২ ৠাব সদস্য খুনের কিনারা হয়নি একটি ট্রলারে পাওয়া গেছে মোবাইল ফোন মুরগির মাংস ভাত নোটবুক

সাভারের আমিন বাজার এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দুই ৠাব সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাটি এখনো রহস্যে ঢাকা রয়ে গেছে৷ ৠাব, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে রিপোর্ট দিতে পারেনি৷ ঘটনা-স্থলের আশপাশ থেকে ২৫-৩০ জনকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ চললেও গতরাত পর্যন্ত কিলার গ্রুপের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি৷ নদীর ঘাটে বাধা একটি ট্রলারে পাওয়া গেছে মোবাইল ফোন, মুরগির মাংস, ভাত, নোটবুক, গুলির খোসা, কাপড়-চোপড়সহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত৷ কিলাররা এ ইঞ্জিনচালিত ট্রলারটি ব্যবহার করেছিল বলে মনে করছে গোয়েন্দারা৷ অন্য দিকে যে বৃক ফিল্ডের টিনশেডে লাশ পাওয়া গেছে তার মালিকপুত্র ফয়সালের ব্যাপারে পুলিশের সন্দেহ জোরদার হচ্ছে৷ ৠাব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের মোবাইল ফোনের কল লিস্টে রয়েছে তার নাম্বার৷ ফয়সাল তাদের ডেকে নিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা৷ ফয়সালকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানালেও ৠাব কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি৷
অন্যদিকে নিহতদের নির্জন বৃক ফিল্ডে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েও রয়েছে নানামত৷ তারা কেন নিরস্ত্র অবস্থায় ওই স্থানে গিয়েছিল তা জানতে পারলে হত্যার মোটিভ ও কিলার গ্রুপকে শনাক্ত করা সহজ হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা৷
ৠাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহত দু’জন ৠাব-১১-এর গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য হিসেবে সন্ত্রাসীদের খোজখবর নিতেই সেখানে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু এলাকাবাসীর রয়েছে ভিন্নমত৷ তারা বলছেন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ নয়, অন্য কোনো কাজে তারা সেখানে গিয়েছিলেন৷ মাঝে-মধ্যেই এ দু’জনকে ঘটনাস্থলের আশপাশে দেখা গেছে৷ তারা সন্ত্রাসী ও বৃক ফিল্ড মালিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন৷ তবে স্থানীয়রা এ দু’জনকে ৠাবের সোর্স হিসেবেই মনে করতেন৷ ঘটনাস্থলের আশপাশের বাসিন্দারা নিহতদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে ভয়ে চুপসে গেছেন৷ অহেতুক হয়রানি এড়াতে তারা এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না৷ গ্রেফতার আতঙ্কে অনেক যুবক এলাকা ত্যাগ করেছে৷ এদিকে ঘটনার পরপরই শনিরবার রাতে আটক দু’শতাধিক গ্রামবাসী ও ইটভাটির শ্রমিকদের মধ্যে ২৫-৩০ জনকে রেখে অন্যদের মুক্তি দেয়া হয়েছে৷ তবে এ পর্যন্ত কিলার গ্রুপের কোনো সদস্যকে গ্রেফতার করা যায়নি৷
পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ গতকাল বলেছেন, কিলার গ্রুপ শনাক্তে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে৷ দ্রুত সফলতা আসবে বলে তিনি আশাবাদী৷
ৠাবের মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার মাশুক হাসান আহমেদ জানান, খুনিদের গ্রেফতারে ৠাব কঠোর অবস্থানে৷ যে কোনো মূল্যে তাদের গ্রেফতার করা হবে৷ ইতিমধ্যে পাওয়া কিছু তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে৷
ৠাবের দুই সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাভার থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে৷ মামলার বাদী থানার এসআই নাসিম উদ্দিন৷ এ মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি৷ মামলাটি তদন্ত করছেন ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর আক্তারুজ্জামান৷ তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মামলায় এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি৷ তবে ২৬ জনকে আটক করে ৠাব জিজ্ঞাসাবাদ করছে৷ যে ইটভাটিতে লাশ পাওয়া গেছে সেই বৃক ফিল্ডের মালিক তাজুল ইসলাম ওরফে তারা মিয়া, তার ছেলে ফয়সাল ও ম্যানেজার মহসিনকে আটক করা হয়েছে বলে শোনা গেলেও ৠাবের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন৷
অন্যদিকে গতকাল রবিবার পুলিশ ইটভাটির অদূরে নদী থেকে হত্যাকারীদের ব্যবহূত ইঞ্জিনচালিত ট্রলার উদ্ধার করেছে৷ ট্রলারটি বাধা ছিল নদীর ঘাটেই৷ সেটি তল্লাশি করে নিহত ৠাব সদস্য ফুল মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ কয়েকজনের কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য জিনিস পাওয়া গেছে৷ ট্রলারে পাওয়া দুটি ব্যবহৃত গুলির খোসা, নোটবুক, ভাত, মুরগির কাচা মাংসসহ জব্দকৃত জিনিসগুলো হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্লুর সন্ধান দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন৷ পুলিশ সেগুলো আলামত হিসেবে গ্রহণ করেছে৷ কিলাররা ট্রলারে বসে দুপুরে খাবারের আয়োজনকালেই হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে এবং দ্রুত কিলিং মিশন শেষ করে তারা পালিয়ে যায় বলে মনে করা হচ্ছে৷
রাজধানীর উপকণ্ঠ আমিন বাজারের সালেপুর বৃজের পাশ দিয়ে দেড় কিলোমিটারের মতো ভেতরে গেলে ফাকা মাঠের মধ্যে টিবিসি ইটভাটি৷ এখানেই শনিবার খুন হয়েছেন ৠাব-১১-এর উপসহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবির ও কনস্টেবল ফুল মিয়া৷ এলাকাটি এখন শোক আর মানব শূন্যতায় নিস্তব্ধ৷ বৃক ফিল্ড শ্রমিকদের জন্য বানানো ছাপড়া ঘরে এখনো রয়েছে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ৷
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে অবস্থিত বৃক ফিল্ড মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে৷ তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে৷ হত্যার মোটিভ ও খুনিদের ব্যাপারে ধারণা সংগ্রহকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে৷ ঘটনাস্থলের পাশে অবস্থিত বৃক ফিল্ডের মালিক আবু সাঈদ জানিয়েছেন, মাত্র কয়েকদিন আগেও স্থানীয় সন্ত্রাসী আনোয়ারের লোকজন ৫০ হাজার টাকা চাদা নিয়েছে৷ চাদার টাকা না দিলে ভাটি চালাতে দেয় না৷ এ বিষয় নিয়ে দুই-তিনদিন আগে টিবিসি ইটভাটির মালিক তাজুল ইসলাম ওরফে তারা মিয়ার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল৷ তার বৃক ফিল্ডে সন্ত্রাসীরা ঝামেলা করে না৷ সে সময় তারা মিয়া বলেছিলেন, ৠাব, পুলিশ, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসী সবাইকেই ম্যানেজ করে চলতে হয়৷ আলোচিত টিবিসি বৃক ফিল্ডের মালিক তারা মিয়ার বাড়ি বগুড়ায়৷ নিহত কনস্টেবল ফুল মিয়ার বাড়িও বগুড়ায়৷ তাদের মাঝে আগে থেকে সম্পর্ক ছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা গোয়েন্দাদের বলেছেন৷ টিবিসি বৃক ফিল্ড সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের আড্ডাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে৷ বৃক ফিল্ডগুলোতে পোশাকি পুলিশ ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা নিয়মিত আসতো এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে আলাপ করতো বলে কেউ কেউ জানিয়েছেন৷ তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন৷ তবে গতরাত পর্যন্ত কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান না মেলায় তদন্ত কাজে অগ্রগতি আসেনি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন৷
আমাদের সাভার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, টিবিসি নামে যে বৃক ফিল্ডে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার মালিক হাজী তাজুল ইসলাম, পুত্র ফয়সাল ও ম্যানেজার মহসিনকে শনিবার রাতেই যৌথ বাহিনী আটক করেছে৷ বিভিন্ন সূত্রে এ সংবাদ জানা গেছে৷ আটক শ্রমিকদের মধ্যে নুরুল ইসলাম ও সালে আহমেদ নামে দু’জনকে পুলিশ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছে৷ আরো ২০-২৫ জনকে ৠাব কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে৷ গ্রেফতার আতঙ্কে আমিন বাজার এলাকার বহু যুবক ভিটে-মাটি ফেলে পালিয়েছে৷
দাফন সম্পন্ন
নিহত ৠাব কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির নৌবাহিনীর চিফ পেটি অফিসার৷ তিনি ২০০৬ সালে ৠাব-১১-এর গোয়েন্দা বিভাগে উপসহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন৷ তার পিতার নাম ওমর আলী৷ বরিশাল বাবুগঞ্জের চাদপাশা ইউনিয়নের বকশিচরে তার গ্রামের বাড়ি৷
কনস্টেবল ফুল মিয়ার বাড়ি বগুড়া সোনাতলার বেলুরপাড়া ইউনিয়নের হলিদাবাদ গ্রামে৷ তার পিতার নাম মুনছের আলী ব্যাপারী৷ শনিবার রাতে নিহতদের লাশের পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হয়৷ গতকাল দুপুরে ৠাব হেড কোয়ার্টার্সে জানাজা শেষে লাশ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়৷ সেখানেই তাদের দাফন করা হয়েছে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে৷
সূত্রঃ http://www.jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=31354&issue=241&nav_id=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: