বিটিভিতে লুটপাটের খণ্ডচিত

জোট সরকারের আমলে দুর্নীতি ও লুটপাটের মহোৎসব চলেছে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি)। বিটিভির বার্তা ও অনুষ্ঠান দুটি বিভাগেই সমানতালে চলেছে এ উৎসব। উৎসবে গা ভাসিয়ে চলেছেন বিএনপি-জামায়াতের মনোনীতরা। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর তাদের উৎসবে ভাটা পড়লেও পাল্টায়নি তাদের চরিত্র।

জানা গেছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন, কেপিআই-১) বেষ্টনীর মধ্যে থেকে অত্যন- সুকৌশলে বিটিভির সাবেক উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) একেএম হানিফ ও তার অন্যতম সহযোগী মুখ্য বার্তা সম্পাদক ডিকে ফুয়াদ হাসান এবং উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) মাহবুবুল আলম জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই বিটিভিতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ রোপণ করেন। অনুষ্ঠান বা বার্তা বিভাগের মানের দিকে লক্ষ্য না রেখে সবাই ব্যস- হয়ে পড়েন নিজ নিজ আখের গোছাতে। তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বিটিভির বার্তা ও অনুষ্ঠান বিভাগে অপচয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এ টাকা হাতিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বিটিভির অনেকেই এখন একাধিক গাড়ি-বাড়ির মালিক।

বিএনপি ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তাদের ইশতেহারে রেডিও-টেলিভিশনকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করার ঘোষণা দিলেও ক্ষমতায় এসেই প্রথমে তারা সরকারি প্রচারযন্ত্র বিটিভিকে দলীয়করণের কাজে হাত দেয়। বিটিভির বার্তা ও অনুষ্ঠান দুটি বিভাগের শীর্ষ পদে তারা নিজেদের লোক বসায়। পরিকল্পনা বাস-বায়নের জন্য জোট সরকার ক্ষমতায় আসার ১২ দিনের মাথায় তৎকালীন মুখ্য বার্তা সম্পাদক সেখ সালেক, পরিচালক (উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান) ম. হামিদ ও অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ খ. ম. হারুনের মতো সিনিয়র কর্মকর্তাকে জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটে (নিমকো) বদলি করা হয়। বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) পদে বসানো হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রাম ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমান নাম ইসলামী ছাত্রশিবির) অন্যতম নেতা একেএম হানিফকে। সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সুপারিশে তাকে ওই পদে বসানো হয় বলে বিটিভি সূত্র জানায়। বার্তা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পেয়েই হানিফ বিটিভিতে শুরু করেন দলীয়করণ। বার্তা বিভাগের কর্মকর্তা ডিকে ফুয়াদ হাসান, নুরুল আজম পবন, মাঈনউদ্দিন, আনোয়ার ইসলাম এবং প্রকৌশল বিভাগের মোঃ সাইফুল্লাহসহ জাতীয়তাবাদ ও জামায়াতি মতাদর্শের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। হানিফের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় ডিকে ফুয়াদ হাসানকে। ফুয়াদ প্রথমেই মুখ্য বার্তা সম্পাদক সেখ সালেককে বিদায় করে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তা হয়েও ওই পদটি দখল করে নেন। জোট সরকারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক করার উদ্দেশ্যে ডিকে ফুয়াদ হাসান সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিউজ কভার করা শুরু করেন। সেই সুবাদে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে বদলি তদবির করে লাখ লাখ টাকা আয় করেন বলে বিটিভি সূত্র জানায়।

বিটিভির বার্তা বিভাগের প্রধান ও একমাত্র কাজ নিয়মিত সংবাদ বুলেটিন তৈরি ও সম্প্রচার। সে অনুযায়ী বিটিভিতে প্রতিদিন সকাল ৮টায় সকালের সংবাদ (ব্যাপ্তিকাল ১০ মিনিট), সকাল ৯টায় সংবাদ শিরোনাম (ব্যাপ্তিকাল ৫ মিনিট), বেলা ২টায় দুপুরের খবর (ব্যাপ্তিকাল ১৫ মিনিট), বিকাল ৩টায় ইংরেজি খবর (ব্যাপ্তিকাল ৫ মিনিট), বিকাল ৫টায় বাংলা খবর (ব্যাপ্তিকাল ৫ মিনিট), সন্ধ্যা ৬টায় খবর : দেশ ও জনপদ (ব্যাপ্তিকাল ১০ মিনিট), রাত ৮টায় বাংলা সংবাদ (ব্যাপ্তিকাল ২৫ মিনিট), রাত ১০টায় নিউজ এট টেন (ব্যাপ্তিকাল ২৫ মিনিট), রাত সাড়ে ১১টায় রাতের সংবাদ (ব্যাপ্তিকাল ১৫ মিনিট) এবং পৌনে ১২টায় দি নিউজ (ব্যাপ্তিকাল ১৫ মিনিট) নামে ১০টি সংবাদ বুলেটিন প্রচারিত হচ্ছে। নিয়মিত ১০টি সংবাদ বুলেটিনের মধ্যে দেশ ও জনপদের খবর বাদে বাকি ৯টি বুলেটিনের প্রতিটিতেই বহির্বিশ্বের খবর অন-র্ভুক্ত থাকে। বিশেষ করে সকাল ৮টা, বেলা ২টা ও বিকাল ৩টার খবরে বহির্বিশ্বের খবরের আধিক্য থাকে বেশি। কিন’ বিটিভির সাবেক উপ-মহাপরিচালক (বার্তা) একে হানিফ ও মুখ্য বার্তা সম্পাদক ডিকে ফুয়াদ অতিরিক্তি অর্থ আয়ের উদ্দেশ্যে বার্তা বিভাগ থেকে বিশ্ব প্রতিদিন (দৈনিক), দি ওয়ার্ল্ড এভরিডে (দৈনিক), প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সংবাদ পাক্ষিক বার্তা (পাক্ষিক), বার্তা প্রবাহ (অর্ধ সাপ্তাহিক), বিশ্ব পরিক্রমা (সাপ্তাহিক), ছোটদের সংবাদ (অর্ধ সাপ্তাহিক), নিউজ ফর চিলড্রেন (অর্ধ সাপ্তাহিক) ও সার্ক রাউন্ড আপ (মাসিক) প্রচারের ব্যবস্থা করেন। তাদের নির্দেশে সংবাদ বুলেটিনের বাইরে প্রতিমাসে এই আটটি অনুষ্ঠান ৯১টি পর্বে প্রচারিত হচ্ছে। প্রচারিত এসব অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে পৃথক বাজেট। বাজেটে উপস্থাপনা, অংশগ্রহণ, গ্রন্থনা ও গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট অংকের টাকা বরাদ্দ থাকে। বিটিভির হিসাব সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব প্রতিদিন অনুষ্ঠানের জন্য মাসিক ব্যয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৫০ টাকা, দি ওয়ার্ল্ড এভরিডে’র মাসিক ব্যয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৫০ টাকা, পাক্ষিক বার্তার ব্যয় ১২ হাজার ৮৬২ টাকা, বার্তা প্রবাহের ব্যয় ৪০ হাজার ২৪৮ টাকা, বিশ্ব পরিক্রমার ব্যয় ২০ হাজার ১২৪ টাকা, ছোটদের সংবাদ ৩৩ হাজার ৫২৮ টাকা, নিউজ ফর চিলড্রেন ৪৫ হাজার ৭৭৬ টাকা, সার্ক রাউন্ড-আপ ৫ হাজার ৩১ টাকা। ৯১টি পর্বে প্রচারিত ৮টি অনুষ্ঠানের মাসিক ব্যয় ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ টাকা। এর মধ্যে উপস্থাপনা খাতে মাসিক ব্যয় হয় ৮৩ হাজার ১৬০ টাকা। উপস্থাপনা খাতে বরাদ্দ অর্থ ছাড়া বাকি সব টাকাই আত্মসাৎ করা হয় অত্যন্ত সুকৌশলে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, গ্রন্থনা ও গবেষণা হচ্ছে বায়বীয় শব্দ। দৈনন্দিন নিউজ বুলেটিন থেকেই এসব অনুষ্ঠানের তথ্য ও চিত্র সংগ্রহ করা হয়। এখানে কোন মৌলিক গ্রন্থনার অবকাশ নেই। বুলেটিন থেকে সংশ্লিষ্ট আইটেম কপি ফটোকপি করে অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রযোজক অথবা বার্তা বিভাগের নিয়মিত কর্মচারীরাই এ কাজ করে থাকেন। অংশগ্রহণ, গ্রন্থনা ও গবেষণা খাতে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। পরে বিল করে অর্থ গ্রহণ করা হয়, যার পুরোটাই হানিফ ও ফুয়াদ ভাগাভাগি করে নিতেন। এছাড়া সংবাদ উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও গত পাঁচ বছরে বিটিভিতে চরম অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে। কোন প্রকার অডিশন ছাড়াই গত সরকারের আমলে ডিকে ফুয়াদ হাসানের স্ত্রী তাসমিমা হোসেনকে সংবাদ উপস্থাপিকা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিটিভিতে কোন নতুন সংবাদ উপস্থাপক বা উপস্থাপিকার জন্য মাসে একটি সংবাদ উপস্থাপনার সুযোগ থাকলেও তাসমিমা হোসেনের ক্ষেত্রে এ নিয়ম ছিল ব্যতিক্রম। মাস নয়, প্রায় প্রতিদিনই কোন সংবাদ উপস্থাপনার সুযোগ দেয়া হতো তাকে। সংবাদ বুলেটিনের বাইরে প্রচারিত এ অনুষ্ঠানগুলো অনেকটা দায়সারা গোছের হলেও সিন্ডিকেটের চাপের মুখে অদ্যাবধি তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিভির বার্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা বিশ্ব প্রতিদিন ও দি ওয়ার্ল্ড নিউজ অনুষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এ দুটি অনুষ্ঠানের জন্য ১০ মিনিট করে সময় বরাদ্দ থাকলেও বাস-বে দায়সারাভাবে কয়েকটি আইটেম দিয়ে ৫/৬ মিনিটের মধ্যে তা শেষ করা হয়। তাছাড়া যে আইটেমগুলো ব্যবহার করা হয়, তার অধিকাংশই নিয়মিত বুলেটিনে বারবার প্রচারিত। এসব অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হানিফ ও ফুয়াদ। বিটিভি সূত্র জানায়, বিটিভিতে হানিফের নিয়োগ প্রক্রিয়াও ছিল অস্বচ্ছ। ’৮০ সালের এপ্রিলে তাকে বার্তা বিভাগের প্রযোজক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সে সময় হানিফের সরকারি চাকরির বয়সসীমা নিয়ে বিতর্ক উঠলে তৎকালীন বার্তা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হুমায়ন চৌধুরী ও ফারুক আলমগীরকে ধরে তিনি কোন রকমে পার পেয়ে যান। পরবর্তী সময়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসনামলে তার নিউজ কভার করার দায়িত্ব পান। তখন থেকেই বদলি-তদবিরের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের জহুরী মহল্লার এফ-ব্লকে ৩৫/১১ নং হোল্ডিংয়ের সুরম্য পাঁচতলা ভবনের বাড়িটি দেখে কেউ বুঝতে পারবে না এটা কোন সরকারি কর্মকর্তার বাড়ি। ২০০১ সালে জোট ক্ষমতায় আসার পর অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন হানিফ। বার্তা বিভাগে নিয়োগ-বদলি ছাড়াও বিভিন্ন মফস্বল সংবাদদাতার মাধ্যমে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিটিভির গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি এমারতের মাধ্যমে তিনি জয়দেবপুরে ৭০/৮০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন বলেও জানা গেছে। একে হানিফ গত মাসের প্রথম দিকে স্বাভাবিক অবসরে যান। অবসরে যাওয়ার আগে প্রভাব খাটিয়ে কিছুদিনের জন্য বিটিভির ডিজির পদটিও দখল করেছিলেন তিনি। কিন’ পরে তা আর রাখতে পারেননি। এদিকে বিটিভির এক কর্মকর্তা জানান, গত ২২ জানুয়ারির কথিত নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি-জামায়াত যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করেছিল তার অন্যতম একটি অংশ ছিল ‘মিডিয়া ক্যু’। তিনি বলেন, বিতর্কিত সাবেক নির্বাচন কমিশনার স.ম. জাকারিয়া, বিটিভির একে হানিফ ও ডিকে ফুয়াদ হাসান এ পরিকল্পনার মূল নায়ক। কোন কারণে নির্বাচনে যদি বিএনপি-জামায়াতের বিপর্যয় ঘটে তবে স.ম. জাকারিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন আসনে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের বিজয়ী দেখিয়ে তা বিটিভিতে প্রচার করে দেয়া। এ কাজে সহযোগিতার জন্য স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছিল বিএনপি-জামায়াতের নিয়োগ করা জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের। বিটিভির সাবেক এই কর্মকর্তা হানিফের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান-রকে বলেন, তিনি বিটিভিতে থাকাকালে যা কিছু হয়েছে নিয়মের মধ্যে হয়েছে। নিয়মের বাইরে কিছু হয়নি। যেহেতু সবকিছু নিয়মের মধ্যে হয়েছে, তাই এখানে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিও ঠিক নয়।

বিটিভি থেকে হানিফ চলে গেছেন তবে আছেন তার সহযোগী ডিকে ফুয়াদ হাসান। হাওয়া ভবনের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ফুয়াদ একদিকে বিটিভির বার্তা বিভাগে বিএনপির নীলনকশা বাস-বায়ন করছেন, অন্যদিকে সুযোগ পেলেই জোট সরকারের গুণকীর্তন করছেন। গত কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামের ডুলাহাজরা সাফারি পার্কের দৃশ্য দেখানোর আগেই বলা হয় বিগত পাঁচ বছর এ এলাকায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট উন্নয়নের কথা। ঢাকায় একাধিক দামি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। এছাড়া রয়েছে মোটা অংকের ফিক্সড ডিপোজিট। ২০০৫ সালে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে এক মাসের ছুটিতে আমেরিকা যান। সেখানে তিনি দেড় মাসের বেশি সময় কাটিয়ে দেশে ফিরে ছুটির আবেদন করেন। কর্তৃপক্ষ এখনও তার বাড়তি ছুটির আবেদন মঞ্জুর করেনি বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে ডিকে ফুয়াদ হাসানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন মন-ব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে বিগত পাঁচ বছরে বিটিভির বার্তা বিভাগে যে লুটপাট হয়েছে তার কয়েকগুণ বেশি হয় অনুষ্ঠান বিভাগে। চলেছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজান্তেই বিটিভির উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) মাহবুবুল আলম এসব দুর্নীতির নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই জামায়াত সমর্থক মাহবুবুল আলম মাগুরার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও হাওয়া ভবনের এক কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন। সেই সুবাদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিটিভির মেধাবী ও সিনিয়র কর্মকর্তা ম. হামিদ ও খ.ম. হারুনকে জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটে বদলি করান। ২০০২ সালে বিটিভির উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) মোস-ফা কামাল সৈয়দকে (এখন এনটিভিতে কর্মরত) ওসডি করান। এরপর তথ্য মন্ত্রণালয়ের লিখিত আদেশ ছাড়াই পরিচালক পদ থেকে উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) পদের দায়িত্ব নেন। বিটিভিতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা দেশের প্রখ্যাত নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্যাকেজ নাটক ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রচার বন্ধে একটি সূক্ষ্ম কৌশল নেন মাহবুব। জমা পড়া ওইসব অনুষ্ঠানের অধিকাংশের ব্যাপ্তিকাল ছিল এক ঘণ্টা। মাহবুবের পরামর্শে বিটিভির নিজস্ব ও প্যাকেজ অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তিকাল কমিয়ে করা হয় ২৫ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট। এতে করে আগের জমা পড়া এক ঘণ্টার অনুষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক কারণেই প্রচারের যোগ্যতা হারায়। ফলে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওইসব প্যাকেজ অনুষ্ঠান প্রচার এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। কেউ তাদের ক্যাসেট ফিরিয়ে নিয়ে তা কমিয়ে আধা ঘণ্টা করে দিতে চাইলে বিনা উৎকোচে প্রচার করা যেত না। এমনি একটি প্যাকেজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সেল মিডিয়া লিমিটেডের কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বিটিভিতে পড়ে থাকে প্রায় সাড়ে ৩ বছর ধরে। এরকম আরও অসংখ্য প্যাকেজ নাটক ও অনুষ্ঠান জমা পড়ে আছে বিটিভির স্টোর রুমে। মাহবুবুল আলমের এক সহকর্মী জানান, উপ-মহাপরিচালক পদে আসীন হয়েই মাহবুব হাওয়া ভবনের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে প্যাকেজ নীতিমালা উপেক্ষা করে আশিভাগ প্যাকেজ নাটক, ধারাবাহিক নাটক ও অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করেন। হাওয়া ভবনের কর্তাব্যক্তিদের কাছে বিটিভির মূল্যবান সময়ে (পিক আওয়ার) প্রতিদিন তিনটি প্যাকেজ নাটক প্রচারের জন্য সময় বরাদ্দ করেন। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর প্রতিষ্ঠান এ্যাড মিডিয়া, সাবেক চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মেয়ে লুনা খন্দকার এবং বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকেও মূল্যবান সময় বরাদ্দ দিয়ে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে নেন। তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম ও শামসুল ইসলাম ছিলেন অসহায়। মন্ত্রীদের কথায় কর্ণপাত করত না কেউ। সবকিছুই চলত হাওয়া ভবনের ইশারায়। দলীয় ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের বেলায় সময় বরাদ্দের বিনিময়ে নাটকপ্রতি নিজে ২০ হাজার টাকা করে কমিশন নেন মাহবুব। এ খাতে গত পাঁচ বছরে মাহবুব প্রায় ১১ কোটি টাকা আয় করেন। বাংলা ছায়াছবির প্রচার বাড়িয়ে সপ্তাহে দুটি করেন। প্রতিটি ছবিতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে উৎকোচ নিয়ে নিন্ম মান, পুরনো ও কম দামে কেনা ছবি বিটিভিতে প্রচারের সুযোগ করে দেয়াই ছিল তার কাজ। বিটিভি সূত্র জানায়, কোন ছবি এক লাখ টাকায় কিনে তা বিটিভিতে প্রচার করতে পারলেই কেবল লাভ আর লাভ। কারণ বিটিভিতে ছবিটি যে সময় ধরে চলে তার কিছু অংশ বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দ থাকে। বিভিন্ন কোম্পানি ওই সময়ের জন্য দু’তিন লাখ টাকা করে দিয়ে থাকে। যার একভাগ পায় বিটিভি আর আরেক ভাগ যায় ছবি সরবরাহকারীর পকেটে। এসব ছবি বিটিভিতে সরবরাহের কাজ করত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর অন্যতম সহযোগী জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশাররফ হোসেন ঠাকুর যা বিটিভিতে ওপেন সিক্রেট। এ খাতে মাহবুব গত পাঁচ বছরে আয় করেন ৫২ লাখ টাকা। বিগত পাঁচ বছরে প্যাকেজ অনুষ্ঠান, বাংলা ছায়াছবি ও বিটিভির নিজস্ব অনুষ্ঠান থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন মাহবুব। কলাবাগানের ডলফিন গলিতে রয়েছে তার নিজস্ব পাঁচতলা ভবন।
বিটিভির অপর একটি সূত্র জানায়, মাহবুবুল আলম ২০০২ সাল থেকে গত বছর পর্যন- মিথ্যা পদবি ব্যবহার করে আসছেন। ২০০৬ সালে তিনি উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) পদের চলতি দায়িত্ব পান। কিন’ চলতি দায়িত্ব শব্দটি তিনি ব্যবহার করেন না। এর আগে একটানা চার বছর পরিচালক (অনুষ্ঠান) হয়েও উপ-মহাপরিচালকের (অনুষ্ঠান) মিথ্যা পদবি ব্যবহার করে দিব্বি অফিসিয়াল কাজ চালিয়েছেন। নেমপ্লেটেও তাই ব্যবহার করেছেন। ২০০৫ সালের ২৮ জুন বিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার মোঃ আবু তাহেরকে তার মেধা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার কারণে উপ-মহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। কিন’ পদোন্নতি পাওয়ার পরদিনই মাহবুব হাওয়া ভবনের মাধ্যমে ২৯ জুন ’০৫ তারিখে আবু তাহেরকে জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটে বদলি করান। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন মাহবুবুল আলম। যুগান-রকে তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু সরকারি আদেশ পালন করেন। এর বাইরে তার করার কিছুই নেই। তাই লুটপাট ও অনিয়মের বিষয়টিও ঠিক নয়। পদবির ব্যাপারে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি এ পদে আছেন। তার কাছে কাগজপত্রও আছে। মাহবুবুল আলমের অন্যতম সহযোগী অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ ফরিদুর রহমানও পিছিয়ে নেই এই লুটপাটে। বেইলি রোডের সরকারি বাড়িতে প্রোডাকশন হাউস ভাড়া দিয়ে থাকেন দিলু রোডের দামি ফ্ল্যাটে। বিটিভি ওয়ার্ল্ডের ইনচার্জ হিসেবে তিনি প্রতি মাসে সেখান থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। বহির্দৃশ্যের চিত্রায়নের কথা বলে ক্যামেরা ইউনিট নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। চার দিনের সময় নিয়ে কাটিয়ে দেন সাত দিন। বাকি সময় বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত উন্নয়নমূলক অনুষ্ঠান ধারণ করেন। পরে তা বিটিভিতে প্রচারের ব্যবস্থা করে দেন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট অংকের টাকার বিনিময়ে বিটিভির নিজস্ব অনুষ্ঠানের প্রস-াবনা পাস করিয়ে দেন। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-01

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: