কাদের সিদ্দিকীর অবৈধ বাগানবাড়ি উচ্ছেদ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর (বীরউত্তম) অবৈধ দখলে থাকা ১ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ২১ একর সরকারি জমি মঙ্গলবার উদ্ধার করেছে যৌথ বাহিনী। কাদের সিদ্দিকী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এই জমিসহ টাঙ্গাইল জেলার আরও জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও লুটপাটের।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, কাদের সিদ্দিকীর দখলে থাকা সখীপুর উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ছিলিমপুর গ্রামের বাগানবাড়িতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদুল হকের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন- ৬ ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালায়। এ সময় ওই জমিতে নির্মিত ৪টি টিনের ঘর ভেঙে মালামাল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযান চলাকালে ওই এলাকার স্থানীয়রা বাদ্য-বাজনা বাজান এবং লাল পতাকা উড়িয়ে দেন। জানা যায়, কাদের সিদ্দিকী ওই গ্রামের ২০ দশমিক ৯৪ একর সরকারি জমি দখল করে সেখানে বাগানবাড়ি তৈরি করেন। সুবল বর্মণ নামের এক ব্যক্তির বিশাল ৩টি পুকুর ও মূল্যবান গাছপালাসহ পরিত্যক্ত এ বাড়িটি স্থানীয় হায়েত আলী নামের এক ব্যক্তি নিজ নামে কাগজপত্র দেখিয়ে মালিকানা দাবি করেন। বিগত জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে ক্ষমতার দাপটে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ওই জমির মালিক হন। কিন’ এর আগেই ওই জমি সরকার অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরও কাদের সিদ্দিকী ওই মূল্যবান জমিতে নিজের মালিকানা দাবি করে বাগানবাড়ি হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন। জমি দখলের সময় কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে স্থানীয়দের বিরোধ দেখা দেয়। তখন তিনি ক্ষমতার দাপটে তা দমন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের চলতি উচ্ছেদ অভিযানে অবশেষে পাহাড়ি এলাকার মূল্যবান জমি দখলমুক্ত হল। অভিযানের সময় বাড়ির কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম ছাড়া আর কেউ ছিল না। সখীপুরের ছিলিমপুরের চান মামুদের স্ত্রী আফাতন জানিয়েছেন, কাদের সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা এই জমি ছাড়াও তার কাছ থেকে জোর করে ৪২ বিঘা জমি দলিল করে নিয়েছেন।
এছাড়াও সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আরও অনেক মূল্যবান জমি জোর করে দখল করে নেয়ার অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল শহরের জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রমে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্যই এ উচ্ছেদ অভিযান দেখানো হয়েছে। ক্রয় সূত্রে তিনি ওই সম্পত্তির মালিক দাবি করে বলেন, যাদের কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে তাদের নাম খারিজ ও খাজনা নেয়া হয়েছে। কাজেই এ সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি বলা হাস্যকর। তার বাড়ি ভেঙে দেয়ার বিরুদ্ধে তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন বলে জানান।
কাদের সিদ্দিকী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ছাতিহাটী গ্রামে মরহুম আবদুল আলী সিদ্দিকীর ৬ ছেলে। লতিফ সিদ্দিকী, কাদের সদ্দিকী, বাবুল সিদ্দিকী, বেলাল সিদ্দিকী, মুরাদ সিদ্দিকী ও আজাদ সিদ্দিকী দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই জেলা শহরে বসবাস শুরু করেন। এ পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ পরিবারের সদস্য কাদের সিদ্দিকী দুর্দান- সাহস দেখিয়ে বাঘা সিদ্দিকী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। স্বাধীনতার পর থেকেই এ পরিবারের একচ্ছত্র প্রভাব আর আধিপত্যের আওতায় চলে আসে পুরো টাঙ্গাইলসহ আশপাশের এলাকা। যুদ্ধবিধ্বস- দেশকে গড়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ করার লক্ষ্যে বেশকিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম ’৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত টাঙ্গাইল জেলা প্রকৌশলী ইউনিয়নের মালিকানাধীন সোনার বাংলা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ’৭৪ সালে কাদের সিদ্দিকী নিজের মালিকানায় নিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এ ফার্মের নামে বিভিন্ন কাজের সূত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কোথাও নিম্নমানের কাজ, কোথাও অর্ধসমাপ্ত কাজ আবার কোথাও কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ত্যাগ করার পর তার রাজনৈতিক প্রভাব না কমে বরং আরও বেড়ে যায়। জোট সরকারের আমলে তিনি সরকারের বিভিন্ন খাত থেকে যা কামিয়েছেন আওয়ামী লীগের সময় পারেননি বলে বিভিন্ন সূত্রের অভিমত। সরকারের প্রচণ্ড প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এ সোনার বাংলা ঠিকাদারি ফার্মের মাধ্যমে তিনি টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় কাজ বাগিয়ে নেন। অনেক কাজ মাত্র ২৫-৩০ ভাগ করেই ৮০ ভাগ কাজের বিল উঠিয়ে নেন। জেলা সদর রোডের পুরনো ফৌজদারিতে অবস্থিত সাবেক মোক্তার বার যা স্বাধীনতার পর এনএসআই অফিস হিসেবে ব্যবহূত হতো সেই বাড়িটি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দখল করে নেন কাদের সিদ্দিকী। বর্তমানে এ বাড়িটি একটি বিলাসবহুল অট্টালিকায় পরিণত হয়েছে।
এছাড়া শহরের শানি-কুঞ্জ মোড়ে বিশাল ভূ-সম্পত্তি জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রমের নামে দখল করে তার সোনার বাংলা ঠিকাদারি ফার্মের অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্বাচনী এলাকায় উদ্ধারকৃত সম্পত্তি ছাড়াও অনেক মূল্যবান সম্পদ তিনি জোর করে দখল করে নিয়েছেন। সখীপুর সদরে এক ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ জমি দখলের ঘটনাকে কেন্দ করে কাদের সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত এক মঞ্চে ওঠে আন্দোলন শুরু করলে উপজেলা সদরে তিনি গত মে থেকে জুলাই পর্যন- প্রায় ৩ মাস ঢুকতে পারেননি।
এদিকে মরহুম আবদুল আলী সিদ্দিকীর ৬ ছেলের মধ্যে বাবুল সিদ্দিকী ও বেলাল সিদ্দিকী বাদে বাকি ৪ জনের নামে এলাকায় রয়েছে নানা অভিযোগ। তাদের মধ্যে বড় ভাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত লতিফ সিদ্দিকীর নামে রয়েছে টাঙ্গাইল শহরের আকুরটাকুরপাড়ায় একটি সরকারি বাড়ি দখলের অভিযোগ। সিদ্দিকী পরিবারের ছোট ২ ভাই মুরাদ ও আজাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠে একটি বিশাল সন্ত্রাসী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, এ বাহিনী প্রভাব বিস-ার করে একে একে সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি ও ফ্যাসিলিটিজ বিভাগের সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে লুটে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। সাধারণ কোন ঠিকাদার এ বাহিনীর বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটিও করার সাহস পায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সঙ্গে ভূঞাপুর উপজেলার যোগাযোগ স্থাপনের জন্য একটি সেতুর কাজ তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরেও শেষ করেননি। অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। গত জোট সরকারের আমলে জেলায় আজাদ-মুরাদ বাহিনীর দাপট ছিল অপ্রতিরোধ্য। এ বাহিনীর হাতে টাঙ্গাইলের যুবলীগ নেতা ডিপটি, ছাত্রলীগ নেতা ছাইফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুর রহমান খান বাপ্পী ও এনজিও কর্মকর্তা মতিন হত্যাসহ অসংখ্য নেতাকর্মী এবং নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী পরিবারটি সর্বসাধারণের কাছে একটি আতংকের মূর্তিমান প্রতীক। যৌথ বাহিনীর হাতে আটক আজাদ সিদ্দিকী ও মুরাদ সিদ্দিকী বর্তমানে জেলে রয়েছেন। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-14

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: