আটক ১৯ নেতার বিরম্নদ্ধে আজকের মধ্যেই মামলা

দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ১৪ শীর্ষ নেতাসহ মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে আজ মঙ্গলবারের মধ্যে নিয়মিত মামলা করা হবে। গতকাল সোমবার তাদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই তিনজন হচ্ছেন বিএনপি নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উলস্নাহ আমান ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাদী হয়ে তাদের বিরম্নদ্ধে মামলা দায়ের করে। তবে আমানউলস্নাহ আমান ও তার স্ত্রী সাবেরা আমানকে এবং মীর মোঃ নাসির উদ্দিন ও তার ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিনকে মামলার এজাহারে আসামি হিসেবে উলেস্নখ করা হয়েছে। এতে মোট আসামী ৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এদিকে গতকাল মহানগর দায়রা জজ আদালত বিএনপি’র গ্রেফতারকৃত ১০ নেতার জামিনের আবেদন না-মঞ্জুর করে। গত ৪ ফেব্রম্নয়ারি ও আগের দিন রাতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ১৪ নেতাসহ মোট ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে এক মাসের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তাদের আটকাদেশের মেয়াদও শেষ পর্যায়। এ কারণে গঠিত টাস্কফোর্স ১৯ জনের বিরম্নদ্ধে দুর্নীতিসহ আনীত অভিযোগ তদনত্ম সম্পন্ন করে মামলা দায়ের করার সিদ্ধানত্ম নেয়। এই সিদ্ধানত্ম অনুযায়ী দুদক গতকাল থেকে ১৯ জনের বিরম্নদ্ধে মামলা দায়ের শুরম্ন করে এবং আজকের মধ্যে মামলা দায়ের করার কাজ সম্পন্ন করবে বলে এক কর্মকর্তা জানান। গ্রেফতারকৃত বাকিদের কিংবা যারা তালিকাভুক্ত কিন্তু গ্রেফতার হয়নি, তাদের বিরম্নদ্ধে আনীত দুর্নীতির অভিযোগের তদনত্মও শেষ পর্যায়। প্রমাণিত অভিযুক্তদের বিরম্নদ্ধে অনুরূপভাবে মামলা দায়ের করা হবে। ১৯ জন হচ্ছেনঃ বিএনপি নেতা ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উলস্নাহ আমান, মীর মোঃ নাসিরউদ্দিন, সাবেক অর্থ মন্ত্রীর ছেলে মোঃ নাসের রহমান, সাবেক এমপি মঞ্জুরম্নল আহসান মুন্সি, সাবেক এমপি আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া, সিবিএ নেতা ফিরোজ মিয়া ও বিএনপি’র নেতা হাজী শোয়েব সাঈদ ডিকন। আওয়ামী লীগের নেতারা হচ্ছেনঃ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সালমান এফ রহমান, সাবেক এমপি লোটাস কামাল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একানত্ম সচিব ডঃ আওলাদ হোসেন, আলোচিত ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ডাঃ জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু, ডাকসুর সাবেক সদস্য আবদুর রাজ্জাক ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ হাসান বাবুল।

কমিশন সূত্র জানায়, অর্থ ও সম্পত্তির তথ্য গোপন এবং জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত সম্পত্তি দখলসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে পাঁচজনের বিরম্নদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তালিকাভুক্ত ৫০ জনের তিনজনসহ পাঁচজনকে আসামী করে গতকাল সোমবার গুলশান থানায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। তাদের দেয় হিসাবের বিবরণীর সঙ্গে অনুসন্ধানকৃত হিসাবের গরমিল পাওয়া গেছে। এছাড়া জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান রিপোর্ট অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান আলমগীর এক কোটি ১৭ লাখ টাকা, মীর নাসির ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার বেশি এবং আমান উলস্নাহ আমান ৮ কোটি ২৮ লাখেরও বেশি টাকার তথ্য গোপন রেখেছেন। এর মধ্যে আমান উলস্নাহ ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী সাবেরা আমান ৫কোটি ৯৩ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। এসব গরমিলের কারণে জরম্নরি অধ্যাদেশ ২০০৭ এর ১৫(ঘ) এর ২ ও ৫ উপধারা এবং কমিশন আইনের ২৬ (১) ও ২৭ ধারা অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া ১৯৪৭ সালের কয়েকটি ধারায় আমান উলস্নাহ আমান ও তার স্ত্রীর বিরম্নদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মহিউদ্দিন খান আলমগীরের বিরম্নদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদনত্ম করবেন কমিশনের উপ-পরিচালক জীবন কৃষ্ণ রায়, মীর নাসির ও তার ছেলের বিরম্নদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদনত্ম করবেন কমিশনের উপ-পরিচালক শারমিন ফেরদৌস এবং আমান উলস্নাহ আমান ও তার স্ত্রীর বিরম্নদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তদনত্ম করবেন কমিশনের উপ-পরিচালক আব্দুলস্নাহ আল জাহিদ।

দুদক আরো জানায়, প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে বাড়ি, গাড়ি, স্ত্রী ও ছেলের নামে রাখা এফডিআর অর্থের হিসাব করা হয়েছে। মীর নাসিরের ছেলে ব্যারিস্টার হেলাল উদ্দিনের নামে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৬ নম্বর রোডে ল্যাভেন্ডার এ-১ ফ্ল্যাটটির মূল্য দেখানো হয়েছে ২০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এতে প্রায় ১৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে। এছাড়া মিৎসুবিসি গাড়ির মূল্য ১৩ লাখ টাকা দেখানো হলেও বিআরটিএ’র মতে এর মূল্য হবে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গত ২৫ ফেব্রম্নয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে মীর নাছিরের দেয়া হিসাব অনুযায়ী নিজের নামে ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সম্পত্তির কথা জানিয়েছেন। এছাড়া মৃত স্ত্রী ডালিয়া নাজনীনের নামে আছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ টাকার সম্পত্তি, ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিনের নামে ৯ কোটি ৭৭ লাখ, মেয়ে ইসরাত জাহানের নামে ৮ কোটি ৭০ লাখ ও ছেলের বৌ নওশীন আরজান হেলালের কাছে ৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পত্তি আছে। এছাড়া তার নামে আড়াই কোটি টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিটও (এফডিআর) রয়েছে। সব মিলিয়ে তার ও পরিবারের সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৪৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউলস্নাহ আমানের দেয়া হিসাব অনুযায়ী নিজের নামে গুলশানের ২১ নম্বর সড়কে সাড়ে ছয় কাঠার পস্নট, মানিকগঞ্জে ১০৭ শতাংশ, কেরানীগঞ্জে ২৯ শতাংশ জমি এবং কেরানীগঞ্জে চার একর ৭৬ শতাংশ জমির ওপর পৈতৃক বাড়ি আছে। গুলশানের পূবালী ব্যাংকের তিনটি একাউন্টে যথাক্রমে ৯ হাজার ৪৩৪ টাকা, ১ লাখ ৭ হাজার ১৭২ টাকা ও ৯০০ টাকা রয়েছে। গুলশানের আইএফআইসি ব্যাংকে এক লাখ ২১ হাজার ৫৭৯ টাকা, ধানমন্ডির সোনালী ব্যাংকে এক লাখ ১৮ হাজার ২৫১ টাকা ও গুলশানের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ৫০ হাজার টাকা জমা আছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া কেরানীগঞ্জের হযরতপুরে কৃষি ব্যাংক ও গ্রামীণ ব্যাংকে জমা রয়েছে যথাক্রমে এক লাখ ১৮ হাজার ২৫১ টাকা ও ১৮ হাজার টাকা। দেড় লাখ ও ২০ হাজার টাকার দু’টি সঞ্চয়পত্রও আছে তার নামে। এছাড়া হাতে আছে নগদ টাকা ৫০ হাজার, ৩০ ভরি সোনা ও আসবাবপত্র। আমানউলস্নাহ আমানের স্ত্রী সাবেরা আমানের নামে মনিপুরীপাড়ায় ১০ কাঠা জমির ওপর একটি ৬ তলা বাড়ি, বনানীতে সাড়ে তিন কাঠা জমির ওপর একটি ৩ তলা বাড়ি, কেরানীগঞ্জের হযরতপুরে ৫ একর ২১ দশমিক ৭ শতাংশ জমি ও ১০ শতাংশ জায়গার ওপর ভবন, চর আলগীতে ৬ একর ৬০ শতাংশ, সাভারের বলিয়ারপুরে দু’টি পস্নটে ১১ একর ১ দশমিক ২৫ শতাংশ ও ১ একর ৬১ শতাংশ জমি, কেরানীগঞ্জের বিসিক শিল্পনগরীতে ১২০০ বর্গফুট জমির ওপর এসএ ফুড প্রডাক্ট ও ৬০০০ বর্গফুট জমির ওপর একটি পানি বিশুদ্ধকরণ পস্নান্ট, একটি টয়োটা গাড়ি ও ৩০ ভরি স্বর্ণালংকার আছে।

১০ জনের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর

আমাদের কোট রিপোর্টার জানান, জননিরাপত্তা বিঘ্ন, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস ও মজুতদারিসহ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে যৌথবাহিনী কর্তৃক ৫৪ ধারায় আটক বিএনপি’র সাবেক মন্ত্রী, এমপিসহ ১০ জনের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে। গতকাল সোমবার শুনানি শেষে মহানগর দায়রা জজ মোঃ মমিনউলস্নাহ এ আদেশ প্রদান করেন। যাদের জামিন নাকচ করা হয়েছে তারা হলেন: সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সাবেক বিমান প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউলস্নাহ আমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, রাজনৈতিক সচিব মোসাদ্দেক আলী ফালু, সাবেক এমপি মনজুরম্নল আহসান মুন্সি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান টুকু, সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের পুত্র এম নাছের রহমান, হাওয়া ভবনের মালিক ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি আলী আজগর লবী ও টিএন্ডটির সিবিএ নেতা মোঃ ফিরোজ মিয়া। উলেস্নখ্য, উলেস্নখিত ব্যক্তিদের ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে গত ৪ ফেব্রম্নয়ারি যৌথবাহিনী গ্রেফতার করে ৫ ফেব্রম্নয়ারি ঢাকার সিএমএম কোর্টে হাজির করলে কোর্ট তাদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। এদের প্রত্যেককেই বিশেষ ড়্গমতা আইনে ৩০ দিনের আটকাদেশ দেয়া হয়েছিল। Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-03-06

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: