বিদেশে পাড়ি জমানোর ফিকিরে বিত্তশালী ইঞ্জিনিয়াররা স্ত্রী সন্তান পাঠিয়ে দিয়েছেন অনেকে

দুর্নীতি বিরোধী চলমান অভিযানের পটভূমিতে সরকারের বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থা ও অধিদপ্তরের ধনাঢ্য ইঞ্জিনিয়াররা বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন এরই মধ্যে চলে গেছেন দেশের বাইরে। কেউ কেউ বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের। এদের অনেকেই আগেভাগে নিয়ে রেখেছেন বিদেশী নাগরিকত্ব। এখন পরিস্থিতি বুঝে গোপনে সটকে পড়তে চাইছেন তারা। তবে একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় বিপত্তি বেধেছে। গোয়েন্দা সংস্থাটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই অন্তত একজন বিত্তশালী ইঞ্জিনিয়ারের বিদেশ গমন ঠেকানো হয়েছে। নতুন করে কাউকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাতীয় ভিত্তিক একটি প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গত সপ্তাহে যখন বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রক্রিয়া নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছিলেন, তখনই বিষয়টি টের পেয়ে যান সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এরপরই তারা ওই প্রকৌশলীর বিদেশ গমন প্রক্রিয়া থামাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।

গোয়েন্দা সূত্রটি জানায়, ওই অধিদপ্তরের বিপুলসংখ্যক ইঞ্জিনিয়ার অবৈধ উপায়ে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। দেশে একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়ার পাশাপাশি তাদের অনেকেই বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনে রেখেছেন দেশের বাইরে। নিয়ে রেখেছেন বিদেশী নাগরিকত্ব অথবা পারমানেন্ট রেসিডেন্টশীপ। এক্ষেত্রে ওই অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারদের প্রথম পছন্দ কানাডা। গত দুই দশকে এই সংস্থার কয়েক ডজন ইঞ্জিনিয়ার কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন। সরকারি কোটায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বা কোর্স করার নামে ওই দেশে গিয়ে তারা আর ফিরে আসেননি। আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বও গ্রহণ করেছেন অনেক ইঞ্জিনিয়ার। বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণের তথ্যটি গোপন রেখেই এসব ইঞ্জিনিয়ার এতদিন সরকারি চাকরি করেছেন। এখন পরিস্থিতি বুঝে তারা দেশ ত্যাগের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের কয়েকজন এরইমধ্যে নিজ নিজ পরিবারের সদস্যদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ওই অধিদপ্তরের একাধিক ইঞ্জিনিয়ার ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে স্বীকার করেছেন যে, তাদের স্ত্রী-সন্তান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছে। নিজেদের নাগরিকত্ব বা পারমানেন্ট রেসিডেন্টশীপ থাকার কথাও স্বীকার করেছেন কেউ কেউ। দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে বর্তমানে বিভাগীয় মামলা চলছে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরূদ্ধে। একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত ওই অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে বলেন, আমি কানাডার পারমানেন্ট রেসিডেন্টশীপ পেয়েছি ঠিকই, তবে আমি দেশেই থাকি। স্ত্রী ও সন্তান কানাডায় থাকার কথা স্বীকার করে এই ধনাঢ্য ইঞ্জিনিয়ার বলেন, বাচ্চা ওখানে পড়াশোনা করে, তাই তারা কানাডায় থাকছে। অধিদপ্তরটির একজন প্রকল্প পরিচালকও সম্প্রতি দুর্নীতি বিরোধী যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানকে কানাডায় পাঠিয়ে দিয়েছেন।

জানা যায়, বিদেশী নাগরিকত্ব বা পারমানেন্ট রেসিডেন্টশীপ গ্রহণের কারণে ইতিপূর্বে ওই অধিদপ্তরের বিপুলসংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। চাকরিচ্যুতদের প্রায় সকলেই বিভিন্ন অজুহাতে দেশের বাইরে গিয়ে যথাসময়ে ফিরে আসেননি। আবার কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা বা কোর্সের কথা বলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশে গেলেও ফিরে আসার পর উচ্চশিক্ষা বা কোর্স সম্পন্ন করার সপক্ষে কোনো প্রমাণপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে পারেননি। আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লিয়েন সুবিধা নিয়ে বিদেশী কোম্পানিতে যোগদানের পর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ফিরে আসতে ব্যর্থ হন। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু প্রকৌশলী সরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায়ই গোপনে বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। এখন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা দেশ ছাড়তে চাইছেন। কেউ কেউ এরই মধ্যে স্ত্রী-সন্তান দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। জাপানী সহায়তায় প্রায় ৮’শ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পরিচালক লিয়েনে বিদেশী কোম্পানীতে চাকরি নিয়ে গত সপ্তাহে চলে গেছেন দেশের বাইরে। আরও বেশ কয়েকজন একই পথ অনুসরণের চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল অধিদপ্তর- এলইজিইডির প্রধান প্রকৌশলী শহীদুল হাসানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো প্রকৌশলী গোপনে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে থাকলে তা স্বাভাবিকভাবে কর্তৃপক্ষের জানার কথা নয়। তবে এ ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা আমরা খতিয়ে দেখি। কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, অতীতে অনেকেই কোর্স করা বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে যথাসময়ে ফিরে না আসায় বিধি অনুযায়ী তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই হয়তো অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে থাকতে পারে। কিন্তু যেহেতু তারা এখন আর চাকরিতে নেই, সুতরাং এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। Source:দৈনিক ইত্তেফাক
Date:2007-03-27

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: