আরও একটি বিনিদ্র রজনীর অপেক্ষায়

ক্রিকেটে নতুন যৌবনের দূত বাংলাদেশ বিশ্বকাপ লড়াইয়ে প্রবল পরাক্রমে ব্যাঘ্রশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্রাবিড় দুর্গ চুরমার করে দেয়ায় ভারতের জাঁদরেল সব ক্রিকেট ভাষ্যকার মর্মাহত হতেই পারেন। তবে ‘সেট ম্যাক্সের’ স্টুডিও থেকে ভারতীয় ক্রিকেটারদের ওপর ক্ষিপ্ত ভাষ্যকারদের বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিজয়কে ‘নিছক অঘটন’ বলে অন্যায়ভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা সঙ্গত এবং শোভন হয়নি। তাদের এই মূল্যায়নকে ‘অক্ষমের আর্তনাদ’ বলে কোন অনুদার মন্তব্য আমরা অবশ্যই করব না।

তবে আমরা উচ্চকণ্ঠেই বলব- ক্রিকেটের বিশ্বসভায় বাংলাদেশ এখন ‘রোরিং টাইগার’। ওদের সুন্দরবনেও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাস। এই মুহূর্তে ক্রিকেটের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ভারত নয়- বাংলাদেশ। ক্রিকেটের মাঠ কাঁপিয়ে আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গুরু গর্জন কুইন্স পার্কেই নয়, এর আগে ঢাকা, বগুড়া, কার্ডিফ ও নটিংহাম্পশায়ারে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ভারতীয় দলনায়ক রাহুল দ্রাবিড় অবশ্য আপন দলের দুর্বলতার পাশাপাশি বোলিং-ব্যাটিং উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দলের নৈপুণ্যের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশ আর ঝড়ের মুখে উড়ে যাওয়ার মতো দল নয়- এ আত্মবিশ্বাসের কথা কোচ হোয়াটমোর আমাদের সবাইকে দু’দিন আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। তার মন্তব্য- মাঠে নামলে সবাই সমান, কেউ ছোট কেউ বড় নয়। তার এই অনুপ্রেরণা আমাদের ক্রিকেটারদের হূদয় স্পর্শ করেছিল। আমি মনে মনে অনেক ভালো ভালো বিশেষণ অনুসন্ধান করেছি বাংলাদেশের গৌরবের নায়কদের বিশেষভাবে বিশেষিত করার জন্য। খুঁজে পাইনি। তবে ভারতের বড় মাপের একজন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ আনন্দ বসুর কিছু মন-ব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করতে চাই। তিনি বলেছেন- ‘এই যে ত্রিরত্ন তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম, ওদের তো এখন স্কুলে থাকার কথা। ওদের বয়স তো আঠারোরও কম। ভারতীয় ক্রিকেট বাহিনীর যৌথ শক্তি ওরা তছনছ করে দিল। একদিনের তিন শতাধিক ম্যাচ খেলেছে ভারত। ১০ সহস্রাধিক রানের পাহাড়ের ওপর ওরা দাঁড়িয়ে। দেড় দশক ধরে প্রবল পরাক্রমে ওরা খেলে চলেছে। ওদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে কিশোর ক্রিকেটাররা।’ বাংলাদেশের জন্য এই সাফল্যের স্বর্ণদরজা একদিনে খোলেনি। মিডিয়ার অকুণ্ঠ প্রশংসা এবং ভয়ংকর ভর্ৎসনা জুটেছে ওদের। কোচ হোয়াটমোরও কম কটু কথা শোনেননি। নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রমে ওরা নিপুণ কারিগরের মতো বিজয়ের পথটি তৈরি করেছে।

ভারতের পত্রপত্রিকাগুলো বাংলাদেশের নবীন ক্রিকেটারদের যতটুকু প্রশংসা করেছে তার চেয়ে বেশি গালমন্দ করেছে নিজেদের ক্রিকেটারদের। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা রাগে ছটফট করেছে। ওদের শিরোনাম- ‘১১ বাঙালির দাপটে ধরাশায়ী ভারত, মাঠে মারা গেল এক বাঙালির লড়াই’। আনন্দবাজারের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া খবরের সূচনা স্তবক- ‘চারটা লোপ্পা ক্যাচ হাতছাড়া, প্রবীণদের ক্রিকেটমনোচিত গ্রাউন্ড ফিল্ডিং এবং কুৎসিৎতম অধিনায়কত্ব। মিলেঝুলে ভারত দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ অভিযানের খাদে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সমর্থকদের মন ভরিয়ে দেয়ার মতো ক্রিকেট খেলেছে বাংলাদেশ। একমাত্র তারা আত্মহত্যা করলেই নিস্তারের সুযোগ ছিল ভারতের।

কিন্ত পদ্মা পাড়ের এই টিম অনেক পেশাদার।’ পদ্মা পাড়ের এই টিমটির পেশাদারিত্ব অর্জনের সূচনা পর্ব চলছে, ভিতটি রচিত হয়েছে। এখন প্রাসাদ বিনির্মাণের সময়। অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বে উজ্জ্বল কিঞ্চিৎ বয়স্ক ক্রিকেটারদের অবদানের কথা স্মরণ করেই বলব, ক্রিকেটে এখন নবযৌবনের ফাল্গ-নী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণরাই এখন ক্রিকেটে রাজাধিরাজ। ওদের কণ্ঠেই আমরা শুনছি ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’।

আমি ক্রিকেটবোদ্ধা নই, ক্রিকেট অনুরাগী। আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মতো শনিবার সারারাত জেগেছি। উচ্চকণ্ঠে হইচই করেছি, চিৎকার করেছি। হঠাৎ যেন প্রথম যৌবনের দিনগুলোতে ফিরে গেছি। ক্রিকেট প্রসঙ্গে হঠাৎ হুমায়ূন আহমেদের প্রসঙ্গ কেন তুললাম। সঙ্গত প্রশ্ন। সাড়া জাগানো কলামিস্ট ও সাংবাদিক আমাদের প্রিয় আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে আড্ডা দেয়ার জন্য শনিবার রাতে ঢাকা ক্লাবে কিছু গুণী লোককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে জমে উঠেছিল জমজমাট আড্ডা। বাংলাদেশ-ভারত খেলা চলছে। আড্ডাও ছাড়তে পারছেন না। এক পর্যায়ে তাকে আর ধরে রাখা গেল না। বললেন, ‘বাংলাদেশের খেলা হলে আমি শুটিংও বন্ধ করে দেই। দুনিয়া কাঁপানো খেলা চলছে, আমি চললাম।’ অন্যপ্রকাশের মাযহারকে নিয়ে ঝড়ের গতিতে আড্ডাস্থল ত্যাগ করলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর লাউঞ্জে গিয়ে টিভিতে দেখলাম বাংলাদেশ দলের হত্যাযজ্ঞ। মালা হতে এক একটি ফুল খসে পড়ছে- তিন রানের মধ্যেই প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন- যুবরাজ, সৌরভ, ধোনি, হরভাজন ও আগরকার। তারা প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন, রেখে গেলেন অশনি সংকেত। বাংলাদেশের কাছে ভারতের হেরে যাওয়ার মধ্য থেকে এশিয়ায় ক্রিকেটের দৃশ্যপট বদলে যাওয়ারই একটি ইঙ্গিত অনেকে লক্ষ্য করছেন। পরাজয়ের পর রাহুল দ্রাবিড়ের মনস্তাপ এভাবে- ‘এটা এক ভয়ংকর পরাজয়। সম্ভবত, সবচেয়ে খারাপ পরাজয়। আগেও হূদয়বিদারক পরাজয় মেনে নিয়েছি আমরা। তবে এবারের মতো হতাশাব্যঞ্জক পরাজয় আমাদের আগে কখনও গ্রাস করেনি।’ পাকিস্তান ডুবন্ত তরী। ওদের কথা আর না বলাই ভালো। ভারতেরও অজানা গন্তব্য। শ্রীলংকার পিছু পিছু অন্য কেউ নয়, বাংলাদেশই এগিয়ে আসছে। বাংলাদেশের এই দাপুটে এগিয়ে আসার ওপর শ্রীলংকার এখন তীক্ষ্ণ নজর! নড়েচড়ে বসছে একদা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন এই দেশটিও।

আর এক অগ্নিপরীক্ষা ২১ মার্চ। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শ্রীলংকার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। সংহত শক্তি, অশেষ উদ্দীপনা, ১৪ কোটি মানুষের বিপুল-বিশাল সমর্থন এবং ভারতের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় থেকে অর্জিত সাহসে ভর করে বাংলাদেশ মাঠে নামবে। আর একটি বিনিদ্র রজনী যাপনের জন্য, গগনবিদারী কণ্ঠে ‘জয়ধ্বনি’ দেয়ার জন্য ১৪ কোটি বাঙালি এখন প্রস’ত। রয়েল বেঙ্গল টাইগার ২১ মার্চ সারাবিশ্বকে আবার তার ভয়াল গর্জন শোনাক। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-19

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: