৬ শীর্ষ জঙ্গির প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ

জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) শীর্ষ ছয় জঙ্গির প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। সোমবার রাতে এ সংক্রান্ত আদেশ বঙ্গভবন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, ইফতেখার আল মামুন, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ ও আবদুল আউয়ালের ফাঁসি কার্যকরে আর কোন বাধা থাকল না। ডিআইজি প্রিজন মেজর শামছুল হায়দার সিদ্দিকী জানান, রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করার চিঠি এখনও কারাগারে পৌঁছেনি। পৌঁছানোর ২১ দিনের পর থেকে ২৮ দিনের মধ্যে যে কোন দিন জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর হবে।
কারাগারের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, গত ২৯ জানুয়ারি কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ৬ জঙ্গি নেতা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন জানায়। আজকালের মধ্যে প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচের সিদ্ধান্ত কারাগারে পৌঁছবে বলে জানা গেছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২৭ মার্চ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর হবে। এদের মধ্যে আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল ঢাকা, শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই ও মামুন কাশিমপুর এবং খালেদ সাইফুল্লাহ রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে রয়েছে।

২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠি আদালত প্রাঙ্গণে বোমা হামলায় নিহত হন সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহমেদ। ওই ঘটনায় গত ৩১ আগস্ট শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, মামুন ও আরিফের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। পরে উচ্চ আদালত ওই ফাঁসির রায় বহাল রাখেন। নিরাপত্তার কারণে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মিরপুর সাব-জেলে রাখা হয়। জানুয়ারিতে তাদের কাশিমপুর কারাগারে রাখা হয়।
২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটের পূর্ব শাপলাবাগের সূর্যদীঘল বাড়ি থেকে শায়খ আবদুর রহমান, ৬ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে বাংলা ভাই, ২০০৫ সালের ১৮ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও থেকে আবদুল আউয়াল, ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর তেজগাঁও পলিটেকনিক ছাত্রাবাস থেকে আতাউর রহমান সানি, ২০০৬ সালের ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে খালেদ সাইফুল্লাহ গ্রেফতার হয়। অন্যদিকে ঝালকাঠিতে আদালত প্রাঙ্গণে বোমা হামলার পর গ্রেফতার হয় ইফতেখার আল মামুন। এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আরিফ পলাতক রয়েছে।

যেভাবে ফাঁসি কার্যকর হবে
কারা সূত্র জানায়, দেশের ১১টি কেন্দ্রীয় কারাগারের মধ্যে কাশিমপুর ১ ও ২ কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ নেই। তবে মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। জেল কোড অনুযারী ফাঁসির আসামির বাড়ি যে এলাকায় ওই এলাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার নিয়ম রয়েছে, যাতে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির ফাঁসি হওয়ার পর তার স্বজনরা সহজভাবে মরদেহ নিয়ে যেতে পারে। তবে ৬ জঙ্গির ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কারা কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ফাঁসির দড়ি ফ্রান্সের তৈরি
ফাঁসির জন্য যে দড়ি ব্যবহার করা হয় তা জেল কর্তৃপক্ষ ফ্রান্স থেকে আমদানি করে থাকে। এর নাম ‘রোফ ম্যানিলা’। মসৃণ এ দড়ির মূল্য ১০ হাজার টাকা। কারা সূত্র জানায়, পর্যাপ্তসংখ্যক রোফ ম্যানিলা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। ফাঁসির মঞ্চে দড়ি টানানোর আগে তা পরীক্ষা করা হবে। ফাঁসি কার্যকরের আগে ফাঁসির নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওজন নেয়া হবে। ওই ওজনের সমপরিমাণ বস্তু ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কয়েকবার মঞ্চকূপে ফেলে দড়ির দৃঢ়তা পরীক্ষা করা হবে।

যেভাবে ফাঁসি কার্যকর হবে
কারা সূত্র জানায়, ৬ জঙ্গির যদি ফাঁসি হয় তবে এ জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই করে রাখা হয়েছে ১৮ জন জল্লাদ। যাদের এর আগে দেশের বিভিন্ন কারাগারে একাধিকবার ফাঁসি কার্যকর করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। জল্লাদরা প্রায় সবাই একাধিক হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। ফাঁসি কার্যকর করার জন্য প্রত্যেক জল্লাদের ৬০ দিনের সাজা মওকুফ হবে। ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত (প্রতিজনের জন্য) থাকবেন তিনজন করে জল্লাদ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কর্মকর্তা (এসপি পদমর্যাদার), সিভিল সার্জন, কারাগারের চিকিৎসক, কারা মসজিদের ইমাম ও ১২ জন অস্ত্রধারী কারারক্ষী। রাত ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হবে। ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর আধাঘণ্টা মরদেহ ফাঁসির দড়িতে ঝুলে থাকবে। এরপর চিকিৎসক মারা গেছে কিনা তা নিশ্চিত করবেন। চিকিৎসকের সিদ্ধানে-র পরই মরদেহ ফাঁসির মঞ্চ থেকে খুলে মেঝেতে রাখা হবে। ভোর পর্যন- মসজিদের ইমাম দোয়া-কালাম পড়বেন মরদেহের পাশে বসে। সকালে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস-ান-র করবে কারা কর্তৃপক্ষ।
ফাঁসি এক সঙ্গে নাও হতে পারে
কারা সূত্র জানায়, যদি ফাঁসি কার্যকর হয় তবে আলাদাভাবে হবে। কোন কারাগারে কার ফাঁসি হবে- এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান- নেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। তবে ঢাকা কেন্দ্রীয়, রংপুরসহ ৬টি কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে মাত্র ২টি ফাঁসির মঞ্চ। একইদিন একমঞ্চে একজনের বেশি ফাঁসি দেয়ার বিধান নেই। সূত্র জানায়, ৬ জনের ফাঁসি একইদিন কার্যকর করতে হলে দেশের ৬টি কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ ব্যবহার করতে হবে।
কি বলতে চেয়েছিল
জেএমবির শীর্ষ নেতাদের মামলার প্রক্রিয়া চলাকালে প্রতিবারই তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছে। তারা কি কারণে জঙ্গি হল, কারা তাদের জঙ্গি কার্যক্রমে উৎসাহ দিয়েছে এমনকি তাদের অর্থের উৎস কোথায়, সে সম্পর্কে মিডিয়ার সামনে তথ্য তুলে ধরতে চায়। ২ মার্চ সিলেটের পূর্ব শাপলাবাগে শায়খ রহমান গ্রেফতার হওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। তার অনেক কথা রয়েছে। কিন’ কি কথা, তা আজও জানা যায়নি। ফলে জঙ্গি মদদদাতারা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেল। গত জোট সরকারের প্রভাবশালীদের মদদেই জঙ্গিদের উত্থান ঘটেছে, এমন অভিযোগ দেশের সর্বত্র। তাই জোট সরকার তাদের মুখ খোলার সুযোগ দেয়নি। এখন জোট সরকার নেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন। প্রকৃত তথ্য উদঘাটনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, জঙ্গিদের ফাঁসির আগে তাদের কি বলার আছে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন ও নিহতদের স্বজনরা দাবি করেছে। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কাছে এ ধরনের কোন আবেদন নেই। জেল কোডের বিধান অনুযায়ী ফাঁসির আসামি মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার কোন সুযোগ নেই। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-06

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: