পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও রাহুর গ্রাস

ক্ষমতা ত্যাগের সাড়ে চার মাস পরও দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি-জামায়াতি রাজত্ব চলছে। একটি বাদে সবক’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বহাল আছেন জোট আমলে নিযুক্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর ও রেজিস্ট্রাররা। জোট সরকারের আমলে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় লোক বসানো হয়; যাদের বিরুদ্ধে আর্থিক দুনর্ীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, পদোন্নতি ও বৃত্তি প্রদানে অনিয়ম, বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভিন্নমতের বহু শিক্ষক-কর্মকর্তা নাজেহাল হয়েছেন, বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকমর্ীরা বিতাড়িত হয়েছেন ক্যাম্পাস থেকে। ক্ষমতার শীর্ষমহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে ওঠেন বেপরোয়া; কোন ক্ষেত্রে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেননি। এ সময়কালে পদ না থাকলেও বিধি ভঙ্গ করে সবক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাথর্ী ও শিক্ষকের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১০ : ১, প্রতি ২ জন শিক্ষাথর্ীর বিপরীতে রয়েছেন একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম-দুনর্ীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। যুগান-রের সংশ্লিষ্ট বু্যরো অফিস ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এ রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ৫ বছরে ব্যাপক দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে সহস াধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন পদে বসানো এসব ব্যক্তির প্রায় সবাই বিএনপি অথবা জামায়াতের নেতা, তাদের নিকটাত্দীয়, ছাত্রদল-শিবিরের নেতাকমর্ী। এক হিসাবে দেখা গেছে, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের ৫ বছরে যত নিয়োগ হয়েছে, বিগত জোট সরকারের পাঁচ বছরে এর চারগুণেরও বেশি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি অভ্যন-রীণ ভোটের রাজনীতিতে জয়লাভের জন্য বিভিন্ন খাতের নামে সরকারি অর্থ মুক্তহস-ে বণ্টন করা হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। এক হিসাবে দেখা গেছে, ভর্তি ও পরীক্ষার ফি যা নেয়া হয়, বিভাগগুলোতে তারও দ্বিগুণের বেশি বিভিন্ন খাতে-বেখাতে অর্থ নেয়া হয়। এ ব্যাপারে উপাচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষকদের জন্য তিনি সবকিছু করছেন।
২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই ১৩ অক্টোবর রাতে একসঙ্গে ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্যের মোট সাতটি পদ দখল হয় রাতের অাঁধারে। অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীকে মাত্র ১০ মাসের মাথায় প্রবল ছাত্র আন্দোলনের মুখে বিদায় নিতে হয়েছে। অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর বিদায়ের পরে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ চেয়ারে আসেন। তিনি প্রথমে ২০০২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর চ্যান্সেলরের ক্ষমতাবলে উপাচার্য হন। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন- ৬ বছরে মোট ৪ জন অধ্যাপক, ২১ জন সহকারী অধ্যাপক ও ২৪১ জন লেকচারার নিযুক্তি পেয়েছেন। সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়নি। অথচ মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে শুধু লেকচারারই নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৩২৭ জন। এছাড়া অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক নিয়োগ দেয়া হয়েছে আরও ২৫০ জন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : জোট সরকারের পাঁচ বছরে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের মহোৎসব চলেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ সময় দলীয় বিবেচনায় শূন্যপদের কয়েকগুণ অতিরিক্ত নিয়োগ যেমন দেয়া হয়েছে, তেমনি যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যরাই প্রাধান্য পেয়েছে নিয়োগের ক্ষেত্রে। এসব জনবল নিয়োগদানের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিষেধাজ্ঞাকেও উপেক্ষা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ পাঁচ বছরে সাড়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এদের মধ্যে শিক্ষক রয়েছেন ২৩০ জন। যাদের প্রায় সবাই জামায়াত-শিবির সমর্থক। এ সময় অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের নিয়োগ দিতে মানা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত রীতিনীতি। এমনকি বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটি কিংবা নির্বাচনী বোর্ডকেও তোয়াক্কা করা হয়নি।
শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, দলীয় পরিচয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও রেকর্ড করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। জানা যায়, জোট সরকারের পাঁচ বছরে ২২১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যাদের ১২০ জনই বাজেটবহির্ভূত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় : প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১৩শ’ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, তাদের বেতন-ভাতা প্রদান, অবৈধ নিয়োগ মোকাবেলায় দায়ের করা মামলা পরিচালনা এবং নানাভাবে বৈধ-অবৈধ সুবিধা নিতে গিয়ে গত ৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনৈতিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে। নতুন বই, রাসায়নিক দ্রব্যাদি ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে সংকট দেখা দেয়। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক বিভাগের শিক্ষা-সফর, বহু ফিল্ড ওয়ার্ক ও ব্যবহারিক কাজ। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে অদক্ষ ও মেধাহীন শিক্ষক-কর্মকতর্া-র্কমচারী নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলা দেয়া হয়েছে। এসব নিয়োগ নিয়ে বহু টাকার আর্থিক বাণিজ্যের অভিযোগ তো রয়েছেই। প্রশাসনের ঊধর্্বতন কর্মকর্তারা শুধু নয়, জামায়াত ও বিএনপির প্রভাবশালী শিক্ষকবৃন্দ, রাজশাহী সিটি মেয়র থেকে শুরু করে মহানগরীর জামায়াত ও বিএনপির বহু নেতাকমর্ী এ নিয়োগ বাণিজ্যে মেতে ওঠেন। ভিসির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রফেসর ফারুকী জামায়াত ও শিবিরের হাতে তুলে দেন রাবিকে। সুবর্ণজয়ন-ী উপলক্ষে বিভিন্ন কৌশলে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয় চাঁদা। দলীয় বিবেচনায় ৫৪৬ জন কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয়। এদের মধ্যে অনেক দাগি আসামি, মাদকাসক্ত ও সন্ত্রাসী দলীয় ক্যাডার রয়েছে।
জোট সরকারের বিশেষ মহলের মদদে ৪৯৬টি পদ সৃষ্টি করে এসব পদেও নিয়োগের উদ্যোগ নেন বর্তমান ভিসি। প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ফজরের নামাজের পর প্রাতঃভ্রমণের সময়ে মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন। গত বছর ১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন ড. এস তাহের আহমদ। কোন হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : জোট সরকারের ৫ বছরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) দলীয়করণ, অত্দীয়করণ, অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ ও পদোন্নতি, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, গাড়ি, আসবাবপত্র ক্রয় ও মেরামত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিভিন্ন প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুনর্ীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার নানা অভিযোগ উঠে এসেছে তিনজন ভাইস চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে। এই তিনজন হচ্ছেন_ ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মু. মোস-াফিজুর রহমান, প্রফেসর ড. মোহা. আমিরুল ইসলাম ও প্রফেসর ড. মোশাররফ মিয়া। এসব অনিয়মের কারণে বাকৃবি এখন মাথাভারি প্রশাসনে রূপ নিয়েছে।
যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১০ জন ছাত্রের বিপরীতে একজন কর্মচারী থাকার কথা, সেখানে বাকৃবিতে দু’জন ছাত্রের জন্য রয়েছে একজন কর্মচারী। তার বিপরীতে প্রতি আটজন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। ২০০৬ সালের সর্বশেষ হিসাব মতে, বাকৃবিতে মোট শিক্ষাথর্ীর সংখ্যা ৪ হাজার ৫১৭ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২ হাজার ২৩১। এসব দুনর্ীতির কারণে বাকৃবির শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিপর্যস- করা হয়েছে। জোট সরকারের ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন- দুনর্ীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে ৩৭৪ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনুষদে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা না বাড়লেও ২০০৫ সাল পর্যন- শিক্ষক শতকরা ২৫ ভাগ বৃদ্ধিতে ৪২৪ জন থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৩০ জন, কর্মকর্তা শতকরা ১৬ ভাগ বৃদ্ধিতে ৩২২ জন থেকে ৩৭৫ জন, কর্মচারী ১৮৫৭ জন থেকে ১৯২৫ জন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : জোট সরকারের ৫ বছরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম, দুনর্ীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটের রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এসময় ক্যাম্পাসে দুটি খুন, ধর্ষণ, ভাংচুর, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয়করণ ও বিভাজনের মতো অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। দিনের পর দিন বন্ধ থেকেছে সাড়ে ৬ হাজার শিক্ষাথর্ীর ক্লাস ও পরীক্ষা। সাবেক দু্’জন দলীয় ভিসির হাতে একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট কমিটিসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম জিম্মি হয়ে পড়েছিল। গতবছর ২৩ অক্টোবর শাবির সর্বশেষ ভিসি মুসলেহ উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করা হলেও বিগত জোট সরকার তার এসব অনিয়ম-দুনর্ীতির কোন তদন- ও বিচার করেনি। ২০০১ সালের অক্টোবরে জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এ বিশ্ববিদ্যালয়েও ভিসি পরিবর্তন করা হয়। নিয়োগ দেয়া হয় দলীয় ভিসি প্রফেসর ড. এম শফিকুর রহমান এবং প্রো-ভিসি ড. মুসলেহ উদ্দিন আহমদকে। এ দ্বৈত শাসকদ্বয়ের কারণে প্রথমেই বাদ দেয়া হয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সৎ ও যোগ্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের। আর সেসব স্থানে বসানো হয় জামায়াত ও বিএনপি সমর্থিত অযোগ্য শিক্ষক-কর্মকর্তাদের। ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসে বিরোধী পক্ষের শিক্ষকদের নিয়ে প্রো-ভিসি গোপনে তৎকালীন ভিসি শফিকুর রহমানকে কৌশলে অপসারিত করে নিজে ভারপ্রাপ্ত ভিসির দায়িত্ব লাভ করেন। গত ৫ বছরে প্রায় ২শ’ শিক্ষক, শতাধিক কর্মকর্তা ও ২শ’ কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : দেশের উত্তরাঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে স্থাপিত হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন- সংঘটিত দুনর্ীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। এ সময় চরম স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, লাগামহীন দুনর্ীতি ও কারচুপির মাধ্যমে আত্দসাৎ হয়েছে ৫০ কোটিরও বেশি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হওয়ার পর থেকেই ভিসি মোশারফ হোসাইন মিঞা ও রেজিস্ট্রার আবদুল মজিদ প্রয়াত মন্ত্রী বেগম খুরশীদ জাহান হকের ছত্রছায়ায় এবং মন্ত্রীর পিএ মোখলেসুর রহমান রওশন ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলমের সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি দুনর্ীতির আখড়ায় পরিণত হয়। শুরুতেই ৪ শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি ছাড়া মেধা যাচাই না করেই নিয়োগ দিয়ে ১৫ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়। এছাড়া ভিসি মোশারফ হোসাইন মিঞা জিয়া পরিষদের কেন্দ ীয় কমিটির সভাপতি থাকার সুবাদে হাবিপ্রবির কোন নিয়মনীতি তোয়াক্কা করতেন না। দুনর্ীতি করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ৩ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : বিএনপিপন্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ ব্যাপক দুনর্ীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভিসির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন- হয়েছে।
২০০৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. মোঃ খলিলুর রহমান যোগদান করেন। তিনি যোগদান করার পর ২০০৩-০৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি যখন যোগদান করেন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫৭, শিক্ষক ৮ জন, কর্মকর্তা ১৭ জন, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ৩৪ জন, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ২৫ জন। বর্তমানে ৭টি বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৬৬৫। ভিসি প্রফেসর ড. খলিলুর রহমান ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুনর্ীতির মাধ্যমে মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করেন। বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা ৩১, কর্মকর্তা ৬২, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ১৯২, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ১৭১ জন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২৫৬। ভিসি অনুমোদিত পদের প্রায় দ্বিগুণ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করেছেন। বর্তমানে এডহক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১১৭। চাকরি স্থায়ীকরণের সংখ্যা ৩১৭। মোট জনবলের সংখ্যা ৪৪৬।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় : চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই জামায়াত কোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক মোস-াফিজুর রহমান ভিসি হিসেবে যোগদান করেন। ভিসি হিসেবে যোগদানের পর মোস-াফিজুর রহমান একযোগে ৫৫ জনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। এদের অধিকাংশই জামায়াতের নেতাকমর্ী অথবা শিবির ক্যাডার। বাকিরা ছাত্রদল নয়তো বিএনপির। এ নিয়ে সে সময় ক্যাম্পাসে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ ভিসি মোস-াফিজ খেদাও আন্দোলনে নামে। ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। জামায়াতিকরণ এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ মাথায় নিয়ে তাকে বিদায় নিতে হয়। পরবতর্ী সময়ে বিএনপি প্যানেলে ভিসি হয়ে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। নিয়োগলাভের পর ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ভিসি রফিকুল মাত্র ৬২ শূন্য পদের বিপরীতে প্রথম দফায় একযোগে ১০৪ জনকে নিয়োগ দেন। এর মধ্যে শিক্ষক পদে ৫৪ জন এবং অফিসার পদে ২২ জন নিয়োগ পান। নিয়োগপ্রাপ্তরা সবাই বিএনপি-জামায়াতের। ‘৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ২২ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ২৭৯ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে মাত্র এক বছরের মধ্যে ভিসি রফিকুলই নিয়োগ দেন ১৯২ জনকে। প্রথম দফায় ১০৪ ও দ্বিতীয় দফায় ৮৮ জনকে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর আবদুল লতিফ মাসুমকে প্রচলিত আইন লংঘন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের আইনে বলা হয়েছে, যিনি উপাচার্য নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন তাকে অবশ্যই শিক্ষাজীবনে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা থাকতে হবে। কিন\’ বর্তমান উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নিয়মবহিভর্ূতভাবে বাসা ভাড়া নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। ইউজিসি সূত্র জানায়, প্রায় তিন বছর আগে তিনি পটুয়াখালী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি মাসিক ২৫ হাজার টাকা বাসা ভাড়া নিয়ে আসছেন। নিয়মানুযায়ী বাসা ভাড়া নেয়ার পর তাকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টার ছেড়ে দেয়ার কথা। বিষয়টি ইউজিসি অবহিত হয়ে তাকে একাধিকবার মৌখিকভাবে টাকা জাবি কোষাগারে ফেরত দিতে বলেছেন। কিন\’ অদ্যাবধি তিনি টাকা দেননি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় : বিগত জোট সরকারের আমলে যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে গণনিয়োগ, দলীয়করণ এবং একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ সর্বাধিক এসেছে_ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অন্যতম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত সাবেক ও পঞ্চম উপাচার্য অধ্যাপক আফতাব আহমাদের বিরুদ্ধে এসব গণনিয়োগ ও দলীয়করণের অভিযোগ প্রমাণিত। নানা অভিযোগ ও কেলেংকারির পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক আহমাদকে সরকার ২০০৫ সালের ২০ জুলাই অপসারণ করে। তার এই স্বল্পসময়ের দায়িত্ব পালনকালে ১৩শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২০০৫ সালের ২১ জুলাই নিয়োগলাভের পর বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদেরও পূর্বসূরির পথে হাঁটার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার সময়কালে ৮৫তম ও ৯৩তম সিন্ডিকেটে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, স্থায়ীকরণ/চাকরি নিশ্চয়নসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৬ সালের ১৩ জুলাই ৩৯ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। কিন\’ চাকরির মেয়াদকাল ও জ্যেষ্ঠতা বিবেচনা না করে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপ-উপাচার্য যুগান-রকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি অনিয়ম আর আর্থিক দুনর্ীতিতে ভরপুর।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিণত করা হয়েছে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের আত্দীয়স্বজনদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে। বিএনপি নেতা মফিকুল হক তৃপ্তির পরিবারেরই ২ ডজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই তৃপ্তির নিজের অঞ্চল যশোর-ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরার লোক বলে জানা যায়। এছাড়া নিয়োগ পেয়েছেন এই ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্র পেটানো, সন্ত্রাস ও মাস-ানি করা ছাত্রদলের আরও অর্ধশত নেতা ও তাদের স্ত্রীরা। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যায়ের নিয়োগ দুনর্ীতি-অনিয়ম এবং দলীয়করণের ঘটনা তদন- করছে ইউজিসির একটি অভ্যন-রীণ টিম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দলীয়করণের পাশাপাশি উপাচার্য ড. ফারুকের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নিয়ে চাকরি দেয়ার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় : বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ব্যাপক দলীয়করণ, দুনর্ীতি-অনিয়ম হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। জোট সরকারের আমলে করা ছক অনুযায়ী বর্তমানেও চলছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। আগের ধারাবাহিকতায় দুনর্ীতি-অনিয়মের পাশাপাশি চলছে নিয়োগ বাণিজ্য। আগে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতিসহ ভিসির পছন্দসই ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে ভিসির নিয়ন্ত্রণাধীন সিন্ডিকেট আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করেছে মাত্র। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রায় সবাই নানাভাবে বিতর্কিত ও অভিযুক্ত। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রবল অর্থ সংকট চলছে। বিভিন্ন তহবিলের অর্থ দিয়ে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেরই বসার জায়গা নেই। তবুও বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থ সংকটে জর্জরিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ব্যাপক দলীয়করণ, দুনর্ীতি ও অনিয়ম শুরু হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবদুল কাদির ভঁূইয়ার সময়ে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান যুগান-রকে বলেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কাজে অনিয়ম বা দুনর্ীতি হয়নি।
বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুনর্ীতি ও অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, অযোগ্য ও অপদার্থ লোকদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে বসানো হলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংসের প্রান-সীমায় এসে পেঁৗছেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হল সুষ্ঠু তদন- করে ত্বরিত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম আসাদুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অটোনমিকে চূড়ান- অধিকার মনে করে। অনেক উপাচার্যই আর্থিক ব্যবহারবিধি জানেন না। নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক চাপও অনেক স্থানে ছিল। নিয়োগ ও দুনর্ীতিতে পুরনোগুলোর চেয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ বেশি উঠেছে।
সূত্রঃ http://jugantor.com/online/news.php?id=54057&sys=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: