মামুন ৫ দিনের রিমান্ডে

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে নামটি অবলীলায় জিভাগ্রে এসে যায় তিনি গিয়াসউদ্দিন আল মামুন- তারেকের অন্তরঙ্গতম বন্ধু, ব্যবসায়ের অংশীদার। পত্রপত্রিকায় দারুণভাবে আলোচিত মামুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি এখন ৫ দিনের পুলিশ রিমান্ডে। গত প্রায় দু’মাসে মামুনকে নিয়ে মিডিয়ায় অনেক লেখা হয়েছে। ৩১ জানুয়ারি তাকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে। পুলিশসহ আইন-শৃংখলা বাহিনী এ খবরের সত্যতা স্বীকার করেনি। অস্বীকারও করেনি।

ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ বলেছে, রোববার শেষরাতে তাকে পুরনো ডিওএইচএসের ৬ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যৌথ বাহিনী উদ্ধার করেছে একটি স্প্যানিশ পিস্তল ও আট রাউন্ড গুলি। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা হয়েছে। সোমবার বিকাল পৌনে ৫টায় মুখ্য মহানগর আদালতের হাকিম এবিএম আবদুল ফাত্তাহ মামুনকে ৫ দিনের পুলিশ জিম্মায় প্রদান করেন। পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল। আদালতে কড়া নিরাপত্তায় আনার পর মামুন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমি কেমন আছি তা আপনারাই ভালো জানেন। মামুনের পরনে ছিল ধূসর রঙের হাফহাতা গেঞ্জি, কালো প্যান্ট। শ্মশ্রুমণ্ডিত মামুনকে চেনাই যাচ্ছিল না। একটু শুকিয়ে গেছেন তিনি। আদালতে নিশ্চুপ থাকলেও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে তিনি নিচুস্বরে সামান্য কথা বলেছেন। আত্বীয়দের জানান, তিনি চোখে কিছুটা কম দেখছেন।

রিমান্ড শুনানির পর মামুনকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে পুলিশ ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিয়ে যায়। আদালতে পাঠানো পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামুনের সহযোগী সন্ত্রাসীদের নাম-ঠিকানা, মামুনের অস্ত্রভাণ্ডার ও সন্ত্রাসী গডফাদারদের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মামুনকে অস্ত্র মামলা ছাড়াও সংশোধিত জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা-২০০৭ এর ১৬(২) ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। জরুরি বিধিমালার আওতায় অস্ত্র আইনে কোন আসামির পক্ষে জামিন আবেদনের সুযোগ না থাকায় মামুনের জন্য আইনজীবীরা জামিন প্রার্থনা করেননি। তবে তারা রিমান্ডের বিরোধিতা করেছেন। এছাড়া সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের সূত্র ধরে মামুনকে প্রায় ২ মাস আগে গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযোগ এনে আইনজীবীরা অস্ত্র মামলাটিকে হয়রানিমূলক হিসেবে অভিহিত করেন। আদালতে মামুনকে দেখার জন্য তার দুই ভাই ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া তেমন কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বিএনপির কোন নেতাকর্মী আদালতের ধারেকাছে আসেননি। উৎসুক জনতার ভিড় ছিল কম। কড়া পুলিশি প্রহরায় বিকাল ৩টা ৫১ মিনিটে প্রিজন ভ্যানে করে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ মামুনকে সিএমএম আদালতে হাজির করে। এর আগে বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে প্রিজন ভ্যানে করে মামুনকে নিয়ে আদালতের উদ্দেশে রওনা দেয় পুলিশ। পুলিশের পাহারার মধ্যে মামুন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি জানান, তাকে ৩১ জানুয়ারি গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি এ মুহূর্তে বেশি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, পরে তিনি মুখ খুলবেন।

সিএমএম আদালতের পুরনো ভবনের তৃতীয় তলায় ২১ নম্বর কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট এবিএম আবদুল ফাত্তাহর আদালতে মামুনের উপস্থিতিতে বিকাল ৩টা ৫১ মিনিট থেকে ৪টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশ প্রসিকিউশনের কাছ থেকে মামুনের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র মামলার এজাহার ও রিমান্ড আবেদন সংক্রান্ত ফরোয়ার্ডিংয়ের কপি পড়ে নেন তার আইনজীবীরা। মামুনের পক্ষে প্রথমে শুনানিতে অংশ নেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান। তিনি মামলার বিষয়বস্ত অবহিত হওয়ার পর শুনানিতে বলেন, পত্রপত্রিকার মাধ্যমে মামুনের পরিবার ও তারা জানতে পেরেছেন মামুন ২৩ জানুয়ারি গ্রেফতার হয়ে আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে ছিলেন। তিনি বলেন, মামুনকে পল্টনের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে, এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের বক্তব্যও মিডিয়ায় এসেছে। অথচ মামলায় বলা হয়েছে, তাকে ২৫ মার্চ গভীর রাতে তার ডিওএইচএস বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি মামুনকে গ্রেফতার নিয়ে লুকোচুরির বিষয়টি সামনে রেখে রিমান্ডের আবেদন নাকচ করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করেন। অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী শুনানিতে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির নিয়ম অনুযায়ী এ মামলার সিডি আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। আইনজীবী অভিযোগ করে বলেন, মামুনকে গ্রেফতার ও তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনের বিধান লংঘন করা হয়েছে। মামুনের সুচিকিৎসার জন্য তিনি ম্যাজিস্র্বেটের কাছে লিখিত আদেশ চান। এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষে কোর্ট জিআরও মোহাম্মদ আলী বলেন, মামুনকে গ্রেফতারে আইনের লংঘন করা হয়নি। রিমান্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মামুনের বাসা তল্লাশি করে স্পেনের তৈরি পয়েন্ট ২২ বোরের একটি পিস্তল ও ৮ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে মামুন কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তার সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সেজন্য রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।
মামলায় যা বলা হয়েছে

ক্যান্টনমেন্ট থানায় অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ও (চ) ধারায় গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নম্বর ৯, তারিখ ২৬ মার্চ ২০০৭)। মামলার বাদী ক্যান্টনমেন্ট থানার এসআই কাজী আবদুল আউয়াল। মামলার এজাহারে বলা হয়, দুদকের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ তালিকাভুক্ত বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। তিনি আত্বগোপন অবস্থান থেকে চুপিসারে তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পুরনো ডিওএইচএসের ৬ নম্বর রোডের ৭৮ নম্বর বাড়িতে যাবেন- এ ধরনের খবর একটি আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে ছিল। এ খবর পেয়ে রোববার গভীর রাতে (রাত ২টা ১৫ মিনিট) যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ও ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি শাহর”ম খান, এসআই কাজী আবদুল আউয়াল, এসআই শহীদুল্লাহ, এএসআই নূরে আলম ও ৫ জন মহিলা আনসার সদস্যসহ মামুনের বাড়ির সামনে উপস্থিত হন। মামলার এজাহারে মামুনের পিতামাতা ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। তার পিতার নাম মৃত জয়নাল আবেদীন, মাতা হালিমা খাতুন। তার পৈতৃক ঠিকানা উল্লেখ করা হয়- বাড়ি ৭১/৮ শুক্রাবাদ, ধানমণ্ডি, ঢাকা।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, যৌথ বাহিনী ও পুলিশ মামুনের পুরনো ডিওএইচএস বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় তারা বাড়ির দোতলায় মামুনের বেডর”মে যায়। সেখান থেকে মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। তার ঘর তল্লাশি করে পয়েন্ট ২২ বোরের স্পেনের তৈরি ১টি পিস-ল ও ৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। অস্ত্র জব্দ করার সময় তার বাড়িতে উপস্থিত দু’জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়। তারা হলেন পুরনো ডিওএইচএসের ৬ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়ির কর্নেল মান্নানের ছেলে শাহরিয়ার মান্নান ও ২ নম্বর রোডের ৫২ নম্বর বাড়ির মৃত নূরউদ্দিনের ছেলে রিয়াজ উদ্দিন আল মামুন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী জানা যায়, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গুলি অবৈধ। তাদের উপস্থিতিতে উদ্ধারকৃত মালামালের জব্দ তালিকাও করা হয়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে মামুনকে তার বাসা থেকে যৌথ বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরে সোমবার সকাল ৯টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় তাকে হস্তান্তর করা হয়। সকাল পৌনে ১০টায় এসআই কাজী আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলাটি দায়ের করেন।

গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিশাল দুর্নীতির ফাইল দুদক তদন- করছে। দুদকের কর্মকর্তা ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাও তার দুর্নীতির তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। মামুনের মালিকানাধীন ৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ ৯টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়ার প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। তার ঢাকা ও গাজীপুরের বিলাসবহুল বাড়ি, বেশ কয়েকটি অত্যধিক মূল্যের গাড়ি, ওয়ান গ্রুপের ওয়ান টেক্সটাইল, খাম্বা লিমিটেড, ওয়ান কম্পোজিট, প্রিকাস্ট কনক্রিট ইন্ডাস্ট্রিজ, ওয়ান স্পিনিং, ওয়ান ডেনিম, ওয়ান কনজ্যুমার প্রোডাক্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূলধন ও আয়ের উৎসসহ অনেক গোপন তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে রয়েছে। তার বির”দ্ধে দুদক মামলা করার প্রস্ততি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-27

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: