সিদ্ধান্ত নিয়েও র‌্যাংগস ভবন ভাঙা যাচ্ছে না

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এয়ারপোর্ট রোডের বিজয় সরণির পূর্ব দিকে নির্মিত বহুতল র‌্যাংগস ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্ত আদালতে মামলা অনিষ্পন্ন থাকায় রাজউক এ ব্যাপারে কোনোরকম পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ওই বিশাল ভবনটি নির্মিত হওয়ায় বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাসত্মবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
র‌্যাংগস ভবনটিকে কেন্দ্র করে রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট মালিকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রশি টানাটানি চলছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী রাজউক ওই ভবনটির নকশা বাতিল করে। রাজউকের ওই সিদ্ধানেত্মর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মালিক হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। ২০০০ সালের ২ মে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে হাইকোর্ট বিভাগ নকশা বাতিল সংক্রানত্ম রাজউকের সিদ্ধানত্ম অবৈধ
ঘোষণা করে। হাইকোর্ট বিভাগের ওই রায়ের বির”দ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ পিটিশন দাখিল করে রাজউক। আপিল নং ৮২৯/২০০০। আদালত আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণও করে। কিন’ তারপর থেকে এ পর্যনত্ম আপিলটির শুনানি হয়নি।
র‌্যাংগস ভবনকে ঘিরে সৃষ্ট সর্বশেষ পরিস্থিতির ব্যাপারে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য সরকার চার সদস্যবিশিষ্ট তদনত্ম কমিটি গঠন করেছ্‌ে। কমিটির আহ্বায়ক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব( উন্নয়ন)। কমিটিতে সদস্য আছেন স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি, আইন উপদেষ্টা ও রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী। গত ২৭ ফেব্রচ্ছারি এ কমিটি গঠন সংক্রানত্ম অফিস আদেশ জারি করা হয়। পরবর্তী তিন কর্মদিবসের মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য সরকার কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা যায়।
রাজউক সূত্রে জানা যায়, ডিয়ার্স ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ চৌধুরী ১৯৮৮ সালের ৫ ডিসেম্বর এয়ারপোর্ট রোডের পূর্ব দিকে ১৫৯ নং সিএস প্লট ও ৫২ (অংশ) এ একটি ১০ তলা শপিং কাম অফিস ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে নকশা অনুমোদনের উদ্দেশে আবেদন জানান। ১৯৮৯ সালের ৬ জুলাই রাজউক নকশা অনুমোদন করে। অনুমোদন নং ৩সি-২৪৮- ৮৯। পরবর্তীকালে আব্দুর রউফ চৌধুরী ও সুলতানা আক্তার খান মজলিশ ওই একই জায়গায় ২২ তলা বিশিষ্ট শপিং কাম অফিস ভবন নির্মাণের উদ্দেশে নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন জানান ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি। ওই বছরের ১৫ মে সংশোধিত নকশা অনুমোদন করে রাজউক। অনুমোদন নং- আর ৩ সি -৩২-৯০। কিন’ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না করায় রাজউক আবেদনকারীকে ১৯৯১ সালে কয়েক দফা নোটিশ দেয়। তা সত্ত্বেও আবেদনকারী কোনো ব্যবস্থা নেননি। এ কারণে রাজউক ১৯৯১ সালের ২৯ জুলাই ভবনটির নকশার অনুমোদন বাতিল করে। নকশা বাতিল করা সত্ত্বেও আবেদনকারী ভবনটির নির্মাণ কাজ বহাল রাখেন।
বিজয় সরণি হয়ে তেজগাঁও পর্যনত্ম যদি একটি সংযোগ সড়ক থাকতো, তাহলে মিরপুর, মোহাম্মদপুর থেকে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ হয়ে দূরপাল্লার যানবাহন ওই পথ ধরে চলাচল করতে পারতো। ফলে যানজট অনেকখানি কম হোত। সে লক্ষ্যে বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। কিন’ সামরিক শাসক এরশাদ সংশ্লিষ্ট সকল মহলের বিরোধিতা উপেক্ষা করে বিজয় সরণির পূর্ব দিকে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেন। পরিণতিতে ওই সংযোগ সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।
জানা যায়, বিমানের ওঠানামার স্বার্থে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, আনত্মর্জাতিক বিমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও ওই স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণের বিরোধিতা করে, এমনকি ওই ভবন ভেঙে ফেলার জন্য সরকারের ওপর বিভিন্ন সময় চাপও সৃষ্টি কর্‌ে। কিন’ ওই ভবনের মালিকের হাত বিভিন্ন সরকার তো বটেই সর্বোচ্চ আদালত পর্যনত্ম প্রশসত্ম ছিল। সে কারণে নকশা বাতিলের সিদ্ধানেত্মর ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা পেতে এবং সরকারকে নিষ্ক্রিয় রাখতে তার তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়্‌।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ জুলাই ভবনটির নকশা বাতিল করার পর তদানীনত্মন পূর্তমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম মিয়ার কার্যালয়ে এ বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গঠন করা হয় দু’ সদস্যবিশিষ্ট তদনত্ম কমিট্‌ি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্মিত ভবনটি ভেঙে ফেলা অত্যনত্ম ব্যয়সাপেক্ষ। প্রতিবেদনে ভবনটির ভূমি ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করা হয়। মন্ত্রী ওই সুপারিশ গ্রহণ করেন এবং সংশোধিত নকশা অনুমোদনের নির্দেশ দেন। ১৯৯৩ সালের ৮ ফেব্রচ্ছারি কতিপয় শর্তসাপেক্ষে ওই স্থানে ২২ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্দেশে সংশোধিত নকশা অনমোদন করা হয়। কেউ কেউ ওই ভবনটিকে অক্ষুণ্ন রেখে তার দুই পাশ দিয়ে দুটি রাসত্মা তৈরি করে প্রসত্মাবিত সংযোগ সড়ক নির্মাণের সুপারিশ করেন। আবার কেউ কেউ ওই ভবন হুকুম দখল করে ভেঙে ফেলে সংযোগ সড়ক নির্মাণের অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেন। কিন’ আখেরে কোনো সুপারিশই বাসত্মবায়িত হয়নি।
সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জানায়, নির্মাণাধীন র‌্যাংগস ভবনটি তেজগাঁও বিমান বন্দরের খুব কাছে। তেজগাঁও বিমানবন্দর সব সময়ই ছোটখাটো বিমান ওঠানামার জন্য ব্যবহৃত হয়। যে কোনো সময় জর”রি প্রয়োজনে বৃহদাকৃতির বিমান ওঠানামার জন্যও তেজগাঁও বিমানবন্দর ব্যবহারের দরকার হতে পার্‌ে। বিমান ওঠানামার নিরাপত্তার জন্য বিমানবন্দরের কাছে এতো উঁচু ভবন থাকা কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয় বলে কারণ দেখানো হয়। এ কারণে সিভিল এভিয়েশন র”ল -৮৪ অনুযায়ী বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিমান বাহিনীর কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়া অপরিহার্য। যদি ওই স্থানে কোনো ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়, তাহলে তা বাতিল করার জন্য রাজউক তথা সরকারকে অনুরোধ করা হয়। এই একই সময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিধি অনুযায়ী সেখানে ৬০ ফুটের বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ উচিত নয়। ভবনের মালিককে এ বিষয়ে অবহিত করা হয় এবং ৬ তলার ঊর্ধ্বে ভবন নির্মাণ না করার জন্য বারবার নোটিশও দেওয়া হয়। কিনত্ম ভবনের মালিক রাজউকের এ ধরনের নোটিশের প্রতি কর্ণপাত করেননি। এ কারণে রাজউক ১৯৯৯ সালের ২৪ জুন ওই ভবনের নকশার অনুমোদন বাতিল করে। ওই বাতিল আদেশের বির”দ্ধে ভবনের মালিক হাই কোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে। পিটিশন নং ৩৮০৩/১৯৯৯।
২০০০ সালের ২ মে ওই রিট পিটিশনের ওপর আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত নকশা বাতিল সংক্রানত্ম রাজউকের সিদ্ধানত্ম অবৈধ ঘোষণা করে। হাইকোর্ট বিভাগের ওই রায়ের বির”দ্ধে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ পিটিশন দাখিল করে। আপিল নং -৮২৯/২০০০। আদালত আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করে। কিন’ এখনো আপিলটির শুনানি অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় রয়েছে । ওই তদনত্ম কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে শুনানি অনুষ্ঠানের জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়।
মালিক পক্ষের বক্তব্য : র‌্যাংগস ভবনের অন্যতম মালিক সুলতানা আক্তার খান মজলিশ ও তার স্বামী ডা. এম এ খান মজলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, জমি এবং ভবন উভয়ই তাদের বৈধ সম্পত্তি। ভবন ভাঙার আগে তাদের কাগজপত্র খতিয়ে দেখার জন্য তারা সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। Source:ভোরের কাগজ
Date:2007-03-03

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: