রাজধানীতে বেড়ে গেছে ছিনতাই

হঠাৎ করে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই রাজধানীর কোনো না কোনো স্থানে ছিনতাই হচ্ছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না পুলিশ। মোটরসাইকেলে করেই ছিনতাই হচ্ছে বেশি। ছিনতাইকারীদের হাতে খুনের সংখ্যাও কম নয়। অভিজাত কূটনৈতিক এলাকা বারিধারাতেও চলছে ছিনতাই। তাও আবার পুলিশের নাকের ডগাতেই ঘটছে। এমনকি কড়া নিরাপত্তা বলবৎ থাকা সত্ত্বেও এ এলাকার জাতিসঙ্ঘ রোডসহ অন্যান্য রোডে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন এলাকাবাসী। এর থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বিদেশী নাগরিকরাও।
এদের কয়েকজন গত কিছুদিন ধরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে পত্রিকা অফিসে ফোন করেও অভিযোগ জানিয়েছেন। ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরাও। গত ১৮ মার্চ রাতে ধানমন্ডি এলাকায় ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের আঘাতে আহত করেছে জনপ্রিয় উপস্থাপক ও অনুষ্ঠান নির্মাতা হানিফ সঙ্কেতকে। তার পিঠে ১০টি সেলাই পড়েছে বলে জানা যায়। এদিকে এ ঘটনার পরদিন ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অফিসে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তাকে গুলি করে ৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। ছিনতাই শেষে মোটরসাইকেলে দুই ছিনতাইকারী পালিয়ে গেলেও ধরা পড়ে তাদের অপর দুই সহযোগী। জনতা তাদের গণধোলাই দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। গত ১৯ মার্চ দুপুরে নগরীর ব্যস্ততম এলাকা পল্টন থানার অদূরে এ ঘটনাটি ঘটে।

ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত ডেনমার্কের নাগরিক ব্রয়েন জানান, কয়েকদিন আগে রাত ৮টায় বাসা থেকে বেরুতেই ওঁৎ পেতে থাকা দুই ছিনতাইকারী ছুরি দেখিয়ে তার মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় না জানালেও তিনি তার দেশের দূতাবাসকে ফোনে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় দেশের ভাবমর্যাদা বিদেশীদের কাছে বিনষ্ট হচ্ছে।

অন্যদিকে ছিনতাইরোধে ডিএমপি কমিশনার নাঈম আহমেদ বলেছেন, ছিনতাইরোধের পরিকল্পনা নিয়ে নগরীর অপরাধ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ছিনতাই সপটগুলোর তালিকা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর কতজন কারাগারের বাইরে রয়েছে ওই তালিকাও হবে। জামিনে বেরিয়ে যারা অপরাধ করছে, তাদেরও ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছিনতাই সপটগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হবে। নতুন কৌশলে কাজ করবে গোয়েন্দা টিম। তিনি বলেন, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর ছিনতাইকারীরা কৌশলও পাল্টিয়েছে। অভিযান চলার সময় তারা আত্মগোপনে থাকে। নিজেদের গার্মেন্টসকর্মী পরিচয় দিয়ে বাসা বদলে বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া থাকছে। ছিনতাই শেষে এরা কেরানীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, রূপগঞ্জ ও টঙ্গী এলাকায় আত্মগোপন করে। ডিএমপি কমিশনার আরো জানান, ওইসব আস্তানাতেও হানা দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, নগরীতে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও গ্রেফতার করতে পারছে না পুলিশ। যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানোর পরও থেমে নেই ছিনতাইয়ের ঘটনা। নতুন কৌশলে চষে বেড়াচ্ছে ঢাকা। পেশাদার ছিনতাইকারীদের ধরতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ২০-২৫টি টিম মাঠে নামলেও তেমন কাজে আসছে না। তারা স্কুল, কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। সুযোগ বুঝেই যাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রিকশা, সিএনজি, অটোরিকশা অথবা ভোরবেলা ও রাতে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত যাত্রীদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই গলিপথ দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আবার এদের একটি অংশ বিভিন্ন বাস ও রেলস্টেশনে ওঁৎ পেতে থাকে। এ ছাড়া সনধ্যার পর মিনিবাস, টেম্পো, সিএনজি চালকদের সহায়তায় তারা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে যাত্রীদের কাছে গিয়ে বিষাক্ত মলম, মরিচের গুঁড়া ও নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করিয়ে যাত্রীর কাছ থেকে সর্বস্ব নিয়ে দ্রুত চালকসহ ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। এ ছাড়া গাড়ির ত্রুটির কথা বলেও ছিনতাইকারীদের সহায়তা করে চালকরা।

নগরীর বিভিন্ন স্পটের মধ্যে মতিঝিল এলাকার উত্তর শাহজাহানপুর, শাপলা চত্বর, মালিবাগ মোড়, দৈনিক বাংলা মোড়, ইত্তেফাক মোড়, মধুমিতা সিনেমা হলের মোড়, পীরজঙ্গী মাজার রোড, ফকিরাপুল পানির ট্যাংকি, কমলাপুর, আইসিডি টার্মিনাল, রাজারবাগ মোড় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে শাহাদাত, আশিক রেজা। সায়েদাবাদ এলাকায় বুদ্দিনের ভাতিজা রাসেল। ধানমন্ডি এলাকার ক্রিসেন্ট রোড, স্টার টাওয়ার, সাতমসজিদ রোডসহ আশপাশের এলাকা ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত সপট। এই এলাকায় বাদশা, আজমল বাহিনী ছিনতাই করে। খিলগাঁওয়ের পূর্ব হাজীপাড়া, ভিআইপি রোড, উলন মোড় ও চৌধুরীপাড়ায় রয়েছে আজহার, ওমর আলী, উলনপাড়া বস্তির খোকন, বিল্লাল, মামুন বাহিনী। গুলশান এলাকায় রয়েছে মনির ওরফে নোয়াখালী মনির, মহাখালীতে মহারাজ, সাততলা বস্তিতে শফিক, কড়াইল বস্তির আবদুল জলিল, আলমগীর ও মুক্তার হোসেন। মোহামমদপুরের চান মিয়া হাউজিংয়ের রোকন, বাঁশবাড়ির কফিল ওরফে প্রফুল্ল ছিনতাই করে। বিমানবন্দর এলাকায় সিভিল অ্যাভিয়েশন কোয়ার্টারের সুমন ও রনি, আমবাগানের পেটকাটা বাবু, ক্যান্টনমেন্ট ও কাফরুল এলাকায় ভাসানটেক বস্তির হাসান, গোয়ালবাড়ি বস্তির সজীব, ১৩ নম্বর সেকশন বস্তির হান্নান, আকাশ, দামাল কোর্ট ভাসানটেক বস্তির খায়ের, উত্তর কাফরুল ঝিলপাড়ের রানা ও জসিম ছিনতাই করে। এ ছাড়া রমনা, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, কোতোয়ালি, হাজারীবাগ এলাকায় কিছু ভাসমান ছিনতাইকারী রয়েছে। বাড্ডা এলাকার দিপু, পোস্ট অফিস গলির চান মিয়া, উত্তর বাড্ডার কাঙ্গালি বাবু, মিরপুর ও পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ টিনশেড কলোনির রাকু ওরফে রাজন, কামাল, পল্লবীর আরমান, সবুজ, প্যারিস রোড কালা মিয়া বস্তির জালাল, হাবিব, নিলয়, শিয়াল বাড়ি এলাকায় জসিম, রূপনগর হাইস্কুলের পেছনের বস্তির সোহেল ও লিটন ছিনতাই করে।

মগবাজার মোড় থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত নিউ ইস্কাটন রোড, মৌচাক, মনোয়ারা হাসপাতালের দক্ষিণ গলি থেকে মৌচাক, ভিকারুন নিসা স্কুল থেকে টিঅ্যান্ডটি মোড়, মধুবাগ, মালিবাগ রেলক্রসিং, পীরবাগ, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে ইস্কাটন গার্ডেন, কাকরাইল মসজিদ থেকে শেরাটন মোড়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে সেগুনবাগিচা, এজি অফিসের চারপাশ, বিজয়নগর, আনন্দবাজার, টিএসসি মোড়, হাইকোর্ট মোড়, দোয়েল ক্রসিং, জহুরা মার্কেট, বাংলা মোটর ভিআইপি রোডের সিগন্যাল ও সব স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন এলাকার ছিনতাইকারীরা ভ্রাম্যমাণ। বাংলা মোটর, দিলুরোড, টঙ্গী ডাইভারসন রোড ও মধুবাগ বস্তি এলাকা ছিনতাইকারীদের আবাসস্থল। লালবাগ এলাকায় ছিনতাইকারী গ্রুপগুলো ভাসমান। তবে বেড়িবাঁধ, শ্মশানঘাট, পলাশী বাজার মোড়, জেএন সাহা রোড, চকবাজার, আজিমপুর রোড ও ঢাকেশ্বরী রোড, কামরাঙ্গীরচর এলাকায় মুসলিমবাগ, পূর্বরসুলপুর, কুড়ারঘাট, নন্দীপাড়, কয়লারঘাট, কাউলাহাটি চৌরাস্তায় ছিনতাইকারী গ্রুপ রয়েছে। কোতোয়ালি এলাকার তাঁতিবাজার মোড়, বাবুবাজার ট্রাফিক মোড়, মাজার এলাকা, নয়াবাজার মোড় ও রায় সাহেব বাজার মোড় এলাকায় ভাসমান ছিনতাইকারীরা সক্রিয় রয়েছে। Source:দৈনিক নয়া দিগন্ত
Date:2007-03-25

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: