তারেক-মামুন দু’বন্ধুর ব্যবসা আর দুর্নীতি চলেছে সমানতালে

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুন।  দু’বন্ধু ব্যবসায় যেমন ছিলেন অংশীদার, তেমনি দুর্নীতিতে। মামুনের দেয়া তথ্যে দুর্নীতির বরপুত্রদের হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাববহির্ভূত ধনসম্পদ ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্বসাতের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদক। তারেক রহমান ও মামুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক মামলার প্রস্ততি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মামুনের নামে-বেনামে গড়ে তোলা বিপুল সম্পদ ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে সংরক্ষিত হাজার হাজার কোটি টাকার সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দারা। গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, তারেক ও মামুন প্রভাব বিস্তার করে ছোট-বড় মিলে ৫০টির মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং নামসর্বস্ব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে গত ৫ বছরে সব ধরনের ব্যবসা ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে তারেক হাতিয়ে নিয়েছেন বিভিন্ন প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সিংহভাগ অর্থ। আর এ অর্থ বিভিন্ন চ্যানেলে দেশের বাইরে পাচার করেছেন তারা। সূত্র জানায়, শুধু মালয়েশিয়াতেই তারেক রহমানের রয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের দুর্নীতি তদনে-র উদ্যোগ নেয়ায় ধীরে ধীরে দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচিত হতে শুর” করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিগত ৫ বছরে হাওয়া ভবনের মাধ্যমে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও নেতা-পাতি নেতাদের দুর্নীতির প্রতিটি ঘটনা ধরে ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। এজন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হাওয়া ভবনের দুর্নীতির একটি শ্বেতপত্র তৈরি করেছে। সেই সূত্র ধরে মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বাড়ি ভোলায়। বড় হয়েছেন ঢাকায়। তারেক রহমানের সঙ্গে লেখাপড়া করেছেন। বন্ধুত্ব থেকে বিজনেস পার্টনার। ১৯৮৭ সালে বন্ধু তারেক রহমানের হাত ধরে মামুনের ব্যবসা শুরু। কয়েক বছর আগেও মামুনের উল্লেখযোগ্য কোন ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল না বললেই চলে। অথচ বর্তমানে তিনি ওয়ান গ্রুপের অধীনে সাতটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ওয়ান টেক্সটাইল, খাম্বা লিমিটেড, ওয়ান কম্পোজিট, প্রিকাস্ট কংক্রিট ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, ওয়ান স্পিনিং, ওয়ান ডেনিম এবং ওয়ান কনজ্যুমার প্রডাক্ট লিমিটেড। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও তিনি। একই সঙ্গে তিনি সিলভার লাইন কম্পোজিট মিল ও রহমান নেভিগেশনের পরিচালক। মামুন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধার হলেও পরিচালক হিসেবে বিএনপির অনেক নেতা ও তাদের পুত্ররা জড়িত রয়েছেন। দেশে একাধিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদেশেও মামুন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ সেক্টরের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের তথ্যও ফাঁস হয়ে গেছে। উ”চ দরে বিদ্যুতের খাম্বা সরবরাহ করে মামুন কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। এমনকি বিদ্যুতের খাম্বা সরবরাহ করতে নিজে কারখানাও গড়ে তোলেন। এসবই তিনি স্বীকার করেছেন গোয়েন্দাদের কাছে।

একই সঙ্গে হাওয়া ভবন ও তারেক রহমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে মামুন কিভাবে ৫ বছরে ওয়ান স্পিনিং, ওয়ান ডাইং, প্রিকাস্ট কংক্রিট ইন্ডাস্ট্রিজ, ওয়ান কম্পোজিট, ওয়ান টেক্সটাইল, ওয়ান কনজ্যুমারস প্রোডাক্ট, সিলভার লাইন কম্পোজিট মিল, রহমান নেভিগেশন, বহতল ভবন, ওয়ান এন্টারটেইনমেন্ট, খাম্বা লিমিটেড, আলিশান গাড়ি, জাজ ডিস্টিলারিজ, জাহাজ, তারেক রহমানের সঙ্গে ড্যান্ডি ডাইং ফ্যাক্টরি, গাজীপুরের আলিশান বাড়ি (খোয়াব)সহ বহু বাড়ি-গাড়ি ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার প্রতিটি বিষয়ে আলাদা আলাদাভাবে তদন্ত করে মামলা দায়ের করা হবে। মামুনের বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা হবে তার হিসাব এখনই বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। মামুনের বির”দ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তার প্রতিটি অভিযোগের অংশীদার তারেক। তাই এসব মামলায় তারেককেও সংশ্লিষ্ট করা হতে পারে।

এদিকে, মামুনের খাম্বা লিমেটেডের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক খুঁটি তৈরি ও সরবরাহ সংক্রান্ত কাজে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দুদক। দু’জন উপ-পরিচালকের নেতৃত্বে বৈদ্যুতিক খাতে ৫ বছরের লুটপাটের ঘটনা তদন্ত হচ্ছে। মামুন মন্ত্রী-এমপি না হয়েও বিগত চারদলীয় জোট সরকারের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে সর্বত্রই প্রভাব বিস্তার করেছেন। তার অপকর্মের আশ্রয়দাতা ছিলেন বন্ধু তারেক রহমান। বিএনপি থেকে বাতিল হওয়া গত জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী অনেকের অভিযোগ, তারা দলীয় মনোনয়ন পেতে মামুনকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন। টাকা দিয়েও অনেকে মনোনয়ন পাননি। এসব তথ্য-প্রমাণ হাওয়া ভবন থেকে জব্দ করা ফাইলে রয়েছে। হাওয়া ভবনের একটি বিশেষ কক্ষে বেশ কয়েকটি কম্পিউটারে সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত রাখা হতো। সরকারি প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত নিয়োগ-বদলি নিয়ন্ত্রণ করা হতো হাওয়া ভবনের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ছোট-বড় কোন টেন্ডার হাওয়া ভবনের পার্সেন্টেজ ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। তারেক রহমান তার কক্ষে বসে দেশের সবকিছু মনিটরিং করতেন এবং মন্ত্রী-সচিবদের নির্দেশ দিতেন। এসব কাজে আর্থিক লেনদেন দেখাশোনা করতেন মামুন, বকুল, আশিকদের মাধ্যমে। হাওয়া ভবনের প্রতিটি কক্ষে ছিল সিসিটিভি। সবকিছু মনিটরিং করা হতো সিসিটিভির মাধ্যমে। টাকা-পয়সা লেনদেন শেষে ২/৩ মিনিটের জন্য আগতরা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ পেতেন। সূত্র জানায়, এসব দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন মামুন।
ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রশাসনেও একছত্র আধিপত্য ছিল তারেক ও মামুনের। অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে চাকরি বাঁচাতে তাদের তোয়াজ করতে হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে হাওয়া ভবনে তারেক রহমানকে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেন মামুন। সে সময় মামুন তার ভাই হাফিজ ইব্রাহিমকে ভোলা থেকে মনোনয়ন পাইয়ে দেন। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি মামুনকে।

এদিকে, মামুন সরকারি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী না হওয়ায় দুদক তার বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির মামলা দিতে পারছে না। তবে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত শত শত কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ তার দখলে রাখার অভিযোগে দুদক আজকালের মধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা দিতে যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে গোপন তদন্ত কাজও প্রায় শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। মামুন দুদকের প্রথম সন্দেহভাজন ৫০ দুর্নীতিবাজের তালিকায় ৭ নম্বর অভিযুক্ত ব্যক্তি। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-27

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: