বিমানের সর্বনাশ

মুখ থুবড়ে পড়ছে বিমান। শত চেষ্টা করেও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। লাগামহীন দুর্নীতি, চরম অব্যবস্থাপনা ও ব্যাপক লোকসান প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটি, মাথাভারি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অদক্ষতার কারণে জাতীয় পতাকাবাহী একমাত্র প্রতিষ্ঠানটির সর্বনাশ হতে চলেছে। বিশেষ করে গত ৫ বছরে বাংলাদেশ বিমান কমিশন ভাগাভাগি, দুর্নীতি ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই বিমান ক্রয়-বিক্রয়, লিজ গ্রহণ, লিজের সময় বর্ধিতকরণ, জিএসএ নিয়োগ, যন্ত্রাংশ ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণসহ নানাভাবে শুরু হয় লুটপাট। তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিনের একক সিদ্ধানে- ইন্দোনেশিয়া থেকে দুটি এফ-২৮ ক্রয়ের নামে যে দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে, তার খেসারত বিমানকে বহন করতে হবে বহুদিন। বর্তমানে এই দুটি এফ-২৮ উড়োজাহাজই বিমানের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু কমিশনের ভাগাভাগিতে বনিবনা না হওয়ায় চারটি নতুন এয়ারবাস ক্রয়ের জন্য পাঁচবার আন-র্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও শেষ পর্যন- ক্রয় করা যায়নি। বর্তমানে গড়ে ২০-২৫ বছরের পুরনো আনলাকি থার্টিন (১৩টি) উড়োজাহাজ নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছে বিমান। ১৩টির মধ্যে দুটি ডিসি-১০, দুটি এয়ারবাস ও দুটি এফ-২৮ প্রায় সময়ই অচল হয়ে পড়ে থাকছে। ঘন ঘন ফ্লাইট সিডিউল পরিবর্তন করেও যাত্রীদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। বিমানকে গতিশীল করার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান-ও বাস-বায়ন করেনি কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে রুগ্ন বিমানকে বাঁচাতে একের পর এক আন-র্জাতিক ও অভ্যন-রীণ রুটের ফ্লাইট বন্ধ করা হচ্ছে, একতরফাভাবে ছাঁটাই ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তাতে কি শেষ রক্ষা হবে- এ প্রশ্ন এখন সবার। বিমানের বর্তমান অব্যবস্থা খতিয়ে দেখার জন্য উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধানে-র পরিপ্রেক্ষিতে বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কমিটি বৈঠক করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সুপারিশ তৈরির কাজ শুরু করেছে। তাছাড়া বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর মহলের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যেই বিমানের দুর্নীতি খতিয়ে দেখার জন্য তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরই দুদক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করবে।
গত পাঁচ বছরে বিমান অভ্যন-রীণ ও বৈদেশিক ৫৬টি রুটের মধ্যে ৪৮টিতেই লোকসান দিয়েছে ৫০৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। একইভাবে বিপিসি’র (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) পাওনা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তারা যে কোন সময় জেট ফুয়েল সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। এ অবস্থায় জ্বালানি সংকট দূর ও সাশ্রয়ের জন্য ইতিমধ্যেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আন-র্জাতিক রুটের ঢাকা-নিউইয়র্ক, ঢাকা-ফ্রাংকফুর্ট, ঢাকা-নারিতা, ঢাকা-প্যারিস, ঢাকা-ইয়াঙ্গুন, ঢাকা-এথেন্স, ঢাকা-ব্রাসেলস, ঢাকা-ম্যানচেস্টার, ঢাকা-মুম্বাই ফ্লাইট। একই সঙ্গে অভ্যন-রীণ রুটের ঢাকা-যশোর, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-সৈয়দপুরসহ পাঁচটি রুটের ফ্লাইটও বন্ধ করা হয়েছে। বরিশাল বিমান অফিস গুটিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটানো হয়েছে বিমানের ১৭ বছরের কার্যক্রম। যশোর, সৈয়দপুর অফিসও গুটানোর কাজ চলছে। কোন প্রকার তদন- ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই গত পাঁচ মাসে এমডি’র একক সিদ্ধানে- চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ৮৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। ফলে বিমানের সর্বস-রের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে মারাত্মক অসনে-াষ, ক্ষোভ ও আতংকের সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে তখন বিমানের নিজস্ব চারটি ডিসি-১০, তিনটি এয়ারবাস ও দুটি এটিপি ছিল। এই ৯টি বিমান দিয়েই তখন আন-র্জাতিক ও অভ্যন-রীণ রুটের ফ্লাইট সিডিউল রক্ষা করা হতো। শুধু হজ মৌসুমে এক বা দুটি বড় উড়োজাহাজ ভাড়া এনে হজযাত্রী পরিবহন করা হতো। কিন’ জোট সরকারের শীর্ষ মহল বিমান লিজের কমিশন খাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কোন ধরনের পরিকল্পনা ও রুটম্যাপ ছাড়াই দুটি ডিসি-১০, দুটি বোয়িং ও একটি এয়ারবাস লিজসহ দুটি এটিপি বিক্রি এবং দুটি এফ-২৮ ক্রয়ের ঘটনায় বিমান প্রায় ১৫০ কোটি টাকা দুর্নীতি করে। কোন প্রকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, রুট ম্যানেজমেন্ট ও লাভ-ক্ষতির হিসাব না করেই বিমান কর্তৃপক্ষ একের পর এক উড়োজাহাজ লিজ নিতে থাকে। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসেই ২০০১ সালে বছরে ৬০ কোটি টাকা গচ্চা ও কমিশন ভাগাভাগি করে দুটি ডিসি-১০ লিজ গ্রহণ করে। ওপর মহলের নির্দেশে তিনটির মধ্যে দুটি লিজে আনা এয়ারবাস থেকে হঠাৎ করে একটি ফেরত দেয়ার জন্য ব্যস- হয়ে পড়ে বিমান কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে আরও একটি লিজে আনার জন্যও তৎপর হয় তারা। সরকারের শীর্ষ মহলের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যস্থতায় একটির লিজ ফেরত ও নতুন করে একটি লিজ গ্রহণকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকা কমিশন আদান-প্রদান হয়। সাবেক বিমান প্রতিমন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিনের একগুঁয়েমির কারণে সবার আপত্তি থাকার পরও ইন্দোনেশিয়ার হেইবার্ড কোম্পানি থেকে কেনা হয় দুটি এফ-২৮। এ সময় বিমানের তৎকালীন এমডি’র আপত্তির মুখে তাকে রাতারাতি বদলি করে নতুন এমডি নিয়োগ দেয়া হয়। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে দুটি এফ-২৮ কেনার নামে নির্ধারিত দরের চেয়ে ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। কমিশন হিসেবে লেনদেন হয় আরও কোটি কোটি টাকা। এত কিছুর পরও যে দুটি এফ-২৮ ক্রয় করা হয়, সেগুলোতে অসংখ্য যান্ত্রিক ত্রুটি থাকায় তা খুব বেশি উড়তে পারেনি। বিমানের ইতিহাসে এভাবে দুর্নীতির নজির নেই। একই রকম নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়ে ২০০২ সালের মে মাসে দুটি এটিপি বিক্রির মাধ্যমেও হাতিয়ে নেয়া হয় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। এটিপি দুটি বিক্রির পরও এগুলোর পাইলটদের বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে দেড় কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। অন্য ২২ জন পাইলটের প্রশিক্ষণ খাতে ৫ কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে লুটপাট করা হয়। তাছাড়া বিমান কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের নাম করে ডুপ্লিকেট ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, টিকিট কেলেংকারি ও অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীদের বারবার হোটেলে রাখা ও ঘন ঘন বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য যারা সরাসরি জড়িত আজ পর্যন- সেই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে বিমান কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে পারেনি। মতিঝিল বিমান অফিসের চারটি সেলস অফিসের সাড়ে ৪ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও কর্তৃপক্ষ কাউকেই শাসি- দিতে পারেনি। বিদেশে ১৫টির মধ্যে সাতটি এবং দেশে ১৫০টির মধ্যে ৩২টি এজেন্ট দীর্ঘদিনের ২৫ কোটি টাকা বিলখেলাপি হলেও রহস্যজনক কারণে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না বা কোন শাসি-মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।
বিগত সরকারের শেষ দিকে ২০০৫ সালে তৎকালীন বিমান প্রতিমন্ত্রী অনেকটা হঠাৎ করেই ১৩টি নতুন বিমান কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাথমিক হিসাবে এগুলোর দাম ধরা হয় ৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। প্রস-াবের সঙ্গে বলা হয়, ইউএস এক্সিম ব্যাংক মাত্র ৫ শতাংশ সুদে মোট দামের ৮৫ ভাগ অর্থের যোগান দেবে। এ অর্থ ১২ বছরে পরিশোধ করা হবে। এ সময় ছয়টি বোয়িং ও সাতটি এয়ারবাস কেনার প্রস-াব করা হলেও প্রতিমন্ত্রী, সাবেক অর্থমন্ত্রীর ছেলে নাসের রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাই ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার শামীম এস্কান্দারের মধ্যে কমিশন ভাগাভাগিতে বনিবনা না হওয়ায় এ উদ্যোগ ভেসে- যায় বলে বিমান সংগ্রাম পরিষদের নেতারা অভিযোগ করেন। পরে এ বছরের মার্চ মাসে শুধু চারটি ৭৭৭ বোয়িং ও ছয়টি এয়ারবাস এ-৩৩৩ কেনার জন্য প্রস-াব করা হয়। এই বিমান ক্রয়ের অর্থ যোগান দিতে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি মাত্র চারটি এয়ারবাস কেনার জন্য প্রস-াব পাঠাতে বলেন। সূত্র জানায়, বোয়িং কোম্পানি কোন এজেন্ট ও লবিস্ট ছাড়া সরাসরি উড়োজাহাজ বিক্রি করায় মধ্যস্বত্বভোগীরা বোয়িং ক্রয়ের উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে আসে। এয়ারবাস কোম্পানি এজেন্টের মাধ্যমে উড়োজাহাজ বিক্রি ও লিজ দেয়ায় এই কোম্পানি থেকেই চারটি নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য তৎপর হন প্রতিমন্ত্রী। নতুন এ চারটি এয়ারবাস ক্রয়সহ ড্যাস-৮, এটিআর ও পুরনো দুটি ডিসি-১০ লিজ ও ভাড়ায় আনার জন্য প্রস-াব তৈরি করা হয়। এজন্য পাঁচবার আন-র্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করা হয়। কিন’ অজ্ঞাত কারণে এ বছরের অক্টোবর মাসে মন্ত্রিপরিষদের সভা থেকে প্রস-াবটি ফেরত পাঠানো হয়। আবার প্রস-াব পাঠালে ২৩ ডিসেম্বর তা ফেরত আসে। সূত্র জানায়, এই চারটি ডিসি কেনার সঙ্গে সাবেক অর্থমন্ত্রীর ছেলেকে যুক্ত না করায় প্রস-াবটি পাস করা হয়নি। বর্তমান বিমান বহরে যে ১৩টি উড়োজাহাজ রয়েছে তার মধ্যে পাঁচটি ডিসি-১০ই গড়ে ২৫ বছরের পুরনো। এগুলোতে থার্স্ট রিভার্সার আধুনিকায়ন না করায় আমেরিকা ও ইউরোপে যাতায়াত নিষিদ্ধ হয়েছে। পাঁচটির মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরেই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস অচল থাকার পর একটি ডিসি-১০ ২৫ ফেব্রুয়ারি জেদ্দা গিয়েই বিকল হয়ে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারি অন্য একটি ডিসি-১০ রোমে যাওয়ার পথে দুবাই গিয়ে বিকল হয়ে যায়। চারটি এয়ারবাসের মধ্যে একটি ইঞ্জিন মেরামতের জন্য কয়েক মাস ধরে হ্যাঙ্গারে পড়ে আছে। একটির অবস্থা উড্ডয়ন উপযোগী নয়। আর বাকি চারটি এফ-২৮-এর মধ্যে বিএনপি আমলে কেনা দুটি সারাবছরই কোন না কোন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উড়তে পারছে না। ফলে হারাধনের যে দুটি ডিসি-১০, দুটি এয়ারবাস ও দুটি এফ-২৮ রয়েছে, তা দিয়ে আন-র্জাতিক ও অভ্যন-রীণ কোন সিডিউলই ঠিক রাখা সম্ভব নয়। কারণ এগুলোও যে কোন সময় বিকল হলে এবং নিয়মিত চেকআপের জন্য হ্যাঙ্গারে নেয়া হলে অবস্থা বেসামাল হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ বিমান সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, বিমান অফিসার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ পাইলট এসোসিয়েশনসহ বিমানের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এমডি হিসেবে ড. এমএ মোমেন বিমানে যোগদানের আগে থেকেই বিমানের ধারাবাহিক সমস্যা চলে আসছিল। তেলের বকেয়া পাওনার জন্য বিমানের একদিন ৯ ঘণ্টা ফ্লাইট বন্ধও ছিল। ওভারহোলিংয়ের টাকা না দিতে পারায় ডিসি-১০-এর দুটি ইঞ্জিন বিদেশ থেকে আনা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় সমস্যা সমাধানে বিমানের ১১টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠন করা হয় বাংলাদেশ বিমান সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বিমানের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। এ অবস্থায় গত বছরের জুন ও জুলাই মাসে অর্থাভাবে আটকে যায় বিমান কর্মচারীদের বেতন। সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে ৩০০ কোটি টাকা দেয়ার জন্য জোর দাবি জানান। তাদের ন্যায্য দাবি ও চাপের মুখে বিমানের সংকট কাটানোর জন্য সরকার ওই সময় এককালীন ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ টাকায় বিমানের সংকট কিছুটা হলেও কেটে যায়। এ অবস্থায় বিমানের চারটি জিএমের (মহাব্যবস্থাপক) পদ খালি হয়। তখন যোগ্যতা না থাকার পরও দু’জন জিএম ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যোগ্য ডিজিএমদের পদোন্নতি না দিয়ে শুধু দুই আত্মীয়কে পদোন্নতি দেয়ার আয়োজন চলার সময় বিমান অফিসার্স এসোসিয়েশন ও সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। বিমানকে দুর্নীতিমুক্ত করার শুদ্ধি অভিযান হিসেবে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে বিমানের ১১টি ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে ১০ জনের নাম চূড়ান- করা হয়। বিমানে গত ১০ বছরে অডিটের নামে কোটি কোটি টাকা লোকসান, ডুপ্লিকেট ভাউচারের মাধ্যমে ৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, নানা দুর্নীতি ও লুটপাটের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত ডিজিএম অডিট নুরুস সালাম, চরম জাতীয়তাবাদী হিসেবে চিহ্নিত ডিজিএম এমএ মান্নান, ভারপ্রাপ্ত জিএম বিল্লাল হোসেন, লন্ডনের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী, ডিজিএম আইন শফিকুল ইসলাম, ডিজিএম পিআর মোশারফ হোসেনের নামও ছিল এ তালিকায়। বিমানের দুর্নীতিবাজ, জোট সরকারের সুবিধাভোগী ও দলীয় লোক হিসেবে পরিচিত ১০ জন কর্মকর্তার নাম প্রাথমিক তালিকা হিসেবে প্রতিমন্ত্রী ও এমডির কাছে দেয়া হয়। বলা হয়, এ ১০ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করলেই বিমানের দুর্নীতির সিংহভাগ হ্রাস পাবে। এসব বিষয় নিয়ে তখন অফিসার সমিতির সভাপতি জহিরুল হক ও সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ক্যাপ্টেন এসএম হেলাল প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি তাকে অবহিত করেন এবং প্রতিমন্ত্রীর পরামর্শে বিষয়টি লিখিতভাবে উত্থাপন করা হয়। প্রতিমন্ত্রী অফিসার সমিতি ও সংগ্রাম কমিটির লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে বিমানের এমডিকে নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ পেয়ে এমডি অফিসার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ও সংগ্রাম কমিটির নেতাদের প্রতি দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশের পরও এমডি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অফিসার সমিতির পক্ষ থেকে পদোন্নতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৬ সালের ১৪ মে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। (রিট নম্বর-৪৩৮৬)। এ খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিমান অফিসার সমিতির সভাপতি ও বিএফসিসির ভারপ্রাপ্ত জিএম জহিরুল হককে ওএসডি করা হয়। এতে অফিসাররা ক্ষুব্ধ হয়ে এমডির সঙ্গে দেখা করলে এমডি জানান, ওএসডি হিসেবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগদানের পরই আবার তাকে পদোন্নতি দিয়ে ফিরিয়ে আনা হবে। কিন’ এমডি অফিসার সমিতির সভাপতিকে প্রধান কার্যালয় বলাকায় ফিরিয়ে না এনে সাভারে বিমানের পোলট্রি ফার্মে বদলি, পরে ওএসডি এবং শেষ পর্যন- ৪ ফেব্রুয়ারি চাকরিচ্যুত করেন। গত বছর ১০ অক্টোবর কোন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা না করেই এমডি তার একক ক্ষমতাবলে বিমানের সেনা ও বিমান বাহিনীর চারজন পরিচালক ও দু’জন মহাব্যবস্থাপককে বাধ্যতামূলক অবসর দেন। এমডি তখন সংগ্রাম পরিষদ নেতাদের বোঝান, পর্যায়ক্রমে ও আনুপাতিক হারে পদ ও লোকবল সংকুচিত করে বিমানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হবে। পরিচালকের আটটি পদ কমিয়ে চারটি করা হবে। কিন’ গোপনে এবং কারও সঙ্গে আলোচনা না করে এমডি নিজেই তিনজন জিএমকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দেন এবং প্রশাসন ক্যাডার থেকে একজন পরিচালক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। এ অবস্থায় বিমানের সর্বস-রে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসনে-াষ ছড়িয়ে পড়ে। বিমান কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন- যে ৮৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের কারও বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। এমডির কাছের লোক হিসেবে পরিচিত ও একই এলাকার (বাঞ্ছারামপুর) এবং বিগত জোট সরকারের সময় যারা নানাভাবে সুবিধা ভোগ করেছেন ও একাধিক পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদের আবারও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। সংগ্রাম পরিষদ ও অফিসার সমিতির অভিযোগ, প্রশাসনে জাতীয়তাবাদী ঘরানার লোক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীর খুবই ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ড. এমএ মোমেনকে বিগত জোট সরকার ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি এ পদে যোগদানের পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছোটভাই মেজর (অব.) সাইদ এস্কান্দার, বিমানের ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার শামীম এস্কান্দার, তার শ্যালক শাহেদসহ জাতীয়তাবাদী দল সমর্থক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ইউনিয়ন নেতারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খানের জামাতা সাইফুল ইসলামের মাধ্যমে মেসার্স লজিস্টিক এয়ারের প্রস-াব বিবেচনা করতে গিয়ে তিনি হজের জন্য উড়োজাহাজ ভাড়া নিতে অনিয়ম করেন।
এ ছাড়াও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা, দলীয় আনুগত্য এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় গত বছর বিমান লোকসান দিয়েছে ৫০৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অভ্যন-রীণ ও আন-র্জাতিক ৫৬টি রুটের মধ্যে ৪৭টিই লোকসান দিয়েছে। শুধু ঢাকা-লন্ডন-ঢাকা রুটেই লোকসান দিয়েছে ১৬১ কোটি ৩৩ লাখ, ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে ৯৩ কোটি ১৩ লাখ এবং ঢাকা-রোম রুটে ৮৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তাছাড়া ঢাকা-ব্যাংকক ও নারিতা-ব্যাংকক রুটে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-আবুধাবি-ঢাকা রুটে ১১ কোটি ৭১ লাখ, ঢাকা-আবুধাবি রুটে ৬ কোটি ৫০ লাখ ও ঢাকা-দুবাই-কুয়েত রুটে ৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। অভ্যন-রীণ রুটে ঢাকা-সিলেট রুটে ৩ কোটি ৩১ লাখ, ঢাকা-রাজশাহী-সৈয়দপুর রুটে ৩১ লাখ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ৫৮ লাখ ২১ হাজার টাকা লোকসান হয়। মাত্র আটটি রুটে বিমান মুনাফা করেছে ৪৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা-দিল্লি রুটে ১৬ কোটি ৫৪ লাখ, ঢাকা-হংকং রুটে ৯ কোটি ৯২ লাখ, ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে ৬ কোটি ৭৭ লাখ, ঢাকা-ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর-ঢাকা রুটে ৫ কোটি ৭৬ লাখ, ঢাকা-রিয়াদ-দাম্মাম রুটে ৪ কোটি ৮৩ লাখ, ঢাকা-করাচি রুটে ২ কোটি ৪০ লাখ, ঢাকা-রিয়াদ রুটে ৬৭ লাখ ৪১ হাজার, ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ঢাকা রুটে ৩৯ লাখ টাকা মুনাফা করেছে।
বিমানের বর্তমান বেহাল দশা সম্পর্কে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব মোঃ শহিদ আলম যুগান-রকে বলেন, বিমান পরিচালনা বোর্ডকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে পুনর্গঠনের প্রস-াব দেয়া হবে উপদেষ্টা পরিষদের কাছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনায় এ সংস্থাটি চলতে পারে না। এত পুরনো বিমান দিয়ে আন-র্জাতিক ও অভ্যন-রীণ ফ্লাইট সিডিউল বজায় রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া বিমানকে গতিশীল করার জন্য সেভাবে কোনদিনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন কমিটি সব বিষয় নিয়ে একটি সুপারিশ প্রণয়নের কাজ করছে। আগামী সপ্তাহেই সুপারিশটি উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো হবে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, গত বছরের এপ্রিল মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বিমান সংক্রান- সভার সিদ্ধান-ও আজ পর্যন- বাস-বায়িত হয়নি। সেখানে লোকসানি রুট পর্যায়ক্রমে বন্ধ, পুরনো ডিসি-১০ ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহার, লোকবল হ্রাস ও বিমানের কর্মচারীদের পরিবারসহ বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ বাতিলসহ ইতিবাচক সিদ্ধান- ছিল। কিন’ কেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ সিদ্ধান- তখন বাস-বায়ন করেননি তা তিনি জানাননি। সচিব বলেন, দুর্নীতিতে বিমান আকণ্ঠ নিমজ্জিত। দুর্নীতিবাজদের খুঁজে বের করার কাজ চলছে। সচিব বলেন, বিমানের কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে সমস্যা সমাধান হয়তো করা যাবে না। কিন’ অবশ্যই মাথাভারি প্রশাসন ছোট করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের শাসি- দিতে হবে। এসব দুর্নীতি ও অভিযোগ সম্পর্কে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এমএ মোমেন রোববার যুগান-রকে বলেন, বিমান দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। বিমানের কাছে বিপিসি জ্বালানির দাম হিসেবে যে দেড় হাজার কোটি টাকা পাবে তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪শ’ কোটিই সুদের টাকা। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের এ সুদ পরিশোধ করবে কিনা সেটা সরকারের সিদ্ধানে-র বিষয়। তিনি জানান, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিমানের স্বার্থের পরিপন্থী কাজের সঙ্গে লিপ্ত ছিল তাদেরই বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া চলবে। এ সিদ্ধান- তার নয়, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। তাছাড়া হজের সময় তৎকালীন উপদেষ্টা দুটি উড়োজাহাজ ভাড়া করার জন্য নির্দেশ দেয়া সত্ত্বেও মাত্র একটি উড়োজাহাজ ভাড়া এবং একটি অকেজো ডিসি-১০ মেরামত করে প্রায় ২৮ হাজার হজযাত্রী পরিবহন করা হয়েছে। এখানে তার জড়িত থাকা ও কোন দুর্নীতির প্রশ্নই ওঠে না। যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মেরামতের নামে ঘাটে ঘাটে যেসব দুর্নীতি চলে আসছিল, তা উদঘাটনের জন্য সবরকম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, এমডি হিসেবে যোগদানের পর থেকে গত এক বছরে বিমানে কোন দুর্নীতি হয়নি। কেউ তা প্রমাণ করতে পারবে না। বরং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বর্তমানে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় তারাই নানা মিথ্যা অপবাদ ছড়াচ্ছে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-02

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: