নির্বাচন নিয়ে অস্পষ্টতা

গত বছরের অক্টোবর মাসে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগে থেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে থাকে। ১৪ দলের আন্দোলন ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিকে ঘিরে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদে আসীন হতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে আসীন হন। ১৪ দল তাদের দাবিগুলো পুনর্ব্যক্ত করে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। নির্বাচন কমিশন ২২ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করে নবম জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা করে। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশে জরম্নরি অবস্থা জারি করেন। ড. ফখরম্নদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম ভাষণে তিনি বলেন, যত দ্রম্নত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের হাতে ড়্গমতা হসত্মানত্মর করা হবে। এরপর থেকে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথাবার্তা চলতে থাকে। তবে এনিয়ে একটা অস্পষ্টতা রয়েই গেছে।

গত ১২ জানুয়ারি ড. ফখরম্নদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেয়ার দিনই নির্বাচন কমিশন ২২ জানুয়ারির নির্বাচন প্রস্তুতি প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেয়। ১৪ জানুয়ারি নবনিযুক্ত উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠকে নির্ভুল ভোটার তালিকা, আইডি কার্ড ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধানত্ম হয়। ওইদিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন করে জনগণের হাতে ড়্গমতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও যথাশীঘ্র নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ড়্গমতা হসত্মানত্মরের আহবান জানানো হয়। ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধানত্ম নেবে উপদেষ্টা পরিষদ। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ১৮ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে বলে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে যথাশীঘ্র সম্ভব গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ১৭ জানুয়ারি আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে না। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ১৯ জানুয়ারি এক আদেশে ২২ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করেন। ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরম্নদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রথম ভাষণে বলেন, যত দ্রম্নত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের হাতে ড়্গমতা হসত্মানত্মর করা হবে। তিনি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু করতে বিভিন্ন পদড়্গেপ নেয়ার কথাও বলেন। ঐদিন সিইসি বিচারপতি এমএ আজিজ তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী ২২ জানুয়ারি বিদেশী কূটনীতিকদের ব্রিফ করতে গিয়ে বলেন, সরকার স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে, দেশে বিদেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা হবে। ওইদিন বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট যথাসম্ভব দ্রম্নত নির্বাচন দেয়ার কথা বলে। প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরম্নদ্দীন আহমদ ওইদিন বিকেলে বিভিন্ন মিডিয়ার সম্পাদকদের সাথে আলাপকালে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়সীমা বলার মুহূর্ত এখনো আসেনি। আমাদের লড়্গ্য স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা। ২৫ জানুয়ারি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এক ব্রিফিং-এ বলেন, যথাসম্ভব দ্রম্নততম সময়ের মধ্যে সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও প্রধান লড়্গ্য হচ্ছে নির্বাচন। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ২৭ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় বলেন, যেনতেন একটা নির্বাচন করে নামকাওয়াসেত্ম পরিবর্তনের পড়্গে নই আমরা। বরং বিলম্বে হলেও সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের বিষয়টিই সবকিছুর আগে থাকবে। ২৯ জানুয়ারি ১৪ দল এক বৈঠক করে জানায় যে, নির্বাচন কমিশন সংস্কার করে দ্রম্নত নির্বাচন দিতে হবে। এদিন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে দ্রম্নত নির্বাচন দেয়ার তাগিদ দেন।

৩০ জানুয়ারি আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করেই নবগঠিত নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের দিনড়্গণ চূড়ানত্ম করবে। নির্বাচন করার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, দুর্নীতি ও কালো টাকামুক্ত নির্বাচন করার জন্য যা যা করণীয় তা করা হবে। এদিন শেখ হাসিনা বলেন, সারাজাতি নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত হয়ে আছে। ২ ফেব্রম্নয়ারি ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সঙ্গে সাড়্গাৎ করে বলেন, ভারত বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। নবনিযুক্ত সিইসি ড. এটি এম শামসুল হুদা ৫ ফেব্রম্নয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, ইসিকে এমন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই যাতে সবাই গর্ব করতে পারে। নতুন নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন ৬ ফেব্রম্নয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে বাধাগুলো চিহ্নিত করার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করা হবে। ৮ ফেব্রম্নয়ারি ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র টম ক্যাসি এক প্রেস ব্রিফিং-এ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সংবিধান ও আইনের শাসনের আওতায় বাংলাদেশে শীঘ্র নির্বাচন চায়। ১১ ফেব্রম্নয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্বাচনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ওই দিন আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় শেখ হাসিনা নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেন, নির্ভুল ভোটার লিষ্ট করে দ্রম্নত নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরম্ন করম্নন। ১৩ ফেব্রম্নয়ারি প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার কর্মসূচি বাসত্মবায়ন করা হবে। ১৪ ফেব্রম্নয়ারি অনুষ্ঠিত বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়। ২০ ফেব্রম্নয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভোটার পরিচয়পত্র বা ন্যাশনাল আইডির অজুহাতে নির্বাচন পেছানো যাবে না। আমরা চাই সংবিধান অনুযায়ী সরকারের ধারাবাহিকতা চলুক। ২১ ফেব্রম্নয়ারি আইন উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন বিবিসির সঙ্গে এক সাড়্গাৎকারে বলেন, নির্বাচন অবশ্যই আমরা তাড়াতাড়ি করবো। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে তাতে মনে হচ্ছে তারা তাড়াতাড়ি ড়্গমতায় এসে আরাম আয়েশ করবে, এর মধ্যে আমরা নেই। তিনি বলেন, এখন রাজনৈতিক দলগুলো যদি বলে আমরা আইডি কার্ড চাই না, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স চাই না, যেসব দাবি তাদেরও ছিলো, কোন আইন পুনর্গঠন করতে চাই না। আমাদের দ্রম্নত নির্বাচন করতে দিন। আমরা আগের মতো ড়্গমতায় এসে আগের মত দুর্নীতি করবো, আগের মতো রাজনীতি করবো; কিন্তু সেটাও হতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশ সফরে আগত মার্কিন কংগ্রেসম্যান স্টিভ শ্যাবোট প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাড়্গাৎ করলে তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লড়্গ্য। কংগ্রেসম্যান বার্তা সংস্থা ইউএনবির সাথে এক সাড়্গাৎকারে বলেন, খুব বেশী দেরী হবার আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে নির্বাচন চায়। ২৪ ফেব্রম্নয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, অনতিবিলম্বে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে পেশাজীবী, সুশীল সমাজ ও সুধীজনদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরম্নদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনের ব্যাপারে এখনই নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া আমাদের পড়্গে সম্ভব নয়। তবে আমরা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগুচ্ছি। যত দ্রম্নত সম্ভব নির্বাচন দিতে আমরা সংকল্পবদ্ধ। এনিয়ে আমার মনে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। তবে সংস্কার ছাড়া নির্বাচনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে সাড়্গাৎ করে আগামী জুন মাসের মধ্যে নির্বাচন দাবি করেছে। Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-03-01

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: