সাবেক ২৫ সচিবের দুর্নীতির তদন্ত শুরু

জোট সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সচিবদের মধ্যে প্রায় ২৫ জন সাবেক আমলা ফেঁসে যেতে পারেন। দলীয়করণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে রেখে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। টাস্কফোর্স সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার একটি ইউনিট গত সপ্তাহে তাদের কর্মকাণ্ড অনুসন্ধানের জন্য মাঠে নেমেছে। চুক্তিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় এসব সচিব মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নানামুখী অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করে অঢেল সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। কেউ আবার নিজে আর্থিক দুর্নীতি না করলেও দলীয় সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতির কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন।
দলীয় বিবেচনায় দফায় দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এ তালিকায় বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে এ পর্যন্ত ২৫ জন আমলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাবেক এসব সচিবের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, কেবিনেট সচিব এএসএম আবদুল হালিম, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, যোগাযোগ সচিব শফিকুল ইসলাম, আইন সচিব মোঃ আলাউদ্দিন সরদার, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আ. ন. হ আখতার হোসেন (গ্রেফতারকৃত), শিক্ষা সচিব ও বিয়ামের ডিজি শহিদুল আলম, স্বাস্থ্য সচিব মুহা. ফজলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব সোহেল আহমেদ, যোগাযোগ সচিব সৈয়দ রেজাউল হায়াত, পরিবেশ সচিব সাবিহউদ্দিন আহমেদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব সৈয়দ সুজাউদ্দিন আহমদ, পূর্ত সচিব ইকবাল উদ্দিন চৌধুরী, টিএন্ডটি সচিব মাহমুদ হাসান মনসুর, সমাজকল্যাণ সচিব কাজী মনোয়ারুল হক, আবদুল জব্বার, বাণিজ্য সচিব আমিনুর রহমান, সংস্থাপন সচিব আনোয়ারুল বার চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র সচিব মুহম্মদ ওমর ফারুক, অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী, নৌপরিবহন সচিব মোঃ রফিকুল ইসলাম, পরিবেশ সচিব সৈয়দ তানভীর আহমেদ প্রমুখ।
সূত্র জানিয়েছে, সাবেক জোট সরকারের মন্ত্রী ও অন্যান্য নেতার সীমাহীন দুর্নীতিতে এদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতা রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণও মিলেছে। পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য তদন্তের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলছে। তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা প্রতিদিন সচিবালয়ে আসছেন। ইতিমধ্যে কয়েকটি মন্ত্রণালয় থেকে কিছু নথিপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকেও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ফাইল চাওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্স ও গোয়েন্দা সংস্থা সংশ্লিষ্ট এ টিমের কয়েকজন সদস্য মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ের ২০ তলা ভবনের একটি মন্ত্রণালয়ে আসেন। পরে একজন সদস্য সাবেক কয়েকজন সচিব ও কর্মকর্তার পিডিএস সংগ্রহের জন্য সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে যান।
সূত্র জানিয়েছে, শুধু বিগত সরকার আমলের দলবাজ আমলাদের বিষয়ে তদন- হবে না, এর আগের সরকারের আমলেও যারা দলবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি করেছেন; তাদের বিষয়েও তদন্ত হবে। সচিব ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের দলীয় ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি দুর্নীতিবাজ আমলাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। তবে অকারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব বর্তমানে বিএনপি নেতা এএসএম আবদুল হালিম যুগান্তরকে বলেন, সাবেক সচিবদের নিয়ে তদন্ত হবে কেন? তিনি দাবি করে বলেন, সারাজীবন সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরিতে থাকা অবস্থায় কখনও কোন দলের পক্ষে কাজ করেননি। তিনি বলেন, পৃথিবীর কোন দেশে সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৫৭ বছর নেই। এ কারণে সরকার দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের গতিশীলতা রক্ষা করেছে। এটা দোষের হতে যাবে কেন?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিগত জোট সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রশাসনকে দলীয় প্রশাসন হিসেবে গড়ে তোলার প্রস’তি গ্রহণ করে। ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চে সরকারের শীর্ষ প্রশাসনের কর্মকর্তারা যোগ দিয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকারের পতন ডেকে এনেছিল- এমন ধারণা থেকেই তারা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রশাসনকে নিজেদের কব্জায় আনার সিদ্ধান- নেয়। এসময় ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কতিপয় দলবাজ ও বর্ণচোরা আমলা বিএনপির ঘাড়ে সওয়ার হয়। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী শতাধিক কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়। অপরদিকে দলবাজ আমলাদের মধ্যে সিনিয়র গ্রুপ দলীয় প্রশাসন গড়ে তোলার কাজে সরকারকে মদদ দেয়ার জন্য ‘চুক্তিভিত্তিক’ নামের লক্ষ্মীর ঝাঁপি খুলে ফেলেন। এক পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা রেকর্ড সৃষ্টি করে। ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে এ পদে নিয়োগের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ জনে এবং পছন্দের কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬ জন ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সচিব। এভাবে চুক্তিভিত্তিক ও ভারপ্রাপ্ত সচিবের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সচিবসহ প্রশাসনের ছয় স-রে পদোন্নতির গতি শ্লথ হয়ে যায়। অপরদিকে, সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও যেসব কর্মকর্তাকে নানা কারণে পদোন্নতি কিংবা সচিব পদে পোস্টিং দেয়ার সুযোগ ছিল না, তাদের রাষ্ট্রপতির কোটায় নিয়োগ দেয়া হয়। এমন ঘটনাও ঘটে, উপসচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপতির কোটায় নিয়োগ দিয়ে যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যন- তুলে আনা হয়। অতি পছন্দের এবং প্রথম সারির দল সমর্থক কর্মকর্তা হওয়ার কারণে কয়েকজন সচিবকে পঞ্চম দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। তারা জোট সরকারের শেষদিন পর্যন- গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও দফতরের সচিব পদে কর্মরত ছিলেন। কর্মরত থাকা অবস্থায় এদের অনেকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও করেছেন। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য কেউ কেউ নিজের এলাকায় গিয়ে আগাম নির্বাচনী প্রচারণাও চালিয়েছেন। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-14

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: