খালেদা জিয়াকেও এবার বিদেশ যেতে হচ্ছে

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গেছে। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে নানা গুঞ্জন-গুঞ্জরণ ছিল। নানা সূত্রের খবর একসঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে এখন বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ছেড়ে সপরিবারে বিদেশে যেতে হচ্ছে। কবে? কোন নির্দিষ্ট দিন-তারিখ জানা যায়নি। তবে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে আভাস পাওয়া গেছে, খালেদা জিয়া ১০ এপ্রিলের মধ্যে বিদেশ চলে যেতে পারেন। সম্ভবত প্রথমে সৌদি আরব। সেখানে তিনি ওমরাহ পালন করবেন। পরে তিনি আমেরিকা-লন্ডন যেতে পারেন।

তারেক রহমান এখন জেলে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। দুর্নীতির মামলা দায়েরের প্রস’তি চলছে। তারেক অসুস্থ বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা ‘আরও খারাপ হলে’ তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানো হতে পারে বলে জানা গেছে। তার ফেরা নির্ভর করবে ‘সুস্থতার’ ওপর। তবে তার অবর্তমানে তার বিচার কার্যক্রম চলতে পারে বলে জানা গেছে। খালেদা জিয়ার ভাই সাবেক সাংসদ সাঈদ এস্কান্দারও সপরিবারে বিদেশ যেতে পারেন বলে কোন কোন মহল খবর দিচ্ছে। তবে এর সত্যাসত্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। খালেদা জিয়া ইতিমধ্যেই বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। মঙ্গলবার রাতে মান্নান ভূঁইয়া খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা। মান্নান ভূঁইয়া ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ বেশ কয়েকজন নেতার ভূমিকা খালেদা জিয়া সন্দেহের চোখে দেখছেন। ইতিমধ্যে বিএনপির অভ্যন-রে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির অনেক শীর্ষনেতা মনে করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিলেন। তারেক-কোকো ও নিকটা্তীয়দের দুর্নীতির পথে চলতে প্রশ্রয় দিয়েছেন। দলের এই দুঃসময়ে নির্যাতিত ও পলায়নপর নেতাকর্মীদের কথা ভাবছেন না তিনি। ভাবছেন নিজের ও আ্তীয়-স্বজনের কথা। বিএনপির অনেক শীর্ষনেতা মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির আর কোন ভবিষ্যৎ নেই।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বেশ কিছুদিন পর খালেদা জিয়াকে ‘কিছুদিনের জন্য’ বিদেশে চলে যেতে বলা হয়েছিল। খালেদা জিয়া এ পরামর্শ মোটেই আমলে আনেননি। তারপর একের পর এক দুঃসংবাদ। তার প্রিয় পুত্র তারেককে গ্রেফতার করে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে রাখা হবে- এ তো তার কাছে ছিল কল্পনারও অতীত। তার গতিবিধি সীমিত করা হবে, পুত্র কোকোও থাকবে সন্দেহের তালিকায়। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দও মুখ ফিরিয়ে নেবেন। খালেদা জিয়া রাজনীতির এই অন্ধকার দিক আগে কখনও দেখেননি। কিঞ্চিৎ বিলম্ব হলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন দেশ তাকে ছাড়তেই হবে। অন্যথায় পরিণতি এর চেয়েও খারাপ হতে পারে। ‘শেখ হাসিনা বিদেশ গেছেন- আপনাকেও যেতে হবে।’ খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠজনরা এ ধরনের সতর্কবাণী অনেক আগেই শুনিয়েছিলেন।

বিএনপির অভ্যন্তরে এখন ঝড়ো হাওয়া। দলের অনেক শীর্ষনেতা বিএনপিকে বাঁচানোর জন্য নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু করেছেন। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের দল থেকে বের করে দিয়ে বিএনপি পুনর্গঠনের কথা চিন্তা করছেন তারা। করণীয় নির্ধারণ করতে সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ও নেতা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা ধীরে ধীরে এগুচ্ছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ১৯ মার্চ রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির সহ-সভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর গুলশানের বাসভবনে দলের বেশ কয়েকজন নেতা গোপন বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে দলের সহ-সভাপতি মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের দুই সদস্য মোশারেফ হোসেন শাজাহান ও মেজর (অব.) শাহজাহান ওমর, দলের প্রচার সম্পাদক মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের আগে তারা ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে দেখে আসেন।

সূত্র জানায়, বৈঠকে তারা দলের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের দল থেকে বহিষ্কারের প্রশ্নে একমত পোষণ করেন। একই সঙ্গে তারা দলের ভেতর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সৎ, যোগ্য ও প্রবীণ নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন, দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে সমুন্নত রাখার বিষয়ে কথাবার্তা বলেন। তারা মনে করেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে দুর্নীতিবাজ নেতাদের দল থেকে বহিষ্কার করা কঠিন হবে। কারণ দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতারকৃত তার বড় ছেলে তারেক রহমান, নাজমুল হুদা, মির্জা আব্বাস, হারিছ চৌধুরী, মোসাদ্দেক আলী ফালু প্রমুখকে দল থেকে বহিষ্কার করা তার পক্ষে মোটেই সহজ নয়।

বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, তারা কারও দুর্নীতির বোঝা বইতে রাজি নন। তারা মনে করেন, বেগম জিয়ার প্রশ্রয়ে তার ছেলেসহ অন্যরা লাগামহীন দুর্নীতি করেছে। তাই বেগম জিয়ার প্রতিও তারা আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। অপর একটি সূত্র জানায়, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমানের গুলশানের বাসভবনেও একটি গোপন বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। তারা বিএনপিতে নতুন মেরুকরণের বিষয়ে কথাবার্তা বলেছেন। তারা সাইফুর রহমানকে দলের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত করার বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। তবে বয়সের কারণে সাইফুর রহমান রাজনীতি থেকে অবসর নিতেই আগ্রহী বলে জানা গেছে।
দলের অভ্যন-রে টানাপোড়েন ও নতুন মেরুকরণের বিষয় খালেদা জিয়া জানতে পেরেছেন। তিনি ১৪ মার্চ দলের নগর সভাপতি সাদেক হোসেন খোকাকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে ডেকে পুরো বিষয়টি জানতে চান। খালেদা জিয়া বর্তমান দুঃসময়ে সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে খোকার মাধ্যমে দলীয় নেতাদের পরামর্শ দেন। দলের ভেতর কে কি করছেন, সব খবর পৌঁছে যাচ্ছে তার কাছে। দলের কয়েকজন জুনিয়র নেতার ওপর ক্ষুব্ধ তিনি। দলের কয়েকজন নেতা ও নেত্রী সম্প্রতি বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতার ইন্ধনে তার ছেলেকে কারাগারে যেতে হল। ‘যাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না, যাদের রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে মন্ত্রী-এমপি বানিয়েছি, আজ তারাই বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তারাই আমার পরিবারকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।’ খালেদা জিয়ার এই ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর একদা বিশ্বস্ত অনেক নেতার কর্ণকুহরে এখন হয়তো প্রবেশ করবে না। Source:দৈনিক যুগান্তর
Date:2007-03-28

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: