সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাড়ি-বাড়ির খোঁজ নিচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থা

আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি ছাড়াই সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে ঢাকা শহরে বাড়ি, গাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন। তথ্য প্রমাণ এড়াতে তারা এসব সম্পত্তি স্ত্রী, সন্তান ও পোষ্যদের নামে কিনেছেন। যে কারণে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাদের সরাসরি শনাক্ত করা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ তালিকায় কয়েকশ’ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অঢেল সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। ইতিমধ্যে নির্ধারিত ফরমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব নেয়া হলেও অনেকে প্রকৃত তথ্য এড়িয়ে গেছেন। সংশিষ্ট সূত্র জানায়, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডি এলাকার মতো রাজধানীর অভিজাত এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছেন। কেউ কিনেছেন উত্তরায়। অবৈধ পথে আয় করা অর্থ ছাড়া সৎ জীবনযাপন করে কারও পক্ষে একাকালীন মূল্য দিয়ে এসব ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়। আবার অতি সাধারণ কর্মচারী হয়েও কেউ কেউ ঢাকা শহরে ছয়তলা বাড়ির মালিক হয়েছেন, যা তাদের আয়ের সঙ্গে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে ভূমি ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এরকম অস্বাভাবিক সম্পত্তির মালিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পৃথক কয়েকটি টিম এ তালিকায় দুর্নীতিবাজ হিসেবে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরে কর্মরত কয়েকশ’ কর্মকর্তাকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে তাদের পোষ্যদের নামে কেনা সহায়-সম্পত্তির আয়ের উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ তালিকায় রয়েছে সাবেক ও বর্তমানে কর্মরত বেশ কয়েকজন সিবিএ নেতা, রাজস্ব ও কাস্টমস কর্মকর্তা, তহশিলদার, কানুনগো, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইতিপূর্বে কর্মরত কয়েকজন এসিল্যান্ড, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সাবেক ও বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী পিডি, বিদ্যুতের মিটার রিডার, এলজিইডি ও সওজের শতাধিক প্রকৌশলী, বন কর্মকর্তা এবং সাবেক ও বর্তমানে কর্মরত সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা।

সূত্র জানিয়েছে, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব দফতরে দীর্ঘদিন থেকে প্রেষণে কর্মরত এক কর্মকর্তার মিরপুর ২নং সেকশনে (ব্লক-সি) একটি ছয়তলা বাড়ি রয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন পিওনের ছয়তলা বাড়ি রয়েছে মোহাম্মদপুরে এবং প্রশাসন-৩ শাখায় কর্মরত একজন কর্মকর্তার ডেমরার মাতুয়াইলে রয়েছে ছয়তলা বাড়ি। এ ছাড়া প্রশাসন-৮ শাখায় কর্মরত একজন কর্মকর্তার আগারগাঁওয়ে ছয়তলা বাড়ি রয়েছে। তাদের কেউ কেউ প্রথমে আবাসন সুবিধার জন্য সরকারের পরিত্যক্ত বাড়ি বরাদ্দ পান। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চাকরি করার সুবাদে আইনের ফাঁকফোকর তৈরি করে তাদের অনেকে নামমাত্র মূল্যে এসব বাড়ি কিনে নিতে সক্ষম হয়। পরে অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে ৮০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা ব্যয় করে এসব বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের ফ্ল্যাট ক্রয়ের (ধানমন্ডি) নামজারি শাখায় অনুসন্ধান করেও বহু সরকারি কর্মকর্তার ফ্ল্যাট থাকার তথ্য মিলেছে। তবে স্ত্রী ও পোষ্যদের নামে ক্রয় করায় নথি দেখে তাদের সরাসরি চিহ্নিত করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ফ্ল্যাটের নম্বর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে ধানমন্ডির ৪ ও ২৪ নম্বর রোডের বেশ কিছু ফ্ল্যাটের মূল মালিক হিসেবে অর্থ যোগানদাতা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্ধান মিলেছে। এছাড়া ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে দলিল সম্পাদনে বড় ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে ৪৫ লাখ টাকার ফ্ল্যাট মাত্র ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি দেখানো হয়েছে।

ওদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অঢেল সহায়-সম্পত্তির তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। টাস্কফোর্সের একটি টিম গত সপ্তাহে কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ে এসে দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কুকীর্তির বেশ কিছু নথিপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সাবেক একজন উপমন্ত্রীর বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তারা অনুসন্ধান চালিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক তদনে- ভূমি মন্ত্রণালয়ের নানাস-রে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এ মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা গাড়ি-বাড়িসহ লাখ লাখ টাকার বিপুল পরিমাণ সহায়-সম্পত্তির মালিক। প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে একজন হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা রামপুরা বনশ্রী এলাকায় নর্থ-সাউথ রোডে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ফ্ল্যাট কিনেছেন। তিনি কিছুদিন আগে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় ১৬ শতক জমিও ক্রয় করেন। অপর একজন হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা বাড়ি করেছেন মিরপুরে। মিরপুর ও বাড্ডায় বাড়ি করেছেন ৭নং শাখার একজন কর্মকর্তা। দু’বছর আগে এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজধানীর বাসাবো এলাকায় দুটি বাড়ির মালিক। বর্তমানে কর্মরত অপর কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বাড়ি রয়েছে রামকৃঞ্চ মিশন, মাতুইয়াল এবং কামরাঙ্গীরচরে। তবে এসব সম্পত্তি তারা নিজের নামে করেননি। স্ত্রী, শ্বশুর এবং পোষ্যদের নামে নিজের গ্রামের বাড়ি এবং ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় এভাবে তারা অঢেল পরিমাণ সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। এসব সম্পত্তির বেশিরভাগ সরকারি খাস জমি এবং কিছু জমি প্রভাব খাটিয়ে লিজ নেয়া হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তা রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় চাইনিজ রেস্টুরেন্টের মালিক। অপর একজনের কামরাঙ্গীরচরে রয়েছে বাড়ি। এছাড়া ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সরকারি খাস জমি লিজ নিয়ে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন অনেকে।

এদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিসহ পোষ্যদের যাবতীয় সম্পত্তির হিসাব দাখিলের জন্য সমপ্রতি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু করা হয়। ইতিমধ্যে অনেকে তাদের হিসাব দাখিলও করেছেন। একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকৃত তথ্য গোপন করে হিসাব দিয়েছেন। সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে তদন- হলে তথ্য গোপন করার বিষয় ধরা পড়বে। তবে সাধারণ কর্মচারীরা যুগান-রকে জানিয়েছেন, শুধু তাদের সম্পত্তির হিসাব নিলে হবে না, এ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত এবং সামপ্রতিককালে বদলি হয়ে যাওয়া ক্যাডার কর্মকর্তাদের সম্পত্তির হিসাবও নিতে হবে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-25

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: