প্রয়োজনের অতিরিক্ত একদিনও আমরা ক্ষমতায় থাকব না : টাইম ম্যাগাজিনকে ড.ফখরুদ্দীন আহমদ

প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বলেছেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি একদিনও ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা তার সরকারের নেই। টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা একথা বলেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কখন অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। তবে তার আগে রেজিস্ট্রেশন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাসহ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার করতে হবে। সংগৃহীত তহবিল দলগুলো কিভাবে খরচ করছে সে ব্যাপারে জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতা ও নিজেদের সংবিধানের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ভোট জালিয়াতি যাতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় সেজন্য ভোটার আইডি কার্ড ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স চালু করার মতো কিছু টেকনিক্যাল দিক নিয়েও নির্বাচন কমিশন চিন্তাভাবনা করছে। এ ধরনের সংস্কার কাজ করতে যথেষ্ট সময় দরকার। তিনি বলেন, নির্বাচন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেয়ার জন্য তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু মৌলিক সংস্কার কাজের জন্য তাদের সময় প্রয়োজন এবং এটা সবাই মেনেও নিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনের চেয়ে একদিনও বেশি তারা ক্ষমতায় থাকবেন না।

এ সংস্কারের জন্য কয়েক বছর লাগতে পারে কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই নয়। শুধু পরবর্তী নির্বাচনই নয়, বরং ভবিষ্যতের সব নির্বাচন ব্যবস্তা থেকে যাতে কিছু মৌলিক অসুবিধা দূর করা যায় এ সরকার সে ব্যবস্তা করে যাবে। তার সরকারকে কেউ কেউ সামরিক বাহিনীর নীরব অভ্যুত্থান বলে অভিহিত করে- এ কথার জবাবে ফখরুদ্দীন বলেন, বাংলাদেশের চরম সংকটপূর্ণ পরিসি’তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অভাবই তাদের এ জাতীয় মন্তব্য করতে প্রণোদিত করে। তিনি বলেন, সাংবিধানিক পন্থায়ই তার সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সংবিধান ও আইনের প্রতি পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী অবশ্যই তার সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। প্রাকৃতিক অথবা মনুষ্যসৃষ্ট যে কোন জরুরি অবস্তায় বেসামরিক প্রশাসনকে সাহায্য করার জন্য তাদের ডাকা হয়। এটা অন্যান্য দেশের কাছেও কোন অজানা ঘটনা নয়। সরকার ব্যবস্তায় তার বর্তমান ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে দেশে বর্তমানে যে সংস্কার অভিযান চলছে তিনি নিজেকে সে অভিযানের অধিনায়ক হিসেবে মনে করেন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সুশাসন ও গণতন্ত্রের পথে দুর্নীতি একটি বড় বাধা। অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেখানে দুর্নীতি নির্বাচন পদ্ধতিতে কোন বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিগত দিনে এদেশে নির্বাচনে জেতার ক্ষেত্রে টাকা (মানি), পেশিশক্তি (মাসল) ও ক্ষমতার অপব্যবহার (মিসইউজ অব অথরিটি)- এই তিনটি ‘এম’ বড় ভূমিকা রেখেছে।
রাঘব বোয়াল গ্রেফতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজ ও আইন লংঘনকারীদের যদি এ সরকার সফলভাবে বিচার করতে সক্ষম হয় তাহলে দেশের মানুষ তাদের ধন্যবাদ জানাবে। এছাড়া ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতি করতে গেলে এ ঘটনা তাদের জন্য হুশিয়ারিমূলক দৃষ্টান- হয়ে থাকবে।

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল দুর্নীতিগ্রস্ত কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে ফখরুদ্দীন বলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন না হলেও রাজনৈতিক দলগুলো সেটা করে। কোন রাজনৈতিক দল প্রত্যক্ষভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল কিনা তিনি জানেন না। তবে বিগত দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর সাহস ও সদিচ্ছার অভাব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক দলগুলো বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে বর্তমান সরকার উদ্বিগ্ন কিনা- তার জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি মোটেও উদ্বিগ্ন নন। সাধারণ জনগণ তাদের সমর্থন করছে। তবে চলমান অভিযানে কিছু কিছু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তারা বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করতে চাইবে। এ বিষয়টিকে তিনি রাজনৈতিক অসহযোগিতা বলতে নারাজ। তিনি বলেন, যতক্ষণ তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে অবিচল, কাজের ক্ষেত্রে স্ব”ছ এবং নিজেরদে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক বলে মনে করেন, ততক্ষণ তাদের সামনে কোন হুমকিই উদ্বেগের বিষয় নয়। তিনি বলেন, কাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব সময় তাদের সজাগ থাকতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, জনগণ সরকারের সমর্থনে আছে। জনগণ থেকে বি”িছন্ন হওয়া ঠিক হবে না।
সাধারণ নির্বাচন না দিয়ে কেন দেশে জর”রি অবস’া জারি করা হল- সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্দলীয় নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভুলভ্রানি-মুক্ত ভোটার তালিকার সাহায্যেই একটি অর্থবহ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। কিন’ নিরপেক্ষ ব্যবস’া না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই জর”রি অবস’া জারি করতে হয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধান অনুসারেই তারা সরকার গঠন করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনেতিক সংস্কার করছেন। পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারেও তারা কাজ করছেন।
তিনি বলেছেন, তারা যেসব মৌলিক সংস্কার করছেন তা সফলভাবে করা গেলে আগামী নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার সঠিক প্রতিফলন দেখা যাবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হলে ফখরুদ্দীন বলেন, একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি মনে করেন রাজনীতি, অর্থনীতি অথবা যে কোন ক্ষেত্রে যোগ্যতমদের আগমন খুবই ভালো বিষয়। তিনি বলেন, এর আগেও সৎ এবং যোগ্য প্রার্থীদের অনেক সময় নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দেয়া হয়েছে অথবা নির”ৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য যোগ্য আরও লোকের রাজনীতিতে আসা উচিত।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে ভয় পাচ্ছেন কিনা? এর জবাবে তিনি বলেন, তিনি কখনোই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন না। অবসরে কি করেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছুটির দিনেও তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তিনি স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্যদের আরও বেশি সময় দিতে চান। সময় পেলে সিনেমা দেখেন। তবে রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে অনুষ্ঠিত টকশোই ইদানীং বেশি দেখেন বলে প্রধান উপদেষ্টা জানান। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-24

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: