরা পরিদর্শন করেন। একই সাথে ইন্সুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তারা ড়্গয়ড়্গতি নির্ধারণে ভবনে যান। কিন্তু সাংবাদিকদের ভবনে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তদনত্ম সম্পন্ন হওয়ার পরই ভবনের ভেতরে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হবে।

একজন ব্যারিস্টারের কথা

ভবনের ১০ তলায় রাহাত খলিল এন্ড এসোসিয়েটস অফিসের মালিক ব্যারিস্টার রাহাত খলিল দাবি করেছেন, সঠিকভাবে তদনত্ম করলেই অগ্নিকান্ডের নেপথ্য কারণ বেরিয়ে পড়বে। নয়তলার আগুন এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে ১০ তলার ফ্লোর ফেটে গেছে। তাছাড়া, ভবনের ছাদে রয়েছে মাদকদ্রব্য ফেনসিডিলের খালি বোতলের সত্মূপ। ভবনের নিচতলায় প্রবেশ পথ থেকে শুরম্ন করে ১১তলা পর্যনত্ম ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা নিরাপত্তা রড়্গীও ছিল। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এতো নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কারা মাদকদ্রব্য ফেনসিডিল নিয়ে ছাদে গিয়েছিল? একদিনে এসব বোতল ছাদে যায়নি। দিনের পর দিন ছাদে বসে যারা ফেনসিডিল গিলেছে তাদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তাহলেই অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে যাবে।

তিনটি ফ্লোর কয়লা

বিএসইসি ভবনের দোতলা, তিনতলা এবং নয়তলা আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। গতকালও এসব ফ্লোর থেকে পোড়া গন্ধ বের হয়। চার থেকে আটতলা পর্যনত্ম আগুন আংশিক ড়্গতি করেছে। তবে আগুনের পাশাপাশি পানি ড়্গতির অংক বাড়িয়ে দিয়েছে এমন তথ্য পাওয়া গেছে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের নিকট থেকে। এদিকে অগ্নিকান্ডের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে পারেনি তদনত্ম কমিটি। বৈদ্যুতিক শটসার্কিট নাকি গ্যাসের চুলা তা পরিষ্কার নয়। তবে আগুন লাগার পরই বিদ্যুতের তারের জন্যে দ্রম্নত উপরের দিকে উঠে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ডিজি জানান, তদনত্ম শেষ করতে আরো দু’দিন সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা নিশ্চিত হয়েছেন ভবনের দোতলা থেকেই আগুন লেগেছে।

গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এম আমীর-উল-ইসলাম পুড়ে যাওয়া বিএসইসি ভবন পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, কোন ধরনের আইনী সহায়তার প্রয়োজন হলে আমরা করতে প্রসত্মুত আছি। তিনি নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

এনটিভি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান ভবন পরিদর্শন শেষে অপেড়্গমাণ সাংবাদিকদের জানান, এই ভবনে কোনভাবেই এনটিভি ও আরটিভি সম্প্রচার সম্ভব নয়। অন্য কোন ভবনে সাময়িকভাবে ৩/৪ ঘণ্টার জন্য সম্প্রচার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার অফিসের তেমন ড়্গতি হয়নি। তারা ইচ্ছা করলেই কাজ শুরম্ন করতে পারবে। এনায়েতুর রহমান জানান, এটা কোন নাশকতামূলক নয়। এটা একটা বড় দুর্ঘটনা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কড়া নিরাপত্তা ভেদ করে জনযুদ্ধের কোন সদস্য এখানে আসার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, মিডিয়ার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আরটিভি’র চিফ নিউজ এডিটর সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা জানান, ৭ম তলা পরিদর্শন করে এলাম। ভিতরে বীভৎস অবস্থা। আরটিভি’র মাস্টার কন্ট্রোল রম্নমসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

১০ তলায় অবস্থিত ফারইস্ট ইসলামী ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের সিনিয়ির ভাইস চেয়ারম্যান সাখাওয়াৎ সেলিম জানান, আমাদের প্রতিষ্ঠান অড়্গত রয়েছে। তেমন কোন ড়্গতি হয়নি। তবে আমাদের পশ্চিম পাশে ব্যাপক ড়্গতি হয়েছে। পশ্চিম পাশে অবস্থিত রাহাত খলিল এন্ড এসোসিয়েটসের ব্যারিস্টার রাহাত খলিল অভিযোগ করেন, এনটিভি ও আরটিভি’র কর্তৃপড়্গের সিঁড়ি দখলের কারণে দুর্ঘটনার সময় কিছুটা বেশি ড়্গতি হয়। তারা ফুলের টব রেখে সিঁড়ি দখল করে রেখেছে।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের ডেপুটি ম্যানেজার মোঃ আব্দুল মতিন বলেন, ভবনের কতটুকু ড়্গতি হয়েছে, তা তদনত্ম করতে এসেছি। আজ (গতকাল) তৃতীয় তলা পর্যনত্ম পরিদর্শন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ভবন অন্ধকার। ২য় ও ৩য় তলা মনে হয় কয়লার খনিতে পরিণত হয়। ড়্গতির ব্যাপকতা দেখে হতবাক হয়েছি। ফ্যানগুলো গলে গেছে। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে বিএসইসি কর্তৃপড়্গ আমাদের সংস্থায় এই ভবনের ইন্স্যুরেন্স করে। বীমা পলিসির পরিমাণ ৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এটা শুধু বিএসইসি ভবন ও তাদের আসবাবপত্রের বীমার পরিমাণ। ভাড়াটিয়া কোন প্রতিষ্ঠান-এর সঙ্গে সংযুক্ত নয়। গতকালও ভবনের ভেতর সংশিস্নষ্ট মালিক কিংবা প্রতিনিধি ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

সংশোধনীঃ গত বুধবার ইত্তেফাকে ‘বিএসইসি ভবনের আগুন নাশকতামূলক?’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে আবুল খায়ের গ্রম্নপের যমুনা অয়েলের পরিবর্তে আবুল খায়ের লিটুর বেঙ্গল গ্রম্নপের একটি প্রতিষ্ঠান হবে। যমুনা অয়েল হচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-03-01

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: