জুনের মধ্যে নির্বাচন চান শেখ হাসিনা

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, আশা করি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। শেখ হাসিনা সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বলেন, আন্দোলনের ফসল বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কোন কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যর্থ হলে দায় আমাদের ওপর বর্তাবে। তিনি বলেন, তখন জনগণ তাদের অভিযুক্ত করবে, বিএনপিও দোষ দেবে। শনিবার সকালে ধানমণ্ডির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির সভার শুরুতে শেখ হাসিনা প্রারম্ভিক বক্তৃতায় এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণের আকাঙ্ক্ষা। ৭ সপ্তাহ চলে গেছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কার্যক্রম শুরু করা উচিত। তিনি সারাদেশে ভোটার তালিকা তৈরির সঙ্গে অন-ত ৬ বিভাগীয় শহরে ছবিসহ ভোটার তালিকা করে দৃষ্টান- স্থাপন করার প্রস-াব করেন। দু’দিক স্বচ্ছ বড় ব্যালট বাক্স (মেশিন ট্যুলস ফ্যাক্টরি দিয়ে) তৈরির উদ্যোগ এখনই নেয়া উচিত। তিনি বলেন, এসব কাজ করা উচিত যাতে মানুষ মনে করে দেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রক্রিয়া শুরু হলে মানুষ আশাবাদী হবে। দলের উপদেষ্টা পরিষদ সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জুনের মধ্যে নির্বাচন দাবি করেছে বলে শেখ হাসিনা জানান। দুপুরে নামাজ ও খাবারের বিরতি দিয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন- বৈঠক চলে। আজ বেলা ১১টা পর্যন- বৈঠক মুলতবি করা হয়।
সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, তার সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় প্রথম উদ্যোগ নেয় এবং অনেক কাজ করে। শেখ হাসিনা দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের মতো দ্রুত পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুনর্গঠনেরও দাবি জানান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় যুগের প্রয়োজনে দলের সংস্কার করেছে। সামনেও করবে। বাজেট থেকে শুরু করে প্রতি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা রয়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন- নেতাকর্মীদের টাকায় দল চলে। ‘নিজের খেয়ে নৌকা’- এই নীতিতে বিশ্বাসী মানুষ আওয়ামী লীগ করে। তিনি বলেন, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও আন-র্জাতিক পরিমণ্ডল বিবেচনা করে সংগঠনে পরিবর্তন আনা হয়। তৈরি হয় নতুন ঘোষণাপত্র। তিনি বলেন, দলের ৭৪টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মাত্র ৯ জেলায় সম্মেলন বাকি আছে। নির্বাচনের জন্য জাতীয় কাউন্সিলের সময় এক বছর বাড়ানো হয়েছিল। জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার হলে ৯ জেলার সম্মেলন শেষ করে জাতীয় কাউন্সিল হবে। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হয়েছে। কোথাও সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে কোথাও বা সমঝোতার মাধ্যমে কমিটি গঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলের ৫টি বছর তার দলের নেতাকর্মীদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালানো হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানের নামে হত্যার পাশাপাশি শত শত মিথ্যা মামলায় নেতাকর্মীদের ঘরছাড়া করা হয়েছে। এত নির্যাতন সহ্য করেও সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে কর্মীরা। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে অনুরোধ জানান, যারা বিগত ৫ বছরে হত্যা-নির্যাতন করেছে, তদনে-র মাধ্যমে তাদের বিচার করা হোক। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ২১ আগস্ট তার ওপর পরিচালিত গ্রেনেড হামলা, সারাদেশে ১৭ আগস্টের বোমা হামলা, চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান, বগুড়ায় উদ্ধার করা গুলি-হীরা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া ও সাবেক সাংসদ আহসানউল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যা, বোমা হামলার আন-র্জাতিক তদন- দাবি করা হয়েছিল। তখন বিএনপি জোট সরকার আন-র্জাতিক তদন- করেনি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এসব নৃশংস ঘটনার আন-র্জাতিক তদনে-র ব্যবস্থা তত্ত্বাবধায়ক সরকার করবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতকে কেন ধরা হচ্ছে না- এই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জামায়াতের ১৮ জন সাবেক এমপির মধ্যে ১ জনের নাম তালিকায় এসেছে! জামায়াত এমপিদের মধ্যে এমন একজন রয়েছেন যিনি সদরঘাটে তাবিজ বিক্রি করতেন। পরে এমপি হয়ে হোটেল শেরাটনে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করেন। ২০০১ সালে ওরা কি ছিল, এখন কেমন বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছে তা তদন- করে বের করার দাবি জানান শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেন, বিগত জোট সরকার সাজানো নির্বাচনের রিহার্সাল করতে চেয়েছিল। জনতার আন্দোলনের মুখে তারা ব্যর্থ হয়। গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তিনি প্রতিদিন দ্রব্যমূল্য বাড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এজন্য জোট সরকারের রেখে যাওয়া সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ওরা এমন সিন্ডিকেট রেখে গেছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তিনি এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি দাবি জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের আর্থ-সামাজিক মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছে। স্বাধীনতার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন’ এখনও টিভিতে দেখা যায় ইতিহাস বিকৃতি চলছে। যারা দল ছেড়ে চলে গেছে তারা বলছে, মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ভূমিকা নাকি বেশি ছিল। ছাত্রলীগ ছিল মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগামী টিম। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে সব কর্মকাণ্ড। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে। হঠাৎ করে কেউ ঘোষণা দিল আর স্বাধীনতা এলো- এটা মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। গতকালের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী, আবদুল মান্নান, মাহমুদুর রহমান মান্না ও দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান বক্তব্য রাখেন। বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রয়োজনে ওয়ার্কিং কমিটির সভা আরও দু’দিন চলবে। তবু তিনি সবার বক্তব্য শোনবেন। সূত্র জানায়, গতকাল প্রায় সব বক্তাই খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মতিয়া চৌধুরী দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে কথা বললেও সাবের হোসেন চৌধুরী দলে সম্মিলিত সিদ্ধান- গ্রহণ, নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, সম্মিলিত সিদ্ধান- না হওয়ায় একেক নেতা একেক ধরনের কথা বলেন। যৌথ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান- গ্রহণ হলে এমনটি হতো না। তিনি বলেন, আগে সিদ্ধান- নিতে হবে জুনের মধ্যে নির্বাচন আওয়ামী লীগ চায় কিনা। জনগণ চায় কিনা। জনগণের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে হবে। সিদ্ধান- গ্রহণে সুদূরপ্রসারী ও লক্ষ্য স্থির করতে হবে। সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, অনেকে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে এক চোখে দেখেন। কাজের মধ্য দিয়ে বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের পার্থক্য প্রমাণ করতে হবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান- গ্রহণ করা হলে খেলাফত মজলিসের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিতর্ক উঠত না। আবদুল মান্নান দলের নেতাকর্মী কোথায় কে গ্রেফতার হয়েছেন তার রিপোর্ট দেন। জানা যায়, দলের গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র ও অর্থনৈতিক নীতি সংশোধন, পরিমার্জন-পরিবর্ধনে তিনটি কমিটি গঠনেরও প্রস-াব আসে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-04

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: